


শুভজিৎ অধিকারী, কলকাতা: ‘আমার ঠাকুরমা ছিল বেশ ডানপিটে। ইংরেজদের বঁটি ছুঁড়ে মেরেছিল। যতদূর মনে পড়ে, সেটা দেশ স্বাধীন হওয়ার তিনমাস আগের ঘটনা।’
দেবেন্দ্র মাইতির বয়স এখন ১০৩ বছর। ১৯৪৭ সালে তিনি ছিলেন পঁচিশ-ছাব্বিশের তরতাজা যুবক। ছেলেপুলে, নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার থাকে নন্দীগ্রামের সুবদি গ্রামে। বৃদ্ধ দেবেন্দ্র থাকেন পূর্ব মেদিনীপুরের কেলেঘাই পাড় সংলগ্ন শিউলিপুরের একটি বৃদ্ধাশ্রমে। কর্মকর্তা তপন দিন্ডা জানান, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে দেবেন্দ্রবাবুর এটাই ঘরবাড়ি। সন্ধ্যা হলেই উনি হয়ে ওঠেন গল্পদাদু। তখনকার সমাজের চিত্র তুলে ধরেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি।’ বৃদ্ধাশ্রমের কর্ণধার বিষ্ণুপদ গুছাইৎ বলছিলেন, ‘এখনও শারীরিকভাবে বেশ সক্ষম দেবেন্দ্রবাবু। নিজের সব কাজ নিজেই করেন। দৃষ্টিশক্তি খানিক বিগড়েছে।’
আর বিগড়েছে স্মৃতি। বয়সের ভারে মস্তিস্ক এখন বেইমানি করে তাঁর সঙ্গে। তবুও স্বাধীনতার স্বাদ সেদিন কেমন ছিল, তা এখনও খানিক ঠাহর করতে পারেন দেবেন্দ্রবাবু। ঠাকুরমার ওই বঁটি ছুঁড়ে মারার ঘটনার পর গোটা গ্রাম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল। এই বুঝি ব্রিটিশ সেনারা এল বলে! আর তাঁদের আসা মানেই লুটপাট, মারধর, নির্যাতন। টেনে-হিঁচড়ে থানায় নিয়ে নিয়ে যাওয়া—আরও কতকিছু। ভয়ে দেবেন্দ্রদের মতো গ্রামের আরও কিছু যুবক দলবেঁধে পালিয়ে যান। আশ্রয় নেন দূরের একটি দুর্গম গ্রামে। সেখানে খুব সহজেই পৌঁছতে পারতেন না সাহেবরা। তবে, তেমন কিছু ঘটেনি।
স্মৃতির মণিকোঠায় সজোরে টোকা মেরে বৃদ্ধ বলতে শুরু করেন—‘জানিস বাপু, তোরা তো ওদের দেখিসনি। আমরা অনেক কাছ থেকে দেখেছি। ভীষণ অত্যাচারী ছিল ব্রিটিশরা। পরাধীন থাকার যন্ত্রণা আমরা প্রতি মুহূর্তে টের পেতাম। এই ধর, মাঠ থেকে সদ্য ধান উঠেছে। খবর পেয়েই ওরা দলবল নিয়ে চলে আসত। আমাদের দিয়ে ঝাড়াই-মাড়াই করিয়ে বস্তা ভরে নিয়ে পালিয়ে যেত সব ধান। পরিশ্রমের ফসল এভাবে নিয়ে চলে যাওয়া যে কতখানি বেদনার, যারা রোদে তেতেপুড়ে মাঠে কাজ করে তারাই একমাত্র বোঝে। আমাদের গ্রামে দু’একজন চাষি ধান দিতে রাজি না হলে নির্মম নির্যাতন চালাত ওরা। শুধু ধানের কথা বলি কেন! কালাবাড়ির সব্জি, পুকুরের মাছ, গোরু-ছাগল সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যেত ব্রিটিশরা। ওদেরকে সহযোগিতা করতেন দেশের বেইমান কিছু পুলিস অফিসার। তারা সংখ্যায় কম হলেও তাদের অত্যাচারের মাত্রা ছিল অত্যধিক। বাড়ির মহিলারাও তাদের হাত থেকে নিস্তার পেত না। সেদিক দিয়ে ব্রিটিশ পুলিসরা একটু ভালো ছিল। মহিলাদের সঙ্গে সেভাবে খারাপ আচরণ করত না। অন্তত আমার গ্রামে তো দেখিনি।’
বলে চলেছেন দেবেন্দ্র—‘একদিন আমার বাড়িতে ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটে গেল। পুকুরে মাছ ধরা হয়েছিল। ঠাকুরমা মাছ কাটছিল। তখন মাথার উপরে সূর্য। পাঁচ-ছ’জন সাহেব গটগট করে বাড়িতে এল। আমাদের কয়েকটা ছাগল ছিল। ঠাকুমাই তাদের লালন পালন করত। সেদিন তারা ঘরের সামনে চরে বেড়াচ্ছিল। সাহেবরা এসেই একটা হৃষ্টপুষ্ট ছাগলকে ধরে নিয়ে বলল, এটাকে নিয়ে যাচ্ছি। ঠাকুরমা ছাগলটিকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করে। কিন্তু সাহেবরা কিছুতেই শুনছিল না। তখন ঠাকুরমা ছুটে গিয়ে ওই মাছ কাটার বঁটিটা এনে ওদের ছুঁড়ে মারে। সে কি কাণ্ডরে বাপু! এক সাহেবের কপাল খানিকটা কেটে যায়। ঘটনায় ভ্যাবাচাকা খেয়ে যায় ওরা। ঠাকুমা সেই রণমূর্তি আজও আমি ভুলতে পারিনি। মাটি থেকে বঁটিটা খপ করে তুলে নিয়ে বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে শাসাতে থাকে—আর এক পা এগলে তোমাদের কেটেই ফেলব। সাহেবরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।’ দেবেন্দ্রেবাবু একটু থেমে ফের বলতে লাগলেন, ‘ঘটনাটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে গোটা গ্রামে। কংগ্রেসের কয়েকজন লোক বাড়িতে আসেন। গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত। সাহেবরা ফের এসে হামলা চালাতে পারে। ধরে নিয়ে যেতে পারে। কয়েকজন প্রবীণ মানুষের পরামর্শ মেনে আমি ও আশপাশের কয়েকজন যুবক বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই।’
টানা দু’মাস বাড়িছাড়া ছিলেন দেবেন্দ্রবাবুরা। তখনও জানতেন না ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলির ঘোষণা—১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ব্রিটিশ সরকার ভারতকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে। এই ঘোষণার পর থেকেই ব্রিটিশ পুলিস বাহিনী অনেকটাই সংযমী হয়ে পড়ে। ফলে, নন্দীগ্রামের দেবেন্দ্রবাবুদের গ্রামে পাল্টা প্রতিশোধের রাস্তায় হাঁটেনি তারা। অ্যাটলির ঘোষণাকে এগিয়ে আনেন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। মধ্যরাতে নন্দীগ্রামে খবর পেল, দেশ স্বাধীন।
বৃদ্ধ দেবেন্দ্র কাঁপছেন। কাঁপতে কাঁপতে বলছেন, ‘আমাদের সেকি আনন্দ আর উন্মাদনা। গ্রামের পর গ্রাম জেগে। চারিদিকে বাজি ফাটছে। রংমশাল জ্বলছে। আমরাও গভীররাতে পটকা ফাটাতে ফাটাতে বাড়ি ফিরলাম। ঠাকুরমা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ওরা আর আসবে না…।’ শিউলিপুরের বৃদ্ধাশ্রমে দেবেন্দ্র মাইতি। নিজস্ব চিত্র।