


শতভিষা বসু: মস্তিষ্ক হল শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটি শরীরের সমস্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের প্রধান কাজ শরীরের বিভিন্ন অংশে পুষ্টি সরবরাহ করা। এছাড়া অনুভব করা, চলাফেরা, শ্বাস নেওয়া, চিন্তা করা এগুলিও মস্তিষ্কের কাজের মধ্যেই পড়ে। আমরা যা খাবার খাই তা মস্তিষ্কের বিকাশ ও গঠনে প্রধান ভূমিকা পালন করে। সাধারণত কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আছে, যেগুলি আমাদের স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। সেই সমস্ত উপাদানগুলি হল—
দুধ ও দুগ্ধজাত খাদ্য: এই ধরনের খাদ্যে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ভিটামিন বি থাকে, যা আমাদের মস্তিষ্কের কোষ, নিউরোট্রান্সমিটার এবং এনজাইমকে বাড়াতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যে সকল বয়স্ক ব্যক্তি নিয়মিত দুধ পান করেন তাঁদের মস্তিষ্কে গ্লুটাথায়োন (জিএসএইচ) নামে বিশেষ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-এর মাত্রা বাড়ে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্রেনের কোষগুলি নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে ও কোষগুলির মৃত্যুও ঘটে। এই বিশেষ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বয়সের সঙ্গে ব্রেনের কোষের এভাবে ধ্বংস হওয়া প্রতিরোধ করে। এছাড়া ডেয়ারি প্রোডাক্ট ব্রেন মেমব্রেনের নমনীয়তা বাড়ায়। এর ফলে ব্রেনে বার্তা আদান-প্রদান স্বাভাবিক হয়।
দই এর কথাও বিশেষভাবে বলা দরকার। দইয়ে থাকে প্রচুর পরিমাণে উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়া আমাদের হজমে সাহায্য করে এবং পরিপাকতন্ত্রে প্রচুর পরিমাণে সেরেটোনিন ক্ষরণ করে। এই বিশেষ হর্মোনটি আবার আমাদের স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। ফলে ব্রেন কাজ করে অনেক বেশি।
শাক-সব্জি: পালং শাক সহ অন্যান্য সবুজ শাকগুলির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন কে, ই ও ফোলেট থাকে। থাকে ভিটামিন ই-এর মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা মস্তিষ্কের কোষগুলিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিশক্তি হারানোর প্রবণতা থাকে যা কমাতে সাহায্য করে সবুজ শাকসব্জি। এছাড়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ করতেও সাহায্য করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট দেহের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালস নষ্ট করে দেহের নিউরোট্রান্সমিটার সিস্টেম স্বাভাবিক রাখে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত খাবারগুলি হল— ব্রকোলি, ফুলকপি, টম্যাটো, রসুন ইত্যাদি। বাঁধাকপি, বিট ও পার্সলে পাতায় থাকে প্রচুর পরিমাণে এল গ্লুটামাইন যা মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এছাড়া মস্তিষ্কের অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া শরীর থেকে বের করে দিয়ে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতারও বৃদ্ধি ঘটায়।
আমলকী: আমলকীতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, এ, আয়রন এবং ক্যালশিয়াম। এছাড়া আছে ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস বা উদ্ভিদ থেকে পাওয়া যায় এমন উপকারী উপাদান। ফাইটোনিউট্রিয়েন্টসগুলি শরীরের বিভিন্ন ফ্রি র্যাডিকেলসকে ধ্বংস করে। আমাদের মনে রাখতে হবে ফ্রি র্যাডিকেলস ব্রেনের কোষগুলিকে ধ্বংস করে। ফলে নিয়মিত আমলকী খেলে ব্রেনের কোষগুলি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়।
খেজুর: খেজুরে থাকে উপকারী ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনোয়েডস, ফেনোলিক অ্যাসিড যা শরীর ও মস্তিষ্কের নানা ধরনের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। কীভাবে করে? জানা গিয়েছে, ইন্টারলিউকিন ৬ নামে বিশেষ একটি উপাদান ব্রেনের কোষ ধ্বংস করে। এর ফলে দেখা দিতে পারে অ্যালঝাইমার্সের মতো অসুখ। ব্রেনের কাজ করার ক্ষমতাও হ্রাস পায়। আবার ব্রেনে অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিনের মাত্রা বাড়লে তা ব্রেনের নিউরোনের মধ্যে প্লাক তৈরি করে ও কোষের মধ্যে যোগাযোগে ব্যাঘাত ঘটায়। খেজুরের নানা উপকারী উপাদান ইন্টারলিউকিন ৬ এবং অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিনের মাত্রা কমাতে পারে ও ব্রেনকে নানা ধররে সমস্যা থেকে দূরে রাখে।
কিশমিশ: এই শুকনো ফলে আছে বোরন নামে উপাদান যা একটি ট্রেস এলিমেন্ট। ব্রেনের কার্যকারিতা বজায় রাখতে কিশমিশ অত্যন্ত ফলদায়ী। বিশেষ করে ব্রেন এবং শরীরের একাধিক অঙ্গের মধ্যে স্বাভাবিক সমন্বয় সাধনে কিশমিশ অত্যন্ত সাহায্য করে। এছাড়া স্মৃতি ধরে রাখা, মনোনিবেশ বৃদ্ধিতেও কিশমিশ দুর্দান্ত ফলদায়ী।
আখরোট: আমাদের শরীরের কোষগুলিতে সর্বদাই নানা ক্রিয়া-বিক্রিয়া হয়ে চলেছে। এর ফলে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থ। এই ক্ষতিকর বর্জ্য পদার্থগুলি ব্রেনের নিউরোনগুলিতে তৈরি করে প্রদাহ। ফলে অল্প অল্প করে তৈরি হতে থাকে কগনেটিভ ইমপেয়ারমেন্ট। অর্থাৎ কোনও কিছু স্মৃতিতে ধরে রাখতে, নতুন কিছু শিখতে, কোনও কাজে মনোনিবেশ করতে, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হয়। কারও ক্ষেত্রে অ্যালঝাইমার্সের মতো সমস্যাও দেখা দেয়। প্রকাশ পেতে পারে অন্যান্য ধরনের ব্রেনের সমস্যাও। দেখা গিয়েছে অ্যালঝাইমার্স ডিজিজ আক্রান্তর ব্রেনে অ্যামাইলয়েড প্লাক জমা হয়। আর এই ধরনের প্লাক তৈরি হওয়ার পিছনে বিশেষ ভূমিকা নেয় অ্যামাইলয়েড বিটা প্রোটিন। এই প্রোটিন জমা হলে নিউরোনগুলি সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ব্রেনে ফ্রি র্যাডিকেলস বা ক্ষতিকর পদার্থের মাত্রা বেড়ে যায়। কোষগুলির মৃত্যু ঘটতে থাকে। এই ক্ষতি প্রতিহত করতে পারে আখরোট। কারণ আখরোটে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এভং অ্যান্টিইনফ্লেমেটরি উপাদান। একাধিক অ্যানিমাল এবং হিউমান স্টাডিতে দেখা গিয়েছে নিয়মিত ওয়ালনাট সেবনে কগনেটিভ ইমপেয়ারমেন্ট এবং অ্যালঝাইমার্সের মতো সমস্যার গতি স্লথ করা সম্ভব। আরও কিছু স্টাডিতে দেখা গিয়েছে নিয়মিত আখরোট খেলে পার্কিনসনস ডিজিজ, স্ট্রোক, ডিপ্রেশন, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ-এর ঝুঁকিও হ্রাস পায়।
আখরোটে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সঙ্গে ডিএইচএ নামে বিশেষ উপকারী উপাদান থাকে যা মস্তিষ্কের বিকাশে সাহায্য করে। বিশেষ করে বাচ্চাদের নিয়মিত আখরোট খাওয়াতে পারলে ব্রেনের ডেভেলপমেন্টে সহায়তা মেলে। তবে শুধু আখরোট নয়, অন্যান্য ধরনের বাদামও রাখতে হবে রোজকার ডায়েটে। কারণ বাদামে থাকে ওলেয়িক অ্যাসিড, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, ডিএইচ, ডিপিএ, ইপিএ-এর মতো উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড। ফ্যাটি অ্যাসিডগুলি ব্রেনে নতুন কোষের উৎপাদনে সাহায্য করে। এর ফলে বাড়ে স্মৃতিশক্তি, মনোনিবেশের ক্ষমতা।
অন্যান্য বাদাম: জানলে অবাক হবেন, চিনাবাদামের মতো খাদ্যে থাকে যথেষ্ট মাত্রায় নিয়াসিন বা ভিটামিন বি৩। নিউরোনের স্থায়িত্ব বাড়ায় এই ভিটামিন। এছাড়া খাওয়া যেতে পারে আমন্ড। এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই। আমাদের কথা বলার দক্ষতার জন্য দায়ী ব্রেনের যে অংশ, সেই অংশের উন্নতি ঘটায় ভিটামিন ই। এছাড়া বয়স জনিত স্মৃতিহানিও রুখে দেয়। খেতে পারেন কাজু। ব্রেনের বিকাশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কতকগুলি ফ্যাটি অ্যাসিড রয়েছে কাজুবাদামে। তবে কাজুবাদাম খাওয়ার আগে সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন।
ব্লু বেরি: এই ফলে অ্যান্থোসায়ানিন নামের একটি ফাইটোকেমিক্যাল আছে যা ব্রেনের বিকাশ ঘটায় সঙ্গে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। সেই জন্য ‘ব্লু বেরি’ ফলটিকে মেমোরি বুস্টিং ফল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ডিম ও ডিমের কুসুম: ডিমের কুসুমে লিসিথিন নামে বিশেষ একটি উপাদান থাকে প্রচুর পরিমাণে যা মস্তিষ্কের নতুন কোষ তৈরি করতে সাহায্য করে। এছাড়া রয়েছে কোলিন নামে উপাদান যা ব্রেনে নানা প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে ও ব্রেনের কার্যকারিতা বাড়ায়। ফলে বাড়ে স্মৃতিশক্তি। ব্রেনের কোষগুলির মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি হয়। এছাড়া ডিমে মেলে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি৬ এবং বি১২ যা ব্রেনের বিকাশে ভূমিকা নেয়। এই ভিটামিন ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করে। এমনকী ব্রেনের কোষগুলির ক্ষতি হওয়া আটকে কগনেটিভ ফাংশন ঠিক রাখে। ডিমে পাওয়া যায় ফোলিক অ্যাসিড যা স্নায়ুতন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এছাড়া ডিমের কসুমে থাকে লিউটিন নামে বিশেষ ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যা ডিমের কুসুমের রং করে তোলে উজ্জ্বল হলুদ। নানা গবেষণায় দেখা যাচ্ছে লিউটিন স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, ভাষার উন্নতিতে এবং নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্রে সাহায্য করে। এখানেই শেষ নয়, ডিমের কুসুমে থাকে কোলেস্টেরল যা ব্রেনের কোষের গঠনে সাহায্য করে। তাই শিশুদের নিয়মিত ডিম খাওয়াতে হবে। আবার গোটা ডিমে থাকে ট্রিপটোফ্যান নামে বিশেষ উপকারী উপাদান যা নানাভাবে সেরোটোনিন উৎপাদনে সাহায্য করে। এর ফলে মন মেজাজ ভালো থাকে। স্ট্রেস দূরে থাকে।
কুমড়ো বীজ ও কড়াইশুঁটি বা মটরশুঁটি: যথেষ্ট মাত্রায় ডোপামিন থাকে কুমড়োবীজ এবং কড়াইশুঁটিতে। ডোপামিন আমাদের মস্তিষ্কের এনার্জি সরবরাহ করে, মনোনিবেশে সাহায্য করে। সবুজ মটরশুঁটিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। এ একাধারে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মতো কাজ করে অন্যদিকে নরএপিনেফ্রিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটার উৎপাদনেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। মটরশুঁটিতে মেলে ভিটামিন বি ৬ যা ডোপামিনের সঙ্গে সেরেটোনিন তৈরিতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। এই বিশেষ হর্মোন মেজাজের উন্নতি ঘটায়, স্ট্রেস দূরে রাখে। বি-৬ ব্রেনে গামা অ্যামাইনোবিউটাইরিক অ্যাসিড তৈরি করে যা উদ্বেগ দূরে রাখতে সাহায্য করে। সবুজ মটরে থাকে প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড যা অ্যাসিটোকোলিন নামে বিশেষ একটি যৌগ উৎপাদনে সাহায্য করে। এই যৌগ ঘুমের মধ্যে মস্তিষ্কের নান ধরনের কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে মেলাটোনিন তৈরি হয়। এই হর্মোন আবার ঘুম এবং জাগরণের যে চক্র তা বজায় রাখে।
আসা যাক কুমড়ো বীজের কথায়। এই বীজে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, জিঙ্ক এবং তামা। নার্ভের বার্তা প্রেরণে জিঙ্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অ্যালঝাইমার্স, ডিপ্রেশন, পার্কিনসনস ডিজিজ-এর সমস্যার রোগীদের জিঙ্কের ঘাটতি দেখা যায়। কোনও নতুন কিছু শেখা এবং স্মৃতিতে ধরে রাখতে ম্যাগনেশিয়ামের বিশেষ ভূমিকা আছে। নার্ভ সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা নেয় তামা। আয়রনের অভাবে ব্রেন সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। কুমড়ো বীজে আছে ভালো মাত্রায় ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড যা ব্রেনের কার্যকারিতা বজায় রাখে।
ওটস: এই খাদ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। এছাড়াও ভিটামিন-ই, বি-কমপ্লেক্স এবং জিঙ্কও থাকে যথেষ্ট মাত্রায় যা মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।
এছাড়া কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস
মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে মদ্যপান, যে কোনও ধরনের নেশার সামগ্রী সেবন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা দরকার। শারীরিক এবং মানসিক সুস্থতার জন্য প্রতিদিন ব্যায়ামও জরুরি। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমতেই হবে।
লেখক : হাওড়ার নারায়ণা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক