


সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: বিধানসভায় বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। লোকসভায় ক্ষয় অব্যাহত। আঁচ পড়েছে রাজ্যসভাতেও। তাই দাপটে ১৫ বছর রাজত্ব করা তৃণমূল এখন ‘ডুবন্ত টাইটানিক’ বলেই জোর চর্চা দিল্লির দরবারে। এই পরিস্থিতিতে দল বাঁচানোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। তাহলে উপায় কী? কংগ্রেস থেকে ভেঙে বেরিয়ে আসা তৃণমূল কংগ্রেস কি অস্তিত্বরক্ষায় মিশে যাবে সেই কংগ্রেসেরই সঙ্গে? সোনিয়া গান্ধীর সঙ্গে মমতার ‘আলোচনা’ এই প্রশ্নেই তীব্র ইন্ধন জুগিয়েছে।
বিজেপি এবং কংগ্রেসেরও একাংশ কটাক্ষ করছে, মাস দেড়েক আগেও যোজন দূরত্ব বজায় রাখা মমতার কাছে এখন তাহলে সোনিয়া-রাহুলই নয়নের মণি? সেটাই কি বারবার ১০ জনপথে বারবার ছুটে যাওয়ার কারণ? মঙ্গলবার সোনিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট বৈঠক হয় মমতার। আর বুধবার মুখোমুখি রাহুল-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ৮৮ মিনিটের বৈঠক। তাতে জল্পনা আরও বেড়েছে। যদিও দু’পক্ষই এই চর্চাকে ‘ভিত্তিহীন’ বলছে। এই দাবি করা দুই নেতাই নিজেদের দলের সাধারণ সম্পাদক। তৃণমূলের সেই নেতা আবার জনপ্রতিনিধিও। নজর করার মতো বিষয় হল, জল্পনা অস্বীকার করা দুই নেতাই নিজেদের নাম প্রকাশে রাজি হননি। তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মিশিয়ে দেওয়ার খবর ভিত্তিহীন হলেও এটা সত্যি যে, আগের সব দূরত্ব, কটাক্ষ, পরস্পরে সমালোচনা—সব শিকেয় তুলে এখন থেকে কংগ্রেসের সঙ্গেই একজোট হয়ে চলব। হাতে হাত ধরে। মজবুত জোট। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ অবশ্য রাতে ‘সব রিপোর্ট গুজব’ বলে সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট করেছেন। যদিও এরপরেই ‘মজবুত’ জোটের উদাহরণ হিসাবে এক প্রশ্নে অবস্থান বিগড়ে যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, ২০২৬ সালের বিধানসভার ভোটেও তৃণমূল পেয়েছে ৪১.০২ শতাংশ ভোট। আর কংগ্রেস ২.৯৮ শতাংশ। তাহলে কোন অঙ্কে ৫০:৫০ আসন ভাগাভাগি সম্ভব? ফলে মুখে জোটের কথা বলা হলেও আদতে তা ‘সোনার পাথরবাটি’ হয়ে থাকবে বলেই রাজনৈতিক মহলের মত। আর কংগ্রেসের বক্তব্য—‘রাহুল গান্ধীর অবস্থান স্পষ্ট, বিজেপিকে হারানোই একমাত্র টার্গেট। তাই শুধু মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’র নামে প্রচার করলেই চলবে না। বাস্তবে প্রকৃত জোট হতে হবে।’
এই পরিস্থিতিতে আবার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির কিন্তু নিজেদেরই ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেছে। ঋতব্রতর কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় দিল্লিতে কার সঙ্গে বৈঠক করলেন, আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি না। এটা স্পষ্ট, আমরা আসল তৃণমূল। আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাচ্ছি না।’ ফলে দলের মধ্যে ভাঙন যে পর্যায়ে গিয়েছে, তাতে দল টিকিয়ে রাখার জন্য কংগ্রেসের সরাসরি সমর্থন তৃণমূলের প্রয়োজন। তা ছাড়া একক শক্তিতে ভবিষ্যতে জিতে আসা কঠিন হবে। তাই দলের তরফে ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হলেও দলকে কংগ্রেসের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার বিষয় নিয়ে সোনিয়ার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলোচনার জল্পনা জিইয়েই থাকছে। কংগ্রেসের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, মমতা চাইলেও এখনই তাড়াহুড়ো করে তৃণমূলকে কংগ্রেসে মেশাতে রাজি নন সোনিয়া। মমতাকে তাঁর বার্তা, ‘ওয়েট’। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূলের বিরুদ্ধে দিকে দিকে যেভাবে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, নেতানেত্রীদের সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে, সেই পরিস্থিতিতে এখনই তৃণমূলকে মিশিয়ে নিলে কংগ্রেসকেও সেই অপ্রীতিকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। তাই তৃণমূলকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, কংগ্রেস এ ব্যাপারে দলের অন্দরে আলোচনা করবে। আজ, বৃহস্পতিবারই দলের বিশেষ বৈঠক ডেকেছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে। সব রাজ্যের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি, এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক, রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের ডাকা হয়েছে। তৃণমূল ইস্যুতে দলের প্রদেশ নেতৃত্বকে অস্বীকার করে কিছু করা হবে না বলেই ঠিক করেছে হাইকমান্ড। আবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে তৃণমূলের এখনকার এই ‘আর্তি’ও হাতছাড়া করতে নারাজ কংগ্রেস। যতই হোক, বাংলায় তো এখনো কংগ্রেসের চেয়ে তৃণমূলই শক্তিশালী।