


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: রোজকার অভ্যাস মতো বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল মাঠে গা ঘামাচ্ছিলেন সবুজ চট্টোপাধ্যায় (নাম পরিবর্তিত)। কার জীবনে, কখন যে কীভাবে বিপদ সামনে এসে দাঁড়ায়, কেউ জানে না। খেলতে খেলতে বিএসসি প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র সবুজ হঠাৎই বোধ করলেন, তাঁর বুকে কেউ যেন ১০ কেজির একটা পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। এই ধরনের বিচিত্র অনুভূতি তাঁর কোনোদিন হয়নি। তীব্র অস্বস্তিবোধের জন্য বন্ধুদের ডাকবেন বলে ভাবছিলেন। এমন সময় চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এল—একেবারে ব্ল্যাক আউট! ২ মিনিট কোনো হুঁশ ছিল না সবুজের। যখন চোখ খুললেন, দেখলেন বাড়ির লোকজনের উদ্বিগ্ন ছলছলে চোখ। তাঁর প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া সাইরেনের শব্দ শুনিয়ে, ভীষণ বেগে ছুটে চলেছে অ্যাম্বুলেন্স।
ঢাকুরিয়ার হাসপাতালের রোগী দেখে তখন সবে বাড়ি ফিরেছেন কার্ডিয়োলজিস্ট ডাঃ সৌম্যকান্তি দত্ত। হঠাৎ হাসপাতালের ফোন। ফের হাসপাতালমুখো হলেন। ইমার্জেন্সিতে আসার পর সবুজের ইসিজি ও অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ল—আচ্ছা আচ্ছা ডাকাবুকো মানুষের হাড় হিম করে দেওয়া শব্দ—‘এমআই’—মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন—চলতি ভাষায় হার্ট অ্যাটাক।
কিন্তু সবুজের হার্ট অ্যাটাকের ব্যাপকতা এতটাই ছিল, তাঁর না ছিল হৃৎস্পন্দন, না প্রেশার। তাহলে প্রাইমারি অ্যাঞ্জিয়োপ্ল্যাস্টি হবে কী করে? টেম্পোরারি পেসমেকার দিয়ে নাড়ির গতি এনে শুরু হল প্রসিডিয়োর। ততক্ষণে চিকিৎসক জানতে পেরে গিয়েছেন, ১৯ বছরের তাজা প্রাণকে নিয়ে যাওয়ারই তাল কষছিল সাক্ষাৎ যম এসে। কারণ, সবুজের এলএমসিএ’ই (লেফট মেন করোনারি আর্টারি) ১০০ শতাংশ ব্লক। মানবশরীরের মহাধমনিতে রক্তসরবরাহকারী অন্যতম প্রধান ধমনি হল এই এলএমসিএ। এই ধমনি আবার দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। ব্লক ছাড়ানোর জন্য করা হল ক্লিপিং স্টেন্টিং, দুটি শাখাধমনিতেই পড়ানো হল স্টেন্ট। ততক্ষণে পরপর তিনবার সাক্ষাৎ মৃত্যু এসে কড়া নেড়ে দিয়ে গিয়েছে। একবার খেলার মাঠে, একবার অ্যাম্বুলেন্স করে আসতে আসতে, তৃতীয়বার ওটি টেবিলেই। তিনবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়েছিল সবুজের। শেষপর্যন্ত প্রাণ বাঁচে তরুণের। ঢাকুরিয়ার বেসরকারি হাসপাতালে যে কার্ডিয়োলজিস্টের অধীনে চিকিৎসাধীন ছিলেন সবুজ, সেই সৌম্যকান্তি বলেন, ‘শেষ একবছরে তিরিশের নীচে ১৮ জন হার্ট অ্যাটাক রোগীর চিকিৎসা করলাম। তবে উনিশে হার্ট অ্যাটাক! এককথায় ভাবাই যায় না। অতিবিরলই বটে। সবুজের কিন্তু কোনো পারিবারিক ইতিহাস ছিল না। ও ধূমপায়ীও নয়। তবে কোলেস্টেরলের সমস্যা ছিল।’ কী বলছেন শহরের বিশিষ্ট কার্ডিয়োলজিস্ট ডাঃ সরোজ মণ্ডল? তিনি বলেন, ৪০-এর নীচে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হলে তাকে বলা হয় ‘ইয়ং এমআই’। এখন প্রতি পাঁচটি হার্ট অ্যাটাকের ঘটনার মধ্যে একটি এই ‘ইয়ং এমআই’। আগে মানুষ ষাটের দিকে নিজের বাড়ি-গাড়ি করত। এখন অল্পবয়সেই সব পাওয়ার নেশায় তিরিশেই করছে। তাই ষাটের রোগ এখন তিরিশেই ধরছে!