


চিঠি পাঠানোর প্রথা খুবই প্রাচীন। একটা সময় ঘোড়ার উপর নির্ভর করেই আদান-প্রদান করা হত খবর। ভারতে শের শাহের আমলে ডাক ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘোড়ায় চড়া ডাক ব্যবস্থা কেমন ছিল, লিখলেন
শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়
খটখট... খটখট... খটখট!’ নিস্তব্ধ রাতে হঠাৎ দূরে ধুলো উড়িয়ে একটা শব্দ এগিয়ে আসছে। দিল্লির রাজপথ হোক কিংবা পারস্যের ধু ধু মরুভূমি— আজ থেকে কয়েকশো বছর আগে এই শব্দটাই ছিল সবথেকে উত্তেজনার। তখন না ছিল স্মার্টফোন, না ছিল হোয়াটসঅ্যাপ। অথচ রাজাদের হুকুম কিংবা যুদ্ধের খবর এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৌঁছে যেত ম্যাজিকের মতো। কীভাবে? সেই জাদুর নাম ছিল— ঘোড়ার ডাক। আজ আমরা যখন এক ক্লিকেই ই-মেইল পাঠিয়ে দিই, তখন হয়তো ভাবতেও পারব না যে, আমাদের এই খবর পাঠানোর ব্যবস্থার পেছনে লুকিয়ে আছে কত শত ঘোড়সওয়ারের বীরত্ব আর সাহসের কাহিনি।
ভারতে এই ডাক ব্যবস্থার এক দারুণ রোমাঞ্চকর ইতিহাস রয়েছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে মরক্কো থেকে এক পর্যটক ভারতে এসেছিলেন, যাঁর নাম ইবন বতুতা। তিনি যখন দিল্লিতে সুলতান মহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে পৌঁছলেন, তখন এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখে তো তাঁর চক্ষু চড়ক গাছ হয়ে গেল! সিন্ধু নদ থেকে দিল্লির দূরত্ব অনেক, যা সাধারণ মানুষের পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগত প্রায় পঞ্চাশ দিন। কিন্তু সুলতানের কাছে খবরের থলি পৌঁছে যাচ্ছে মাত্র পাঁচ দিনে! এই ব্যবস্থার নাম ছিল উল্লাক। প্রতি চার মাইল অন্তর একটা করে ছোটো গ্রাম থাকত, যেখানে রাজকীয় ঘোড়াকে সবসময় জিন পরিয়ে তৈরি রাখা হত। এক দূত ঘোড়া ছুটিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে পরের জনের কাছে খবরের থলি দিয়ে দিত, আর নতুন জন আবার বাতাসের বেগে ঘোড়া ছোটাতেন। এই খবরের থলিগুলোকে বলা হয় খরিতাহ, যা তৈরি হত মজবুত চামড়া অথবা খুব ঘন বুনটের কাপড় দিয়ে। এর মুখে লাগানো থাকত গালা দিয়ে তৈরি রাজকীয় সিলমোহর। সুলতান বা রাজার নিজস্ব চিহ্ন থাকত সিলমোহরে। এই সিল ভেঙে থলি খোলার সাহস কারও ছিল না। সিল ভাঙা মানেই ছিল সরাসরি মৃত্যুদণ্ড! এর ভেতরেই থাকত হাতে লেখা চিঠি, রাজকীয় ফরমান, যুদ্ধের খবর অথবা কখনো কখনো খুব দামি কোনো রত্ন বা জরুরি নথি।
তবে শুধুমাত্র দরকারি খবর নয়, অনেক সময় সুলতানের প্রিয় আম কিংবা পানীয়ও নাকি এভাবে কয়েকশো মাইল দূর থেকে তাজা অবস্থায় নিয়ে আসা হত! সেই সব ঘটনার কথা ইবন বতুতা তিনি তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘রিহলা’তে লিখে গিয়েছেন।
ভারতের এই ডাক ব্যবস্থাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সম্রাট শের শাহ সুরি। তিনি বুঝেছিলেন, সাম্রাজ্য ধরে রাখতে হলে যত দ্রুত সম্ভব এক জায়গার খবর অন্য জায়গায় পৌঁছনো প্রয়োজন। তাই তিনি তৈরি করলেন বিখ্যাত সড়ক-ই-আজম বা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এই রাস্তায় প্রতি আট কিলোমিটার অন্তর তিনি তৈরি করেছিলেন একটি করে সরাইখানা। সারা ভারতে এরকম প্রায় ১ হাজার ৭০০টি সরাইখানা ছিল। প্রতিটি সরাইখানাতে সবসময় দুটো করে তাজা ঘোড়া তৈরি রাখা হত শুধু খবর আদান-প্রদানের জন্য। এই সরাইখানাগুলোকেই বলা হত ‘ডাক চৌকি’। তাই শের শাহের শাসনকালে খবর পৌঁছত বিদ্যুতের গতিতে। একবার ভাব তো, সেই আমলের সরাইখানাগুলো ছিল আজকের যুগের ওয়াইফাই রাউটারের মতো, যেখান থেকে সংবাদের থলি এক হাত থেকে অন্য হাতে যেত!
শুধু এ দেশেই নয়, সারা পৃথিবী জুড়েই রাজারা সংবাদ আদান-প্রদানে ঘোড়ার ওপর ভরসা করতেন। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে পারস্যের রাজা প্রথম দারায়ুস তৈরি করেছিলেন চাপার খানা। সেখানেও ঘোড়সওয়াররা দিনরাত এক করে খবর নিয়ে ছুটতেন। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস এই ডাকহরকরদের সাহস দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি লিখেছিলেন, তুষারপাত, বৃষ্টি বা রাতের অন্ধকারও এদের গতি কমাতে পারে না।
ঘোড়ার ডাকের কথা বললে মঙ্গোলিয়ার দুর্ধর্ষ যোদ্ধা চেঙ্গিস খানের কথা আসবেই। তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য তিনি সামলাতেন ইয়াম নামক এক ব্যবস্থার মাধ্যমে। চেঙ্গিস খানের ডাকহরকররা গলায় এক ধরনের বিশেষ ধাতব ফলক ঝোলাতেন, যাকে বলা হত পাইজা। এটি ছিল মঙ্গোলিয়ার সবথেকে শক্তিশালী ভিআইপি পাস। রাস্তার ওপর এই ফলক দেখালে স্বয়ং সম্রাটকেও পথ ছেড়ে দিতে হত! এমনকি বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো যখন মঙ্গোলিয়ায় যান, তিনি লিখেছিলেন যে এই ডাকহরকররা দিনে প্রায় তিনশো মাইল পথ পাড়ি দিত, যা সেই যুগে অবিশ্বাস্য ছিল।
আমেরিকার ইতিহাসেও এই ঘোড়ার ডাকের এক অদ্ভুত গল্প আছে, যাকে বলা হত পনি এক্সপ্রেস। ১৮৬০ সালে যখন আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছে, তখন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কনের একটি ভাষণ দ্রুত দেশের অন্য প্রান্তে পৌঁছনো খুব জরুরি ছিল। সেই সময় মাত্র ১০ দিনে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কিশোর ডাকহরকররা সেই ভাষণ পৌঁছে দিয়েছিল। এই পনি এক্সপ্রেসে কাজ করতে হলে খুব সাহসী হতে হত। ছোটো আর হালকা ওজনের কিশোরদের সওয়ারি হিসেবে নেওয়া হত যাতে ঘোড়া দ্রুত দৌড়তে পারে। কিংবদন্তি কাউবয় বাফেলো বিল মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে এই পনি এক্সপ্রেসে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁকে ঘিরে একটা গল্প চালু আছে। তাঁর ভালো নাম উইলিয়াম ফ্রেডেরিক কোডি। ১৮৬০ সালের এক তপ্ত দিনে তিনি প্রয়োজনীয় চিঠি নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলেন। চারদিকে ধু ধু মরুভূমি আর পাথুরে পাহাড়। বাফেলো বিলের কাঁধে ছিল ঝোলানো একটা চামড়ার ব্যাগ, যার নাম মচিলা (আমেরিকার খবরের থলি)। বিল তাঁর নির্ধারিত ৭৬ মাইল পথ পেরিয়ে থ্রি ক্রসিং স্টেশনে পৌঁছন। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল, ঘোড়াটা ফেনা তুলছিল মুখ দিয়ে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলেন তাঁর বদলি সওয়ারি নিখোঁজ! সে এক সংঘর্ষে মারা গিয়েছে!
বিল এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। তিনি জানতেন, এই থলির ভেতর থাকা চিঠিগুলো সময়ের আগে পৌঁছনো কতটা জরুরি। তিনি ক্লান্ত ঘোড়া বদলে নিলেন, জোরে শিস দিলেন আর নতুন একটা তাজা ঘোড়ায় চেপে আবার ছুটতে শুরু করলেন। এবার তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও ৮৫ মাইল দূরের রকি রিজ স্টেশন। ধুলো উড়িয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে, কখনো বা বন্য পশুর ভয় উপেক্ষা করে বিল যখন সেখানে পৌঁছলেন, তখন তিনি টানা ১৬১ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন!
কিন্তু গল্পের আসল টুইস্ট এখানেও শেষ হয়নি। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন উলটো দিক থেকে আসা ডাক নিয়ে যাওয়ার মতো কেউ নেই। বিল এক মুহূর্ত বিশ্রাম না নিয়ে সেই ফিরতি ডাক নিয়ে আবার নিজের স্টেশনের দিকে ঘোড়া ছোটালেন। যখন তিনি শেষমেশ থামলেন, তখন কেটে গেছে টানা ২১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। এই সময়ের মধ্যে বিল পাড়ি দিয়েছিলেন প্রায় ৩২২ মাইল (প্রায় ৫১৮ কিলোমিটার) পথ! আর এই অবিশ্বাস্য কাজের জন্য তাঁকে বদলাতে হয়েছিল
২১টি ঘোড়া।
আজকের যুগে ৫১৮ কিলোমিটার পথ একটা ভালো গাড়িতে যেতেও অনেক সময় লাগে, আর বিল সেই পথটা পাড়ি দিয়েছিলেন শুধু ঘোড়ার পিঠে চেপে আর নিজের অদম্য জেদের ওপর ভর করে। যদিও অনেক ঐতিহাসিক বলেন যে বিল হয়তো নিজের হিরো ইমেজ দেখানোর জন্য গল্পটা একটু বাড়িয়ে বলেছিলেন, কিন্তু পনি এক্সপ্রেসের ইতিহাসে এই ‘লং রাইড’ আজও সাহসের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
এই সব রোমাঞ্চের আড়ালে ছিল আত্মবিশ্বাস। রাতের অন্ধকারে কুপি জ্বালিয়ে বা শুধু ঘোড়ার খুরের শব্দে ভরসা করে যখন এই রানাররা বনের মধ্য দিয়ে ছুটতেন, তখন তাঁরা জানতেন না সামনে বাঘ-ভালুক নাকি ডাকাত ওত পেতে আছে। কিন্তু রাজকীয় দায়িত্ব বলে কথা! তাঁদের কাছে খবরের ওই থলিটা ছিল প্রাণের চেয়েও দামি। এই ঘোড়সওয়াররাই ছিলেন সেই সময়ের অদৃশ্য যোদ্ধা, যাঁদের সাহসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল বড়ো বড়ো সাম্রাজ্য।
আজ আমরা যখন মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে মেসেজ টাইপ করি, তখন হয়তো সেই রানারদের হাতের ঘণ্টির শব্দ বা ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শোনা যায় না। কিন্তু একদিন তাঁরাই তৈরি করেছিলেন এক নিখুঁত নেটওয়ার্ক, যার কোনো তার বা টাওয়ার ছিল না, ছিল শুধু শক্তিশালী কিছু ঘোড়া আর এক বুক অসীম সাহস। আজকের আধুনিক ইন্টারনেট আসলে সেই পুরানো দিনের ধুলো ওড়ানো ঘোড়ার ডাকেরই এক ডিজিটাল রূপ!