


বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ‘বিকশিত ভারত’-এর খোয়াব দেখিয়ে কেন্দ্রের মোদি সরকার যে ক’টি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প চালু করেছে, ‘অটল পেনশন যোজনা’ তার মধ্যে অন্যতম। বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পের হাত ধরে দেশের ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। মাসিক প্রিমিয়াম মাত্র ৪২ টাকা থেকে শুরু। উপভোক্তার বয়স ৬০ বছর পেরলে মাসে মাসে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন মিলবে। প্রকল্পটি দ্রুত জনপ্রিয় করার স্বার্থে কেন্দ্র ঘোষণা করেছিল, প্রিমিয়ামের একাংশ বহন করবে তারাও। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতে এই যোজনার বেহাল দশা সামনে এসে পড়ল। ক্যাগ তাদের অডিট রিপোর্টে জানাচ্ছে, এই যোজনার প্রায় অর্ধেক গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম মেটাতে পারছেন না। এখনও পর্যন্ত এই প্রকল্পে নথিভুক্ত গ্রাহকের সংখ্যা আট কোটি ছুঁইছুঁই। সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরে সরকারের সাফল্য প্রচারে কোনো খামতি রাখেনি কেন্দ্র। কিন্তু প্রচার আর বাস্তবে যে বিস্তর ফারাক, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে ক্যাগ রিপোর্টেই।
২০১৫ সালের জুন মাসে চালু হয় ‘অটল পেনশন যোজনা’। সরকার জানায়, ওই অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে যাঁরা এই প্রকল্পে নাম লেখাবেন, তাঁদের প্রিমিয়ামের অর্ধেক টাকা পাঁচ বছর পর্যন্ত বহন করবে সরকার। ভরতুকির সর্বোচ্চ অঙ্ক বছরে এক হাজার টাকা। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর, অর্থাৎ সাত মাসের মধ্যে দু’কোটি নাগরিককে পেনশন প্রকল্পে নথিভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নেয় কেন্দ্র। কিন্তু ক্যাগ জানাচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে লক্ষ্যপূরণ তো দূরের কথা, ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত মাত্র ২০ লক্ষ ৯৭ হাজার গ্রাহক নথিভুক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার দশ ভাগের এক ভাগ। যাঁরা সেই সময় গ্রাহক হয়েছিলেন, তাঁদের মাত্র ৫০.৮৩ শতাংশ গ্রাহক নিয়মিত প্রিমিয়াম জমা করছেন। বাকিরা অনিয়মিত প্রিমিয়াম মেটাচ্ছেন। ক্যাগের দাবি, ২০২৪ সালে এসে অটল পেনশনের গ্রাহক সংখ্যা ৪ কোটি ২৩ লক্ষে পৌঁছায়। কিন্তু প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। এই রিপোর্ট সম্প্রতি সামনে এলেও বর্তমানে আট কোটি গ্রাহকের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়নি বলেই জানাচ্ছেন দপ্তরের পদস্থ কর্তারা।
এ তো গেল অনিয়মিত প্রিমিয়ামের হিসাব। কোনো প্রিমিয়াম জমা না দিয়ে মাঝপথে পেনশন প্রকল্প ছেড়ে দিয়েছেন—এমন গ্রাহকের সংখ্যাও চমকে ওঠার মতো। সংশ্লিষ্ট কর্তাদের দাবি, প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ গ্রাহক এই প্রকল্প চালিয়ে যেতে না পেরে মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে এই সংখ্যাটা প্রায় ১০ লক্ষ। প্রায় ১৫ শতাংশ গ্রাহক প্রিমিয়াম না মিটিয়ে প্রকল্প ছেড়ে দিচ্ছেন, বিগত কয়েক বছর ধরে এমন প্রবণতা স্পষ্ট। প্রকল্প ছাড়ার সময় তার কারণ লিখিতভাবে জানাতে হয় গ্রাহককে। সরকারি তথ্য বলছে, এক্ষেত্রে বেশিরভাগ উপভোক্তার যুক্তি, প্রকল্প চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো টাকা তাঁদের হাতে নেই। আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, সরকার প্রিমিয়ামে ভরতুকি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেও তা পেয়েছেন সামান্য কয়েকজনই। কারণ, ২০১৬ সালের এপ্রিল থেকে যাঁরা নথিভুক্ত হয়েছেন, তাঁদের কোনো ভরতুকি দেয়নি কেন্দ্র। এই আর্থিক সুবিধা চালু থাকলে হয়তো পরিস্থিতি এতটা করুণ হত না। সরকারের অবশ্য দাবি, ভরতুকি বন্ধ হলেও প্রকল্পটি জনপ্রিয় করতে বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি দেশের নানা জায়গায় শিবির করে প্রচার চলছে। আরও একাধিক পদক্ষেপ করা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছে কি? যেখানে সংসার চালানোর খরচ জোটাতেই নাভিশ্বাস উঠছে, সেখানে ‘বিকশিত ভারত’-এর অনেকের কাছে প্রিমিয়ামের সামান্য টাকা জোগাড়ই বড়ো দায়!