


চলতি বিষয় না পড়লে চাকরি বা আয়ের সুযোগ কেমন? তা নিয়েই চলছে এই বিভাগ। মতামত জানালেন পেশাদাররা।
মিউজিক থেরাপি
টানা সপ্তাহখানেক খুব জ্বরে ভুগছে মিতুল। শরীর দুর্বল, মুখে রুচি নেই। অস্থির লাগছে সারাক্ষণ। মনকে শান্ত করতে ডাক্তার বললেন, ভালো গান শোনার কথা।
অনিন্দ্য রায়ের রোগটা কোনওদিনও সারবে না। ডাক্তাররা জবাব দিয়েই দিয়েছেন। বাড়ি নিয়ে যেতে বলেছেন রোগীকে। এখন অনিন্দ্যর সারাদিনের সঙ্গী জানলার ফাঁক গলে ঘরে ঢোকা একচিলতে প্রকৃতি আর গান।
গান বা মিউজিকের অনেক গুণ। অসুস্থ শরীরকে ভালো রাখে, অশান্ত মনকে শান্ত করে। আবার মনখারাপ দূর করা, ক্লান্তি কাটানো ইত্যাদিতেও তার জুড়ি মেলা ভার। এখন তাই অনেকেই মিউজিক থেরাপিকে পেশা হিসেবে নির্বাচন করছেন। এই বিষয়ে মিউজিক থেরাপিস্ট মুকুল রানা বললেন, ‘একটা সময় ছিল যখন গান ছিল শুধুই এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি। পড়াশোনার পাশাপাশি অন্য কিছু শেখার তালিকায়, নাচ, আঁকা, আবৃত্তির সঙ্গেই গানকেও রাখা হতো তখন। এখন তা চিকিৎসা ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বিদেশে চিকিৎসার এই ধরনটা বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। ক্রমশ আমাদের দেশেও সকলেই এর কদর করতে শুরু করেছেন।’
চিকিৎসার ধরন
মিউজিক থেরাপি ও তার গুণ বিষয়ে আলোচনার আগে জানা প্রয়োজন, বিষয়টা আসলে কী? গান ও বাজনার মাধ্যমে শরীর ও মন ভালো রাখার নামই মিউজিক থেরাপি। এটা একটা ক্লিনিক্যাল প্রসেস। গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত মনের উপর গানের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তাই গানকে বহুক্ষেত্রেই চিকিৎসার অঙ্গ করে তোলা হচ্ছে। অশান্ত মন শান্ত করতে, শারীরিক ও মানসিক অস্থিরতা দূর করতে এবং সার্বিকভাবে মন ভালো রাখতে গান দারুণ ভালো কাজ করে।
একটা লক্ষ্য ঠিক করে নেওয়া হয়। এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে ডাক্তার ও রোগী একই সঙ্গে কাজ করেন। মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এই ধরনের থেরাপি খুব কার্যকর।
বিভিন্ন বয়সে এই চিকিৎসা করা হয়। রোগীর পছন্দ এক্ষেত্রে একটা বড় ব্যাপার। তার মানসিক স্থিতির উপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন নির্বাচন করা হয়।
এ ক্ষেত্রে কোন ধরনের গান বা বাজনা ব্যবহার করা হবে সেটা রোগীর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করেন ডাক্তার।
শুধু তাই নয়, পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গিয়েছে একটু যারা লাজুক, সচরাচর কথা বলতে বা মিশতে পারে না, তাদের ক্ষেত্রেও এই থেরাপি ভালো কাজ করে। মুকুল রানা বললেন, লজ্জা তো মানসিক একটা স্থিতি। সেই থেকে ব্যবহারে জড়তা আসে। বাজনা সেই জড়তা ভেঙে দিতে এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সাহায্য করে।
কীভাবে আসবেন পেশায়?
এখন প্রশ্ন হল, মিউজিক থেরাপিকে কীভাবে পেশা হিসেবে নেওয়া যাবে? কারাই বা এই ধরনের পেশার জন্য উপযুক্ত? গান ও বাজনার বিভিন্ন ধরন বিষয়ে একটা প্রথমিক ধারণা থাকা খুবই জরুরি, জানালেন মুকুল রানা। তাঁর কথায়, ‘নিয়মিত সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকলে, রাগ, ক্লাসিকাল মিউজিক (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য) বিষয়ে ধারণা থাকলে এই ধরনের পেশায় বাড়তি সুবিধে পাওয়া যায়। তবে তারই সঙ্গে একটা সংবেদনশীল মনও থাকা দরকার। অন্যের মানসিক অবস্থা বুঝে তার সঙ্গে ব্যবহার করার প্রবণতা থাকা দরকার। তবে এগুলো সবই প্রাথমিক স্তর। মিউজিক থেরাপিস্ট হয়ে উঠতে চাইলে সঠিক পড়াশোনা করতে হবে।’
কোর্স কেমন?
মিউজিক থেরাপির নানা ধরনের কোর্স থাকে। ইনট্রোডাক্টরি সার্টিফিকেট কোর্স, ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, মাস্টার ডিগ্রি সহ বিভিন্ন ধরনের পড়াশোনা করা যায় এই বিষয়টি নিয়ে। ইনট্রোডাক্টারি সার্টিফিকেট কোর্সে সাধারণভাবে বিষয় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এই কোর্সটিতে খুব বিশদে বিষয়ের ভেতরে ঢোকা যায় না। ডিপ্লোমা কোর্সে মিউজিক থেরাপির উপর একটু গভীরে গিয়ে আলোচনা করা হয়। তাতে কোন ধরনের রোগে মিউজিক কাজ করবে, কেমন রোগে কী মিউজিক চিকিৎসার কাজে লাগবে ইত্যাদি বিষয়ে জানা যায়। এছাড়াও এই কোর্সে বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা কোথায় কেমন হচ্ছে, সে নিয়েও পড়াশোনা করা যায়। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্সটি তাঁরাই করতে পারেন, যাঁরা সঙ্গীত নিয়ে স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করেছেন। এই কোর্সে মিউজিক ও থেরাপির নানা দিক বিষয়ে খুবই গভীরে পড়াশোনা করানো হয়। মিউজিক থেরাপির উপর মাস্টার ডিগ্রি প্রায় পুরোটাই গবেষণাভিত্তিক। এখানে রোগীর সঙ্গে কথা বলা, তার রোগ বোঝা, কোন রোগে কেমন বাজনা কাজ করবে বা কোন রোগীর উপর কোন বাজনা ভালো কাজ করবে এই সবই হাতেকলমে শেখানো হয়। এই সেশনগুলো প্রায় সবই সাইকোলজিক্যাল। সম্পর্কভিত্তিক আলোচনা, রোগী ও তার চারপাশের লোকজন বিষয়ক ধারণা ইত্যাদির উপরেই এই কোর্সে বিশদে পড়ার সুযোগ থাকে।
চাকরির সুযোগ
এই বিষয়ে পড়াশোনার পর নানাবিধ কাজের সুযোগ থাকে। স্কুলে ক্লিনিক্যাল থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করতে পারেন। অশান্ত শিশু, বয়ঃসন্ধির ছাত্রছাত্রী, পারিবারিক সমস্যার মধ্যে থাকা ছাত্রছাত্রীদের জন্য এই চিকিৎসা বিশেষ কার্যকর।
হাসপাতালে মিউজিক থেরাপিস্টের আলাদা কদর। মুমূর্ষু রোগীর উপর বাজনার বিশেষ প্রভাব পড়ে। সেক্ষেত্রে এই কাজটি খুবই প্রয়োজনীয়। তবে এর জন্য মিউজিক থেরাপির পাশাপাশি সাইকোলজিক্যাল প্রশিক্ষণও প্রয়োজন হয়। কঠিন অসুখ থেকে উঠে অনেকেই রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে যান সুস্থ হতে। সেখানেও এই ধরনের চিকিৎসকের প্রয়োজন। পড়াশোনার ধরনের উপর নির্ভর করে চাকরির সুযোগ পাওয়া যায়। প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনার ক্ষেত্রে স্কুলে থেরাপিস্টের চাকরি পাওয়ার সুযোগ বেশি। রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিষয়টি নিয়ে বিশদে পড়াশোনা ও গবেষণা থাকা জরুরি।
এছাড়া নিজের মতো ফ্রিলান্স কাজও করতে পারেন। অনেকেই বাড়িতে চেম্বার খোলেন। সেখানেই রোগী দেখেন ও তাঁর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় মিউজিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন। অনেকে আবার কোনও নির্দিষ্ট কোনও হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত না থেকে বিভিন্ন হাসপাতাল, রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ইত্যাদিতেও ফ্রিলান্স কাজ করেন। কেউ বা স্কুলেও এমনভাবেই যুক্ত থাকেন। তবে সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসাই এই কাজের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। সংবেদনশীল মন, অন্যকে বোঝার ক্ষমতা এবং হিউম্যান সাইকোলজি নিয়ে জ্ঞান থাকাও একইকরম জরুরি।