


সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই গত এক মাস ধরে মুঠোফোনে ভেসে উঠছে আরব দুনিয়ার ভয়ঙ্কর যুদ্ধে মানুষের দুর্গতি, ধ্বংস ও মৃত্যুর ভয়াবহ দৃশ্য, যা ডেকে আনতে পারে মনোরোগ। আলোচনায় বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাঞ্জন পান।
মাঠে কবরের সারি। তবে কোনোটি দৈর্ঘ্যে খুব বেশি বড় নয়। শায়িতদের কারও বয়স চার, কারও ছয় অথবা আট-দশ। কিছুক্ষণ আগে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে এসেছিল। চলতি মাসের শুরুতে তেহরানে মেয়েদের এক প্রাথমিক স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল আমেরিকা-ইজরায়েলি বাহিনী। ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় ১৬৫ শিশুর দেহ! শিশুদের সেই গণকবরের ছবি আলোড়ন ফেলে দেয়। যা দেখে আঁতকে উঠেছিলেন বিশ্বের সংবেদনশীল মানুষ। এটা উদাহরণ মাত্র। সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলে আজকাল মুঠোফোনে মাঝে মধ্যেই ভেসে ওঠে এমন বীভৎস নানা দৃশ্য। কোনোটা ইরানের। কখনো ঘটনা প্যালেস্তাইনের। বা বিশ্বের অন্য যে কোনো প্রান্তের। হয়তো সেই ছবি বা ভিডিয়ো আমরা মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মুহূর্তের মধ্যে সরিয়ে ফেলতে পারি। কিন্তু স্মৃতি থেকে রেশ মুছে যায় না। তাড়িয়ে বেড়ায় মরমি মানুষজনকে। আজীবন। কারণ কী? আসলে আমাদের মস্তিষ্ককে প্রথম সজাগ করে অ্যামিগডালা। একে ‘ভয়ের কেন্দ্র’ও বলা যেতে পারে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, অবসাদের মতো সমস্যায় অ্যামিগডালার ভূমিকা থাকে। কোনো বীভৎস দৃশ্য দেখলে এই অংশটি প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তখন তা স্মৃতি হিসেবে চালান করে দেয় পাশের হিপোক্যাম্পাসে। পরে যা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি হিসেবে স্থান করে নেয় আমাদের গুরুমস্তিষ্কে।
শিশুদের উপরে প্রভাব: আবেগ জড়িয়ে থাকে এমন কিছু সবথেকে বেশি প্রভাব ফেলে শিশুমনে। মানব মস্তিষ্কের গঠন প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। কয়েক বছর ধরে চলে। মস্তিষ্কের গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পায় বছর পঁচিশের কোঠায় এসে। কিন্তু অ্যামিগডালা এবং হিপোক্যাম্পাসের সংযোগ স্থাপিত হয় শৈশব থেকে। ফলে ছোটোবেলায় ভয়ঙ্কর স্মৃতি সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে তার ভবিষ্যৎ জীবনে। শিশুকে গ্রাস করতে পারে অযথা ভীতি। ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে সাহসের ঘাটতি। অনেকে আবার নিজেকে সবকিছু থেকে গুটিয়ে নেয়। গ্রাস করতে পারে মৌনতা। এর বিপরীত উদাহরণও কম নয়। অর্থাৎ, বীভৎস দৃশ্যর প্রভাব শিশুকে আগামী দিনে হিংসাত্মক করে তুলতে পারে। বয়সন্ধির সময় থেকে তার ব্যক্তিগত, সামাজিক এমনকী পড়াশোনার জীবনকে টেনে নিয়ে যায় অন্য খাতে। মনে রাখতে হবে, শিশু মস্তিষ্কে কোনো ভয়ঙ্কর দৃশ্য কী প্রভাব ফেলবে, সে আগ্রাসী হয়ে উঠবে নাকি নিজেকে গুটিয়ে নেবে, তা নির্ভর করে বংশগতি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উপরে। শিশুর বিকাশে এই দুইয়ের প্রভাব অপরিসীম।
বড়োদের উপরে প্রভাব: এই ধরনের মর্মান্তিক দৃশ্যের অভিঘাতে সংবেদনশীল মানুষজন সবথেকে বেশি ধাক্কা খান। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা দেয় চূড়ান্ত হতাশা। মানুষ সম্পর্কে। জীবন সম্পর্কে। সামগ্রিক ভাবে সভ্যতার উপরে। অনেকে ভোগেন পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসওর্ডার বা পিটিএসডি’তে। এমনকী অনেকের স্বপ্নেও ঘোরাফেরা করে বীভৎস দৃশ্যগুলো। আক্রান্ত ব্যক্তি একসময় নিজেকে এই ঘটনার সাক্ষী হিসেবে মনে করেন। তখন খাওয়া, ঘুম থেকে দৈনন্দিন সমস্ত কাজকর্ম বাধাপ্রাপ্ত হয়।
করণীয়: নেতিবাচক দৃশ্যের প্রভাবে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। খাওয়া কমে যাওয়া, ঘুমের ব্যাঘাতের মতো সমস্যা অবসাদের উপসর্গ হতে পারে। তাও আমাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন।
লিখেছেন রাহুল চক্রবর্তী