


অঞ্জনা চট্টোপাধ্যায়: ফেলুদার গল্পে সত্যজিৎ রায় যেমন নিখুঁত রহস্যের জাল বুনেছেন ঠিক তেমনই নিখুঁতভাবে বর্ণনা দিয়েছেন বিভিন্ন স্থানের। চারটি অসমাপ্ত গল্প বাদ দিলে ফেলুদাকে নিয়ে লেখা গল্পের সংখ্যা পঁয়ত্রিশ। এইসব গল্পে দেখা যায় রহস্যভেদ করার জন্য ফেলুদা কখনও পৌঁছে গিয়েছে নদীয়ার ঘুরঘুটিয়ায় কখনও আবার লন্ডনে। পুরীর সমুদ্রতট হোক বা ইলোরার গুহা, কোথাওই ফেলুদার হাত থেকে রেহাই পায়নি অপরাধী। বেড়াতে গিয়েও বার বার রহস্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে ফেলুদাকে, তা সে কাটোয়া সংলগ্ন গোঁসাইপুরই হোক বা বোম্বাইয়ের শিবাজি ক্যাসল। তবে রহস্যভেদের জন্য ফেলুদা বোধহয় সবচেয়ে বেশি গিয়েছে পাহাড়ে বা কোনও পাহাড়ি অঞ্চলে। দার্জিলিং, গ্যাংটক, কাঠমাণ্ডু থেকে শুরু করে কেদারনাথের রুদ্রপ্রয়াগ, কাশ্মীরের পহেলগাঁও, ইতিহাস বইতে পড়া ইলোরার গুহা কোথায় যায়নি ফেলুদা!
সত্যজিৎ রায় ফেলুদাকে নিয়ে প্রথম যে গল্পটি লিখেছিলেন তার নাম ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি। গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল সন্দেশ পত্রিকায়। অগ্রহায়ণ-পৌষ-মাঘ ১৩৭২ সংখ্যায়। এই গল্পের পটভূমি দার্জিলিং। গল্পের মুখ্য চরিত্র রাজেনবাবু থাকেন জলাপাহাড়ে। রোজ বিকেলে ম্যাল-এ আসেন। সেখানেই আলাপ হয় তপসের সঙ্গে। রহস্য ঘনীভূত হয় যখন রাজেনবাবু একটি হুমকি চিঠি পান এবং তপসে সেটা জানতে পেরে ফেলুদাকে বলে ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখতে। এই গল্পটি পড়লে দার্জিলিং ম্যাল সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যায়। গল্পে যেমন লেখা হয়েছে এখনও ম্যাল-এর পাশে একধারে তেমনই একটি কিউরিও শপ দেখা যায়। বিকেলবেলায় শোনা যায় ব্যান্ডের গান।
গ্যাংটকে গণ্ডগোল গল্পে শশধর বোস খুব সহজে ফেলুদাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন ওখানে পাহাড়ি রাস্তায় কেন ল্যান্ডস্লাইড হয়। তিনি বলেছেন ‘আসলে এ দিকের পাহাড়গুলো, যাকে বলে গ্রোইং মাউনটেনস। এখনও বাড়ছে। তাই একটু অস্থির আর কাঁচা। ইয়াং বয়সে যা হয় আর কি!’
এই গল্পে সত্যজিৎ রায় গ্যাংটক থেকে রুমটেক যাওয়ার এমন সুন্দর বর্ণনা দিয়েছেন যে গল্প পড়তে পড়তে মনে হবে সবকিছু চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শুধু রুমটেক নয়, গ্যাংটক থেকে পেমিয়াংচি যাওয়ার বর্ণনাও আছে এই গল্পে। আছে পাহাড়ি অঞ্চলের ভূত তাড়ানো নিশানের কথা। এই গল্প থেকেই আমরা জানতে পারি সিকিমের সবচেয়ে শুকনো আর সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর জায়গা হল নামচি।
এবার আসা যাক কৈলাসে কেলেঙ্কারি গল্পের কথায়। কৈলাস বললেই মনে পড়ে যায় কৈলাস পর্বতের কথা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিব-দুর্গার ছবি। তবে এই গল্পে কিন্তু পুরাণে উল্লেখিত কৈলাস পর্বতের কথা বলা হয়নি। এখানে কৈলাস হল ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ইলোরা-র একটি গুহা। যেখানে ‘তিন দিকে পাহাড়ের দেওয়ালের মাঝখানে রয়েছে কৈলাস মন্দির’। এই গল্পের রহস্য দানা বেঁধেছে মূর্তি পাচারকে কেন্দ্র করে। ভুবনেশ্বরের রাজারানি মন্দির থকে অপহৃত যক্ষীমূর্তির মাথা খুঁজতে গিয়ে ফেলুদা পৌঁছে যায় ইলোরাতে। সঙ্গে থাকে তপসে আর জটায়ু। এই গল্পের বেশিরভাগ জুড়ে আছে ইলোরার কথা। আছে ইলোরার বিভিন্ন গুহার বর্ণনা।
যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে গল্পের এক জায়গায় লালমোহনবাবু ওরফে জটায়ু বলছেন ‘সে আপনার নীলগিরি, বিন্ধ্য, আরাবল্লী, ওয়েস্টার্ন ঘাটস- যাই বলুন না কেন, পাহাড়ের মাথায় যদি বরফ না থাকে তাকে আমি পাহাড়ই বলব না।’ এই গল্পের পটভূমি নেপালের কাঠমাণ্ডু আর রহস্য জাল ওষুধ নিয়ে। এই গল্প পড়লে মানসচক্ষে পাহাড়ের চূড়ায় বসানো বৌদ্ধস্তূপ স্বয়ম্ভুনাথে ঘোরা হয়ে যায়। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখা যায় পশুপতিনাথের মন্দির। কাঠের তৈরি মন্দিরের রুপোর দরজা, সোনার চূড়া, পাথরের বেদীতে বসানো নন্দীর মূর্তি, নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাগমতী নদী।
এবার কাণ্ড কেদারনাথে গল্পে একটি বিশেষ ভূমিকায় আছেন লালমোহনবাবু, যিনি জটায়ু ছদ্মনামে রহস্য উপন্যাস লেখেন। সোনার কেল্লা গল্পে প্রথম জটায়ুর দেখা মেলে। তবে এই গল্পে তাঁর ভূমিকা একটু অন্য ধরনের। এই গল্পে রহস্যের পটভূমি রুদ্রপ্রয়াগ। রুদ্রপ্রয়াগের পূর্বদিকে নেপাল আর পশ্চিমদিকে কাশ্মীর। ফেলুদা কীভাবে শ্রীনগর থেকে পাহাড়ি রাস্তা ধরে রুদ্রপ্রয়াগ পৌঁছল তার বিশদ বর্ণনা আছে এই গল্পে। এই গল্প থেকেই আমরা জানতে পারি হৃষীকেশ থেকে বেরিয়ে ১৪০ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা ধরে রুদ্রপ্রয়াগ যাওয়ার পথে তিনটি জায়গা পড়ে— দেবপ্রয়াগ, কীর্তিনগর আর শ্রীনগর। তবে এই শ্রীনগর জম্মু-কাশ্মীরের রাজধানী নয়, এটি হল গাড়োয়াল জেলার রাজধানী।
প্রথম গল্প ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি প্রকাশিত হওয়ার ২১ বছর পর প্রকাশিত হয় দার্জিলিং জমজমাট গল্পটি। প্রথম গল্পের মতোই এই গল্পের পটভূমিও দার্জিলিং। এখানে ফেলুদা আর তপসের সঙ্গী হিসেবে লালমোহনবাবুও আছেন। আছে বোম্বাইয়ের বোম্বেটে গল্পের ফিল্ম ডিরেক্টর পুলক ঘোষাল। এই গল্পে পাহাড়ের বর্ণনা তেমন নেই তবে পাহাড়ের কোলে লাল টালির ছাদওয়ালা কাঠের বাংলো বাড়ি
নয়নপুর ভিলাতে ফিল্মের শ্যুটিং চলার সময় বাড়ির মালিক বিরূপাক্ষ মজুমদারের খুন হওয়ার গল্প পড়তে পড়তে পাঠকের মনে হবে সে যেন সশরীরে ওখানেই রয়েছে। ‘পাহাড় তো বটেই; আর পাহাড় বলতে আমি হিমালয়ই বুঝি। বিন্ধ্য, ওয়েস্টার্ন ঘাটস- এ সব আমার কাছে পাহাড়ই নয়। আমার মন যেখানে যেতে চাইছে সেখানে না গেলে না কি জন্মই বৃথা’ ভূস্বর্গ ভয়ংকর গল্পে লালমোহনবাবু কাশ্মীর সম্বন্ধে এই কথাগুলোই বলেছেন। এই গল্প থেকে আমরা কাশ্মীরের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন শ্রীনগর, গুলমার্গ, পহেলগাঁওয়ের সম্বন্ধে জানতে পারি। সঙ্গে এটাও জানতে পারি যে, পাহাড় থাকলেও দার্জিলিং বা সিমলার সঙ্গে এই অঞ্চলের কোনও মিল’ই নেই।
ফেলুদার গল্পে পাহাড়ের প্রসঙ্গ এলে আর যে দুটো গল্পের কথা না বললে চলে না তার একটা হল বাদশাহী আংটি আর একটি ছিন্নমস্তার অভিশাপ। কারন এই গল্প দুটোতে পাহাড়ের একটা মস্ত ভূমিকা রয়েছে। ফেলুদাকে নিয়ে লেখা দ্বিতীয় গল্প বাদশাহী আংটি-তে হৃষীকেশ যাওয়ার সময়ই খুলেছিল রহস্যের জট। আর ছিন্নমস্তার অভিশাপ গল্পে রহস্যের শুরু হয়েছিল রাজারাপ্পা জলপ্রপাতের কাছে পিকনিক করতে গিয়ে।
সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ফেলুদার স্কেচ