


আমাদের হাঁটার জন্য প্রয়োজন হয় অস্থি, অস্থিসন্ধি, স্নায়ু ও পেশির। এই সবগুলি অঙ্গের মধ্যে সঠিকভাবে মেলবন্ধন যদি না ঘটে তাহলেই হাঁটার ধরনে সমস্যা তৈরি হবে। হাঁটার ধরন দেখেই বোঝা সম্ভব হয় জটিলতা ঠিক কোথায়, নার্ভে, পেশিতে নাকি অস্থিসন্ধিতে! উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, থাইয়ের উপরের দিকের পেশিতে দুর্বলতা থাকলে তাকে বলে প্রক্সিমাল উইকনেস, এই ধরনের জটিলতা থাকলেও পড়বে হাঁটার ধরনে প্রভাব। ওই ব্যক্তির চলনভঙ্গি পেঙ্গুইন বা হাঁসের চলভঙ্গির মতো হয়ে যাবে। এই জটিলতাকে বলে ওয়াডলিং গেইট। এভাবেই অসুস্থতার সঙ্গে বদলে যায় চলনভঙ্গি।
স্ট্রোক: কোনও কোনও স্ট্রোকের রোগীর শরীরের একদিক দুর্বল হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে তিনি হাঁটার সময় তাঁর একদিকের পা সোজা হয়ে থাকে, ভাঁজ হয় না। সেক্ষেত্রে তিনি হাঁটলে মনে হবে যেন তাঁর একদিকের পা সোজা আছে আর অন্য পা বেঁকিয়ে হাঁটছেন। এই বিষয়টিকে বলে হেমিপ্লেজিক গেইট। আবার স্ট্রোকের কারণে শরীরের দুই দিকের অংশই দুর্বল হয়ে গেলে রোগী হাঁটার সময় একটা পা ক্রস করে অন্য তারপর পা রাখবে। এই সমস্যাকে বলে সিসরস গেইট বা কাঁচির মতো পা ফেলা। এই ধরনের রোগীর হাতও অনমনীয় হয়ে যেতে পারে। ফলে তিনি হাঁটার সময় মনে হয় তিনি যেন হাত শক্ত করে হাঁটছেন!
ব্রেনে জটিলতা: আবার কারও যদি ব্রেনের বেসাল গ্যাংলিয়ায় কোনও সমস্যা তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে তাঁর হাঁটার সময় শরীরে একধরনের ঝাঁকুনি দেখা দেবে। যেন হঠাত্ হঠাত্ করে এক একটি পা লাফিয়ে ফেলছেন। হাতেও একই ধরনের মুভমেন্ট দেখা যায়। এই ধরনের বিষয়টিকে কোরিফর্ম গেইট বলে।
পেরিফেরাল নার্ভ ডিজিজ: আবার কোনও রোগীর পায়ের প্রান্তীয় স্নায়ুগুলি নষ্ট হয়ে গেলে তিনি মাটি থেকে বেশ খানিক উঁচুতে পা তুলে হাঁটেন ও বেশ জোরে বা দুম করে পা মাটিতে ফেলেন। যাকে বলে স্ট্যাম্পিং গেইট।
পার্কিনসনস: স্নায়ুরোগ পার্কিনসনস-এর রোগীর পায়ের পেশিগুলি শক্ত হয়ে যায়। শরীরের ভারসাম্যের সমস্যা দেখা দেয়। এই রোগী মাটি থেকে পা বেশি তুলতে পারেন না। যেন মনে হয়, মাটির সঙ্গে পা ঘষে ঘষে হাঁটছেন। তাঁর হাঁটার গতি তা অনেকটা মন্থর হয়ে পড়ে যাকে বলে স্লো সাফলিং গেইট। এছাড়া থাকে হাতে পায়ে কাঁপুনি। রোগীকে দেখে মনে হয় হাঁটতে হাঁটতে বোধহয় রোগী পড়ে যাবেন। ঠিক তখনই তার হাঁটার গতি অনেক বেড়ে যায়! এই সমগ্র বিষয়টিকে বলে ফেস্টিনেটিং গেইট। এমন আরও নানা শারীরিক সমস্যা আছে যার কারণে বদলে যেতে পারে চলনভঙ্গি। যেমন অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডাইলোসিস রোগে হাঁটার সময় রোগীর শরীরের গঠন হয়ে যায় বাংলার ‘দ’-এর মতো! আবার আমাদের কানের ভিতরের অংশ বা অন্তঃকর্ণ শরীরের ব্যালেন্স রক্ষা করে।
সেই অংশে কোনও জটিলতা দেখা দিলে শরীরের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। মস্তিষ্কের সেরিবেলাম নামে একটি অংশ আছে, সেই অংশেও কোনও জটিলতা হলে শরীরের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে যার প্রভাব পড়তে পারে চলনভঙ্গিতে এবং হাত-পায়ের মুভমেন্টেও জটিলতা দেখা যায়।
আবার যে রোগীর হার্ট ও লাং কমজোরি তিনি তো হাঁটতে গেলেই হাঁফ ধরবে! অতএব চেম্বারের চৌকাঠ পেরনর পর একজন রোগী যখনই চেম্বারের দরজা পেরিয়ে ঢোকেন, তখনই তাঁর রোগনির্ণয়ের পথে অনেকটা এগিয়ে যান চিকিত্সক।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক