


শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। এই পর্বে ইসিআইনেট পোর্টালে রাজ্যের ইআরওদের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ উঠেছিল আগেই। এমনকি বাংলায় ১৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ৮৮৭ জন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে খোদ নির্বাচন কমিশনই এসআইআর ট্রাইবুনালে আবেদনও জানিয়েছে। এনিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথাও সম্প্রতি সামনে এসেছিল। বিষয়টি নিয়ে শোরগোল চলছে।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে ককরোচ ও বিরোধীরা। তার মধ্যেই এবার এসআইআরের সময় ব্যবহৃত ‘ইনিউমারেশন ফর্ম’-এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেল। অভিযোগ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ বা অন্তর্ভুক্তির জন্য ব্যবহৃত ওই ফর্মটি ‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টোরাল রুল, ১৯৬০’-এর অনুযায়ী সাযুজ্য পূর্ণ নয়। অর্থাৎ আইনের বাইরে গিয়েই জ্ঞানেশ কুমার এসআইআরে ওই ফর্ম ব্যবহার করেছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর অভিযোগ, সবটাই আইনের আওতার বাইরে গিয়ে করা হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেই এটা করেছে কমিশন। মমতা তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ আবার গোটাটাকেই ভোট-লুটের চক্রান্ত বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ইনিউমারেশন ফর্মকে হাতিয়ার করেই বিজেপি ভোট-লুটের যাবতীয় চক্রান্ত করেছিল, যার ব্লুপ্রিন্টের রচয়িতা স্বয়ং জ্ঞানেশ কুমার।
‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টোরাল, ১৯৬০’-এর ৮ নম্বর রুল অনুযায়ী, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন অর্থাৎ এসআইআর এবং বিশেষ সংশোধন বা এসআরের সময় বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে হবে ৪ নম্বর ফর্ম। কোনো ভোটারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে সেই ‘ফর্ম ৪’ ইস্যু করবেন ইআরও। সংশ্লিষ্ট ভোটারকে তা পূরণ করে জমা দিতে হবে। এবং ওই ফর্ম যাচাই করে ইআরও-ই সিদ্ধান্ত নেবেন যে, সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম তালিকায় থাকবে, না বাদ যাবে। সেই আইনকে কার্যত ‘বুড়ো আঙুল’ দেখিয়েছে খোদ কমিশন। এসআইআরের সময় ভোটারদের বাধ্য করা হয়েছে ইনিউমারেশন ফর্ম পূরণে। নিয়ম অনুযায়ী, ‘ফর্ম ৪’-এ কোথাও ভোটার সম্পর্কে তথ্য ছাপানো থাকে না। কিন্তু এসআইআর পর্বে কমিশনের তরফে যে ইনিউমারেশন ফর্ম দেওয়া হয়, তাতে ২০২৫ সালের তালিকা অনুযায়ী ভোটারের নাম, এপিক নম্বর, ঠিকানা, ক্রমিক সংখ্যা, পার্ট নম্বর এবং বিধানসভা/লোকসভা কেন্দ্র আগে থেকেই ছাপা ছিল। আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন— আইনে না থাকলেও কীভাবে তা ইস্যু করা হল? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনের সময় ২৫ নম্বর রুল অনুযায়ী সেটি নতুন করে প্রস্তুত করতে হবে। অর্থাৎ, নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির সময় যেভাবে ৪ নম্বর থেকে ২৩ নম্বর রুল মাথায় রেখে প্রতিটি পদক্ষেপে তা অনুসরণ করা হয়, এক্ষেত্রেও তাই করতে হবে। আর এই বক্তব্যের সূত্র ধরেই সামনে এসেছে ‘ফর্ম ৪’-এর প্রসঙ্গ। গোটা এসআইআর পর্বে ৪ নম্বর ফর্মের ব্যবহার কেন হল না, সেই প্রশ্ন তুলছেন আইনি বিশেষজ্ঞরা। যদিও কমিশনের একাংশের ব্যখ্যা, এসআইআর ছিল ভোটার তালিকা প্রস্তুতির সম্পূর্ণ একটি নতুন প্রক্রিয়া। কিন্তু সেটাই যদি হবে, তাহলে ইনিউমারেশন ফর্মে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার তথ্য আগে থেকে ছাপানো হয়েছিল কেন? সেই প্রশ্নের কোনো জবাব মেলেনি কমিশন সূত্রে।
‘ফর্ম ৪’ ব্যবহার না করা নিয়ে কমিশনের দিকেই আঙুল তুলেছেন বিকাশবাবু। তিনি বলেন, এই বিষয়গুলি সুপ্রিম কোর্টে বারবার জানানোর পরও সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে অনুমতি দিয়েছিল। কোনো হস্তক্ষেপ করেনি। আগে থেকে ছাপানো ফর্ম না দিয়ে কমিশনের উচিত ছিল, সশরীরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেক ভোটারের তথ্য যাচাই করা। কোনো যোগ্য ভোটার যাতে বাদ না পড়ে, সেটা দেখাই কমিশনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অথচ তারা উলটো কাজ করেছে।