


ফুড স্টাইলিং
যা খেতে ভালো, তা যদি দেখতেও বেশ ভালো হয়? আপনার ভালোবাসার যে কোনও পদের ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। আর সেই কারণেই হোটেল রেস্তরাঁয় ফুড স্টাইলিস্টদের এত কদর। এক কাপ কফি। তার উপর নকশা করে গড়ে তোলা হয়েছে সুদৃশ্য একটি সিনারি। পিছনে ঘন বন, বন্য পথ চলে গিয়েছে কে জানে কোথায়! বনের প্রবেশ পথেই একটা ছোট্ট বাড়ি, এমন ছবি দেখে মনে মনে কল্পনার রাজ্যে চলে যেতে পারেন আপনিও। অথবা একটা ক্রিসমাস কেক, সেটাতে ফ্রস্টেড ক্রিম আর ফন্ডেন্টের সাহায্যে তৈরি করা হল ঘন সবুজ ক্রিসমাস ট্রি, সান্টা ক্লজ আরও কত কী! দেখলেই মনে হবে সাজিয়ে রাখি। খাবারের উপর এমন সব বিচিত্র নকশা যদি আপনিও করতে চান তাহলে সঠিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তবে যে কোনও কাজের জন্যই একটা ভালোবাসা প্রয়োজন। আর এই কাজের ক্ষেত্রে রান্নার প্রতি ভালোবাসাই হল ইউএসপি।
নকশার নানারকম
খাবারের উপর যে নকশা থাকে, তা সাধারণত একটা থিম মেনে তৈরি হয়, জানালেন ফুড স্টাইলিস্ট সম্বিত সেন। যেমন পিকনিকে যখন যাচ্ছেন তখন শতরঞ্চির নকশা তৈরি করতে পারেন স্যান্ডউইচের উপর। অথবা কেক, মাফিন গোছের মিষ্টির উপর ফুড বাস্কেটের ডিজাইন করতে পারেন। আবার বাংলা নববর্ষ বা পুজোর থালিতে হাত পাখা, কুলো ইত্যাদির নকশা করতে পারেন খাবারের উপরে। অনেকে আবার পার্টির থিম, কালার কম্বিনেশন ইত্যাদির উপর নির্ভর করেও ফুড স্টাইলিং করে।
প্রশিক্ষণের ধরন
সাধারণভাবে ফুড স্টাইলিস্ট হতে গেলে কোনও প্রথাগত শিক্ষার যে বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে তা নয়। তবে কয়েকটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা একান্ত জরুরি।
প্রথমত আপনাকে খাবার সংক্রান্ত খুঁটিনাটি জানতে হবে। যেমন কোন খাবারে কেমন উপকরণ ব্যবহার করা হয়, তার কোনও বিশেষ উপকারিতা রয়েছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞান এই পেশার জন্য খুবই প্রয়োজন।
ফুড স্টাইলিং কিন্তু শুধুই খাবারের উপর রঙিন নকশা নয়। দক্ষ ফুড স্টাইলিস্টরা নিজেদের ডিজাইনের মাধ্যমে গল্প বলার ক্ষমতা রাখেন। তার জন্য সেই খাবার সম্বন্ধে, তার ইতিহাস বিষয়ে, সাংস্কৃতিক তাৎপর্য সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান থাকা দরকার।
অনেক সময় ফুড স্টাইলিস্ট খাবারের রেসিপি নিয়েও সামান্য নাড়াচাড়া করেন সেটাকে সময় ও ক্ষেত্র উপযোগী করে তোলার তাগিদে। ধরুন একটা অল উইমেন’স পার্টি। সেখানে খাবারের রেসিপিতে স্ট্রবেরির সংযোজন ঘটালেন ফুড স্টাইলিস্ট। রং হল গোলাপি। নারীর মনের কোমলরূপ ও নারীবাদের বিপ্লব সবই ধরা ওই গোলাপি রঙে। আবার টিনএজারদের নিয়ে অনুষ্ঠান। সেক্ষেত্রে প্রতি পদেই এল সবুজের ছোঁয়া। খাবারে তারুণ্যের রং ধরল এইভাবেই। কখনও বা অনুষ্ঠানের থিমে নতুনত্ব আনতে হাতের সামনে থাকা উপকরণ দিয়েই তৈরি করতে হয় নকশা।
ফুড ডিজাইনিংয়ের কোর্স রয়েছে প্রায় সব কালিনারি স্কুলেই। ফুড টেকনোলজি বিষয়ে পড়লেও তার অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় থাকে ডিজাইনিংয়ের উপর। এছাড়াও কিছু কালিনারি স্কুলে শুধু ডিজাইনিংয়ের উপর ডিপ্লোমা কোর্স করানো হয়। ফুড স্টাইলিং বিষয়ক ওয়ার্কশপও করানো হয়। সেগুলো কম সময়সাপেক্ষ। সাধারণত থিম অনুযায়ী খাবার কেমন করে সাজানো হবে সেই নিয়েই এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
পোর্টফোলিও তৈরি
ফুড স্টাইলিং বিষয়ে পড়াশোনার পর কাজের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। প্রথমে নিজস্ব একটা পোর্টফোলিও তৈরি করতে হবে। কীভাবে বানাবেন এই পোর্টফোলিও?
কাজ শেখার সময় নিজের তৈরি কাজের ছবি তুলে রাখুন।
পাড়ার যে কোনও অনুষ্ঠানে, ছোটখাট পার্টিতে চেয়ে ফুড স্টাইলিংয়ের কাজ নিন। সেগুলোও অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগান।
কোনও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করে হাতেকলমে কাজ শেখার সুযোগ চেয়ে নিন। সেটাকে নিজের অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগান।
অনেক সময় কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানে, (পুজো, পয়লা বৈশাখ, ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার ইত্যাদি) রেস্তরাঁয় ফুড স্টাইলিংয়ের জন্য বাইরে থেকে লোক নেওয়া হয়। সেই সুযোগের সন্ধানে থাকুন। তা কাজে লাগিয়ে চাকরির খোঁজ করুন।
বিয়েবাড়ির কেটারিং সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজের সুযোগ চান। সেগুলোও পোর্টফোলিও বানানোর কাজে বিশেষ জরুরি।
খেয়াল রাখবেন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে ফুড স্টাইলিংয়ের অভিজ্ঞতা জোগাড় করা জরুরি। যত বেশি ধরনের অভিজ্ঞতা থাকবে কাজের সুযোগ ততই বাড়বে।
কাজের সুযোগ
হোটেল রেস্তরাঁয় তো বটেই, এমনকী এই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার পর নিজস্ব ডিজাইনিং স্টুডিও পর্যন্ত খুলে ফেলতে পারেন। আপনার দক্ষতার উপর কাজের সুযোগ নির্ভর করবে। কাজ শেখার সময় যদি খাবারের নকশাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিতে যেতে পারেন, তাহলে অনুষ্ঠান বাড়িতে, হোটেল রেস্তরাঁয় আপনার ডাক পড়বে শুধুমাত্র খাবার সাজিয়ে দেওয়ার জন্য। নিজের স্টুডিওতে খাবার সাজানোর জন্য নানাবিধ উপকরণ তো রাখতেই হবে, তাছাড়াও কিছু সাজ সরঞ্জামও রাখা জরুরি। ছুরি-কাঁচির পাশাপাশি ব্লো টর্চ, টুথপিক, টুইজার, ড্রায়ার ইত্যাদিরও প্রয়োজন পড়ে খাবার সাজাতে। সেই মতো জিনিসগুলো মজুত রাখুন। খাবারের উপর নকশা করে যদি গল্পের সন্ধান দিতে পারেন তাহলে প্রতিটি অনুষ্ঠানেই আপনার ডাক পড়বে।
খেয়াল রাখুন
কোয়ালিটির সঙ্গে আপস করবেন না। তার জন্য যদি একটু বেশি খরচ হয় তো হোক। কিন্তু সুনাম বজায় রাখা জরুরি।
খাবারের নকশা করতে সাধারণ উপকরণ ব্যবহার করুন। আর্টিফিশিয়াল জিনিস নয়।
প্রয়োজনে শেফের সঙ্গে কথা বলে খাবার বিষয়ে জেনে নিন। মনে মনে সেই মতোই নকশা ছকে ফেলুন।
খাবারে নকশা করতে যা যা ব্যবহার করবেন সবই যেন খাওয়ার উপযুক্ত হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। রং, ফন্ডেন্ট, বল ইত্যাদি সবই ভোজ্য হওয়া একান্ত জরুরি।
কমলিনী চক্রবর্তী