


বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: বাঙালির কাছে পয়লা বৈশাখ শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর দিন নয়, বাংলা ও বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের কাছে হালখাতা ছিল এক উৎসবের নাম। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এই চিরচেনা ঐতিহ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার যুগে বাঙালির চির ঐতিহ্য ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে। হারাতে বসেছে হালখাতার সংস্কৃতি।
একসময় নববর্ষের অন্তত ১৫দিন আগে থেকেই শহর ও গ্রামের দোকানগুলোতে সাজসাজ রব পড়ে যেত। কার্ড ছাপানো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিমন্ত্রণ এবং বছরের প্রথম দিনে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে নতুন খাতা খোলার সেই উৎসবমুখর পরিবেশ এখন অনেকটাই ফিকে। হালখাতা কেবল পাওনা আদায়ের মাধ্যম ছিল না, এটি ছিল ক্রেতা-বিক্রেতার সুসম্পর্ক ঝালিয়ে নেওয়ার দিন। মিষ্টিমুখ, লাড্ডুর প্যাকেট আর নতুন ক্যালেন্ডারের যে আনন্দ ছিল, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে তা আজ কেবল নিয়মরক্ষায় এসে ঠেকেছে বলে অনেকে মনে করেন। কারণ, মানুষ এখন এক দোকানে থিতু না থেকে বড় শপিং মল বা ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকছে। যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে যান্ত্রিক লেনদেনই প্রধান। নগদে বা ধারে কেনাকাটার বদলে মানুষ ডিজিটাল পেমেন্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। যা দীর্ঘমেয়াদী ‘বকেয়া’ রাখার প্রথাকে কমিয়ে এনেছে। এছাড়া অনেক ব্যবসায়ী এখন পয়লা বৈশাখের বদলে অক্ষয় তৃতীয়া, ইয়ার এন্ডিং কিংবা কালীপুজার সময় হালখাতা করছেন। এর ফলে বাঙালির নববর্ষের মূল আকর্ষণটি কমেছে।
আগে পয়লা বৈশাখে বিশেষ করে সোনার দোকানগুলিতে যে রমরমা হালখাতা হতো, নামী-দামি ব্র্যান্ডের শোরুম আসায় সেই ধার বাকি বা ব্যক্তিগত খাতিরের জায়গাটিও আর নেই। এখন হালখাতা উৎসব ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে কিছু দোকানে এখন ঐতিহ্য মেনে কোথাও হালখাতা হলেও ক্রেতাদের সেভাবে সাড়া মেলে না।
ব্যবসায়ীরা বলেন, বিশেষ করে আগে পয়লা বৈশাখের দিন সোনার দোকানগুলিতে ক্রেতাদের আনাগোনায় গমগম করত। ক্রেতাদের ঠান্ডা পানীয় ও স্পেশাল লাড্ডু খাইয়ে মিষ্টিমুখ করাতেন দোকানদাররা। ক্রেতারা বকেয়া পাওনা মিটিয়ে লাড্ডুর প্যাকেট, ক্যালেন্ডার নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু এখন বিভিন্ন সংস্থার সোনার শোরুম খুলে গিয়েছে। সেখানে অবশ্য ধার চলে না। তবুও নানা ডিজাইনের গয়না পড়ে পচ্ছন্দের জন্য অনেকেই সেইসব শোরুমমুখী হচ্ছেন। ফলে এখন অধিকাংশ সোনার দোকানে হালখাতা শুধু নিয়মরক্ষার অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নলহাটির স্বর্ণ ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ কর্মকার বলেন, নানা কারণে ধার বাকিতে কাজ দিন দিন কমে আসছে। আগে প্রায় ন’হাজার ক্রেতার বাড়িতে কার্ড পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করতাম। বসে খাওয়ানোর পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্য মিষ্টির প্যাকেট, ক্যালেন্ডার তুলে দিতাম। মাইক ভাড়া কতে নিয়ে এসে দোকানের সামনে বাজাতাম। ভিড়ে গমগম করত দোকান। বছরতিনেক ধরে কিছু ক্রেতাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে নিমন্ত্রণ করে আসছি। যাঁরা আসেন তাঁদের মিষ্টিমুখ করাই। তবে আগের মতো রমরমা নেই। সব মিলিয়ে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ও আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের চাপে বাঙালির আত্মিক টানের এই উৎসবটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। হালখাতা সংস্কৃতি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বাঙালির জীবন থেকে।