


সংবাদদাতা, কাটোয়া: বাঙালির লোকসংস্কৃতিকে ভুলিয়ে দেওয়া সহজ নয়। এরাজ্যে ভোটের বাজারে লুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি ‘ঘোড়ানাচ’ ফের স্বমহিমায় ফিরেছে। আগেকার দিনে রাজাদের আমলে ঘোড়াকে বীরত্বের প্রতীক বোঝাত। কার আস্তাবলে কত ঘোড়ার সংখ্যা, তা নিয়েই রাজার ক্ষমতা প্রদর্শিত হত। সেখান থেকেই এক সময়ে বাংলায় জন্ম নেয় ঘোড়ানাচ। যদিও ইন্টারনেটের যুগে তা ব্রাত্য ছিল।
ভোট ময়দানে ঐতিহ্যের ঘোড়ানাচের কদর বেড়েছে রাজ্য জুড়ে। রাজনৈতিক মিটিং, মিছিলে শোভা বাড়াতে ঘোড়ানাচ শিল্পীদের ডাক পড়ছে এখন। কাটোয়া মহকুমার শিল্পীদের মুখে তাই হাসি ফুটেছে। মুখে রংচং মেখে ঘোড়ার ডামি নিয়ে নাচতে নাচতে রাজনৈতিক কর্মীদেরও উৎসাহ জোগান এই শিল্পীরা। শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, আসানসোল, হাওড়া সব জায়গায় রাজনৈতিক মিটিং, মিছিলে যাওয়ার বরাত পাচ্ছেন কাটোয়ার এই শিল্পীরা।
ঘোড়ানাচ বাংলার এক প্রাচীন লোকনৃত্য। গ্রামবাংলার নানা উৎসব ও সামাজিক অনুষ্ঠানে একসময় এই নাচের গুরুত্ব ছিল। শিল্পীরা নকল ঘোড়ার সাজ পরে ঢাক, ঢোল ও ব্যাণ্ডের তালে নৃত্য পরিবেশন করেন। আগে মাটি দিয়ে ঘোড়া তৈরি হত। এরপরে কাঠের ঘোড়ার ব্যবহার হত। এখন ফাইবারের ঘোড়া তৈরি হচ্ছে। তার উপরে সাজ পরিয়ে নেওয়া হয়। শিল্পীরা নিজেদের কোমরে বেঁধে নেন এই ঘোড়া। শিল্পীরা নিজেরাও জড়ির সব রাজ পোশাক পড়েন। আর মুখে রংচং মেখে নাচতে থাকেন। একেই ঘোড়ানাচ বলা হয়ে থাকে। প্রাচীন কালে রাজাদের যুদ্ধযাত্রা, বিজয়োৎসব ও শৌর্যের প্রতীক হিসেবেই এই নাচের প্রচলন ছিল।
আজ ইন্টারনেটের যুগে একে একে বাংলার লোকশিল্প অনেকটাই ফিকে হয়ে আসছে। রণপা নৃত্য থেকে পুতুল নাচ সবই হারাতে বসেছে গরিমা। তবে কাটোয়া মহকুমা জুড়ে এখনও প্রায় ছ’টি ঘোড়ানাচের দল রয়েছে। তাঁরা রীতিমতো সরকারি শিল্পী ভাতা পান। বর্তমানে বিধানসভা ভোটে এখন মিছিলে শোভা বাড়াতে ঘোড়ানাচ শিল্পীরা ডাক পাচ্ছেন। কাটোয়ার কোশিগ্রাম, সুদপুর, নোয়াপাড়া, আখড়া এসব গ্রামগুলিতে ঘোড়ানাচের শিল্পীর দল এখনও টিকে রয়েছে। বংশ পরম্পরায় শিল্পীরা এই পেশার সঙ্গে যুক্ত।
কাটোয়ার কোশিগ্রামের ঘোড়ানাচ শিল্পী বুদ্ধদেব সাহার কথায়, ভোটের মরশুমে আবার আমাদের ডাক পড়ছে। সুদপুরের শিল্পী বিশ্বকর্মা হালদার, ভরত হালদার, দশরথ হালদাররা বলেন, আমরা ৩২ বছর ধরে এই লোকশিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে। ভোটের বাজারে শুধু শাসকদলই নয়, বিজেপি, সিপিএম সব রাজনৈতিক দলের থেকেই ডাক পাচ্ছি। শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, আসানসোল এসব জায়গা থেকেও ডাক পাচ্ছি। এতে আমাদেরও আয় বাড়ছে।
আখড়া গ্রামের শিল্পী সমীর মণ্ডল, নন্দন রায়রা বলেন, আমরা অন্য সময়ে কেউ মাছ ধরার কাজ করি, কেউ চাষের কাজ করি। কিন্তু ভোটের সময় আমাদের কদর বেড়েছে।