


শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। আর এই নির্মাণ প্রক্রিয়াটির সূচনা হয় বুনিয়াদি শিক্ষা থেকেই। তাই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সবচেয়ে জরুরি। শিক্ষার মান একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। প্রথমেই দরকার সময়োপযোগী বিদ্যালয় পরিকাঠামো। একইসঙ্গে প্রয়োজন শিশুরা যে সমাজ থেকে উঠে আসছে তার উন্নয়ন। এরপর দায়িত্ব শিক্ষকদের। তাঁদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা চাই এবং ওইসঙ্গে চাই পাঠদানে আন্তরিকতা। সব মিলিয়েই প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। সেখানে এই প্রক্রিয়ার পুরো দায় এককভাবে শিক্ষকদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার চিন্তা ঠিক নয়। এখানে উঠবে স্বাভাবিক প্রশ্ন, শিক্ষকদের বেতনবৃদ্ধির বিষয়টি পড়ুয়াদের পরীক্ষিত সাফল্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত? স্কুলশিক্ষা মন্ত্রী দীপক বর্মন জানিয়েছেন, আগামী বছর থেকে প্রাথমিক শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট নির্ভর করবে তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা বছর শেষে কতটা শিখল, তার উপর। পাশাপাশি, প্রতি ক্লাসে একজন শিক্ষকই সমস্ত বিষয়ের দায়িত্বে থাকবেন। সরকারের যুক্তি, এতে শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং একজন শিক্ষক নিজের শ্রেণির পড়ুয়াদের অগ্রগতি সম্পর্কে পূর্ণ দায়িত্বশীল থাকবেন। আপাতদৃষ্টিতে প্রস্তাবটি সাধু। একই শিক্ষক প্রতিদিন একটি শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়ালে শিক্ষক ও ছাত্রের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব, পড়াশোনার ধারাবাহিকতাও বাড়তে পারে। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়নের মতো জটিল বিষয়কে কেবল একজন শিক্ষকের কার্যফলের মাপকাঠিতে বিচার করা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। একজন পড়ুয়ার শেখার ক্ষমতা শুধু শিক্ষকের দক্ষতার উপর নির্ভর করে না। তার পরিবারের হাল, আর্থ-সামাজিক পরিবেশ, শিশুর স্বাস্থ্যসহ শারীরিক-মানসিক কাঠামো প্রভৃতি সবকিছুরই বড়ো ভূমিকা রয়েছে। প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, প্রত্যন্ত অঞ্চলের গরিব বাড়ির সন্তান কিংবা নিয়মিত স্কুলে আসতে না-পারা শিশুর শিক্ষাগত অগ্রগতিকে তুলনায় সচ্ছল শহুরে পড়ুয়ার সঙ্গে একই মাপকাঠিতে বিচার করা যায় না। সরকারি প্রস্তাবে এই বাস্তবতার প্রতিফলন নেই। পড়ুয়ারা প্রত্যাশিত মাত্রায় শিখতে না-পারলে তার দায় কি শুধু শিক্ষকের? স্কুলে পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষকের স্বল্পতা, উপযুক্ত শিক্ষাসামগ্রীর অনুপস্থিতি কিংবা প্রশাসনিক অব্যবস্থার দায় কিন্তু সরকার বাহাদুরের উপরেই বর্তায়।
একটি শ্রেণির পড়ুয়াদের সঙ্গে একজন শিক্ষকের নিয়মিত যোগাযোগ তাদের ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও অগ্রগতি চিহ্নিত করতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতি ক্লাসে একজন শিক্ষক রাখার প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে স্বাগত। এই লক্ষ্যে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শূন্যপদ পূরণ এবং প্রতিটি স্কুলে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো নিশ্চিত করার দায়ভার সরকারকে যথাসময়ে পালন করতে হবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৬ জন পড়ুয়া পিছু একজন শিক্ষক রয়েছেন। নিয়োগ সম্পূর্ণ হলে সেই অনুপাত উন্নীত হবে ২০ জনে একজন। কিন্তু নিয়োগের আশ্বাস আর বাস্তবে নিয়োগ যে আলাদা! বহু স্কুলে শিক্ষকের সংখ্যা যৎসামান্য। পঠনপাঠনের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হয় তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষকের পক্ষে সমগ্র শিক্ষার সাফল্য এনে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কতখানি সম্ভব? এই সংশয় থাকছে গোড়া থেকেই। আরও বড়ো প্রশ্ন, শিক্ষকদের মূল্যায়ন কীভাবে হবে? কোন নিরপেক্ষ সংস্থা তা করবে? মূল্যায়নের নির্দিষ্ট মাপকাঠি কী হবে? সেটি কি রাজনৈতিক আনুগত্য, প্রশাসনিক পছন্দ-অপছন্দের মতো চেনা ব্যাধির ঊর্ধ্বে রাখা সম্ভব হবে? পূর্ণ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসৃত নাহলে এই পর্বতপ্রমাণ মূল্যায়ন পদ্ধতি যা প্রসব করবে তা নিশ্চিতভাবেই মূষিক মাত্র! তাই নয়া ইনক্রিমেন্ট প্রথা শিক্ষকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে। শিক্ষকের কাজ কেবল পরীক্ষার নম্বর বৃদ্ধি নয়, শিশুর সার্বিক বিকাশে সহায়তা। প্রস্তাবিত পদ্ধতি শিক্ষার সেই মূল উদ্দেশ্যটিকেই সংকুচিত করবে না তো?
প্রাথমিক শিক্ষা কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের প্রোডাকশন সিস্টেম নয়। একেকটি শিফট শেষে উৎপাদনের হিসাব মিলিয়ে কর্মীর দক্ষতা নির্ধারণ করার চেষ্টা এখানে অযৌক্তিক। এখানে প্রতিটি শিশুর শেখার গতি আলাদা, তার প্রয়োজনও অন্য। শিক্ষকের দায়িত্ব অবশ্যই নির্ধারণযোগ্য এবং তাঁর জবাবদিহিতাও কাম্য। কিন্তু জবাবদিহির নামে শিক্ষকের বেতনবৃদ্ধিকে ছাত্রছাত্রীর ফলাফলের সঙ্গে শর্ত হিসাবে জুড়ে দেওয়াটা সমাধান নয়, উলটে হতে সমস্যাবৃদ্ধির নয়া উপকরণ। এই মুহূর্তে জরুরি হল—সুশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ক্লাসরুমসহ সমগ্র পরিকাঠামোর উন্নয়ন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা। শিক্ষকদের মূল্যায়নে আন্তরিক হলে তাঁদের কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। প্রাথমিক শিক্ষার হাল ফেরাতে প্রথমে নিজ দায়িত্বপালনের প্রমাণ রাখুক সরকার। প্রয়োজনীয় সহায়তা ও স্বাধীনতা দেওয়ার পরেই শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা দাবি করা বাঞ্ছনীয়। শিক্ষার সংকটের দায় কোনো একক শিক্ষক বা পড়ুয়ার নয়, সমানভাবে রাষ্ট্রেরও।