


রবীন রায়, আলিপুরদুয়ার: বাংলা নতুন বছরকে স্বাগত জানায় উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষও। আদিবাসী সমাজের মধ্যে বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানানোর নানান রীতি প্রচলিত আছে। উত্তরের জনজাতি মানুষের মধ্যে বিশেষ করে মেচ বা বোড়ো, রাভা, তামাং ও লেপচা সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁদের নিজস্ব ঘরানার কৃষ্টি দিয়ে নববর্ষ উৎসব পালন করে।
মেচ বা বোড়ো সম্প্রদায়ের মানুষ নববর্ষ উৎসবকে বলেন ‘বৈখাই রংজানাই।’ পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে এই উৎসব। এই উপলক্ষ্যে বোড়ো সম্প্রদায়ের মানুষ নববর্ষের দিন বাথৌ খেরাই সিবিনাই বা বাথৌ খেরাই পুজো করেন। বাবা-মা ও অন্যান্য পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে নদীতে তর্পণের মাধ্যমে পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানান উত্তরের বোড়ো সম্প্রদায়ের মানুষ। সংক্রান্তিতে বা নতুন বছরের প্রথম দিন সারা রাত খেরাই নৃত্যে মেতে ওঠেন।
বৈখাই রংজানাই বা নববর্ষ পালনের দিন বোড়ো মেয়েরা বাড়ি বাড়ি গান করেন। গান করে গৃহস্থ বাড়ি থেকে টাকা, চাল ও সব্জির মাগন তোলে। নববর্ষের দিন মেয়েরা নতুন পোশাক পড়েন। তারপর মাগন থেকে তোলা সামগ্রী দিয়ে রাতে ভোজের আয়োজন করে। উত্তরের রাভা জনজাতির মানুষ বাংলা নববর্ষকে নৃত্যের মাধ্যমে স্বাগত জানান। রাভাদের বাংলা নববর্ষের স্বাগত জানানোর এই নৃত্যকে বলে ‘বৌসর পিদান’ নৃত্য। রাভারা প্রকৃতির উপাষক। রাভাদের নববর্ষ পালনের এই বৌসর পিদান নৃত্যে প্রকৃতির নৈসর্গিক, রূপ ও রস ফুটে ওঠে। নববর্ষে রাভাদের এই নৃত্য গানে গোপন বিরহ, যন্ত্রণা ও প্রেমের আবেগ প্রকাশ পায়।
বাংলা নববর্ষে মেতে ওঠে উত্তরের তামাং জনজাতিও। তামাংদের নববর্ষকে উৎসবকে বলে ‘লোসার’। লো-এর অর্থ সন বা সাল। সার-এর অর্থ নতুন। লোসার বা নববর্ষ উৎসবের দিন তামাং সম্প্রদায়ের মানুষ ঘর পরিষ্কার করেন। এদিন বাড়ির পাশে রাস্তাঘাটও সাফসুতরো করে থাকেন এই জনজাতির মানুষেরা। নববর্ষ উপলক্ষ্যে তামাংরা বাড়িতে ধর্মীয় পতাকা লাগান। পাহাড়ের টিলা, গুম্ফা ও গাছেও তাঁরা ধর্মীয় পতাকা লাগায়। লোসারের দিন তামাংরা বাড়িতে পুজো করে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে সবার মঙ্গল কামনা করে থাকেন। সবার সুখ সমৃদ্ধি কামনা করে নতুন বছরে তাঁরা তাঁদের এই ধর্মীয় পতাকা লাগান। নববর্ষের প্রথম দিন বাড়ির ছোটরা পরিবারের বড়দের কাছে আশীর্বাদ নেয়।
উত্তরের জনজাতিদের মধ্যে লেপচা সম্প্রদায়ের মানুষও বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করে। লেপচাদের নববর্ষকে স্বাগত পালনের অনুষ্ঠানকে বলে ‘নামবুম’ উৎসব। লেপচারা নববর্ষের দিন বাড়িতে একধরনের মদ তৈরি করেন। ওই মদকে লেপচারা ‘ছ্যাং’ বলেন। তাঁরা নববর্ষকে স্বাগত জানান এই ছ্যাং খেয়ে।
জেলার লোকসংস্কৃতি গবেষক বঙ্গরত্ন পুরস্কার প্রাপক প্রমোদ নাথ বলেন, উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জনজাতির মানুষেরাও বাঙালিদের মতো তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি মেনে বাংলা নববর্ষ পালন করেন। মিনি ভারত উত্তরবঙ্গের যা সম্পদ বলা যায়।