


পরামর্শে স্ট্রোক রিহ্যাব স্পেশালিস্ট ডাঃ মৌলীমাধব ঘটক।
কয়েক মাস আগের ঘটনা। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন মধ্য চল্লিশের অসীম সরকার (নাম পরিবর্তিত)। তড়িঘড়ি নিয়ে যাওয়া হল হাসপাতালে। স্ট্রোক। তবে ডাক্তারদের হাতযশে সে যাত্রায় প্রাণরক্ষা। কিন্তু হাত পা অসাড় হয়ে গেল, বাকশক্তিও হারালেন। বাকি জীবনটা কি তাহলে প্যারালাইজড হয়েই কাটাতে হবে অসীমবাবুকে?
হাল ছাড়েননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। স্ট্রোক হওয়ার মাত্র ১০ দিনের মধ্যে শুরু করে দিলেন রিহ্যাব। আর তাতেই এক মাস পর প্রায় সুস্থ হয়ে উঠলেন অসীমবাবু।
২০২৪ সালের একটি রিপোর্ট বলছে, গত বছর সারা ভারতে ১৮ লক্ষের বেশি মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। এটা শুধু নথিভুক্ত কেসের সংখ্যা। যত দিন যাচ্ছে, আমাদের দেশে এই মারণ রোগের ঘটনা বেড়েই চলেছে। শেষ তিন দশকে স্ট্রোকে আক্রান্তের সংখ্যায় প্রায় ৫১ শতাংশ বৃদ্ধি দেখা গিয়েছে ভারতে। একটি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, প্রতি ২০ সেকেন্ডে একজনের স্ট্রোক হচ্ছে আমাদের দেশে। তবে প্রতি ক্ষেত্রে মৃত্যু না হলেও স্ট্রোক যেহেতু আমাদের মস্তিষ্ককে এফেক্ট করে, তাই পরবর্তীতে কারও দেহের একাংশ প্যারালাইজড হয়ে যায়, কেউ কেউ বাকশক্তি হারান, কেউ আবার বোধবিচার শক্তি। এক্ষেত্রে স্ট্রোকে আক্রান্তকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে দরকার স্ট্রোক রিহ্যাবিলিটেশন। স্ট্রোক আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। তাই আক্রান্তকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নিউরো-রিকভারির প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ওষুধ কিন্তু বিশেষ কিছু কাজে দেয় না। দরকার নিউরো প্লাস্টিসিটির অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত নার্ভগুলিকে পুনরায় উদ্দীপিত করে তোলা। এই কাজতাই করা হয় রিহ্যাবে।
স্ট্রোকের পরেই দেখা যায় আক্রান্তের হাত-পা সহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসাড় হয়ে পড়ে। এই অসাড়তা কাটাতে রোগীকে রিহ্যাবে নানা এক্সারসাইজ, স্ট্রেচিং করানো হয়। সঙ্গে কিছু ওষুধও চলে। দরকারে বোটক্স ইঞ্জেকশন রোগীকে দেওয়া হয়। এতে হাত পায়ের নমনীয়তা ফিরে আসে। এরপর আরও কিছু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেগুলিকে কর্মক্ষম করে তোলা হয়। তবে শুধু হাত পা নয়, স্ট্রোকের ফলে প্রস্রাবে সমস্যা, বাকশক্তি হারানো, বোধজ্ঞান হারানোর ঘটনাও ঘটে। স্পিচ থেরাপি, কগনিটিভ থেরাপির মাধ্যমে আক্রান্তকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। একটি শিশুকে যেমনভাবে হাঁটতে শেখানো, কথা বলতে শেখানো হয়, ঠিক সেভাবেই স্ট্রোক আক্রান্তের রিহ্যাব (মোটর রি-এডুকেশন) চলে। তবে রিহ্যাব কতটা সাকসেসফুল হবে বা আক্রান্ত কতটা কর্মক্ষমতা ফিরে পাবেন, তা কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমত স্ট্রোক কতটা ভয়াবহ হয়েছে সেটা বড় ফ্যাক্টর। আর দ্বিতীয় হল, স্ট্রোক হওয়ার কতদিন পর রিহ্যাব শুরু করা হয়েছে। স্ট্রোক হওয়ার পরবর্তী ৪০ দিনকে গোল্ডেন ডে’জ বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে রিহ্যাব শুরু করতে পারলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। ৬ মাসের মধ্যে রিহ্যাব শুরু করলে মোটামুটি উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু তার বেশি হয়ে গেলে রিহ্যাবে ভালো ফল মেলা মুশকিল।
এই রিহ্যাবের খরচ একেক জায়গায় একেকরকম। তবে গড়ে দৈনিক খরচ ৪ হাজের মতো। রিহ্যাব সেশন চলে এক থেকে দেড় মাস। তবে রিহ্যাব চলাকালীন বাড়ির লোককে কিন্তু আক্রান্তের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। তাঁর প্রেসার, সুগার লেভেল নিয়মিত মাপতে হবে। আর খেয়াল রাখতে হবে সোডিয়াম পটাশিয়াম লেভেলে। তবে রিহ্যাব ঠিক সময়ে শুরু হলে আক্রান্ত ব্যক্তি কিন্তু প্রায় আগের মতোই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারবেন।
লিখেছেন: সায়ন মজুমদার