


পিনাকী ধোলে , সিউড়ি:
সিউড়ি-২ ব্লকের পুরন্দরপুর পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সাজিনা গ্রামের বাসিন্দাদের বিশ্বাস, যাত্রা না দেখে বিসর্জনের পথে পা বাড়ান না ‘মা চিন্তামণি’। তাই তাঁকে তুষ্ট করতেই আজও বেঁচে রয়েছে গ্রামবাংলার বিলুপ্তপ্রায় এই লোকশিল্প। অন্যান্য জায়গার মতো পুজো উপলক্ষ্যে গ্রামে যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়, এমনটা নয়। বরং পুজোর আয়োজনের অন্যতম অংশই এই যাত্রাপালা।
বর্তমানে, ঘরে ঘরে টিভি আর হাতে হাতে মোবাইল। তাতেই সস্তা এবং সহজ বিনোদনের বহু রসদ খুঁজে নেন বহু মানুষ। তাই তাঁরা আর রাতভর বিনিদ্র থাকার প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় প্রহর গোনেন না। শীতে মেলা বসবে, যাত্রাপালা আসবে-সেই প্রতীক্ষায় থাকেন না আর গ্রামের মানুষ। সেই কারণেই গত কয়েক দশকে কৌলিন্য হারিয়ে ক্রমেই ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে প্রায় বিলুপ্তপ্রায় লোকশিল্পে পরিণত হয়েছে বাংলার যাত্রা। তবুও সেই লোকশিল্পকেই আঁকড়ে ধরে রয়েছেন সাজিনা গ্রামের বাসিন্দারা। বাসিন্দাদের দাবি, যাত্রা না হলে ঘোর অমঙ্গল নামে আসে গ্রামে। সত্তরের দশকে একবার নকশাল আন্দোলনের সময় গ্রামে বন্ধ ছিল যাত্রা। তার জেরে গ্রামে এবছর ব্যাপক অশান্তি হয়। সেকারণে তারপর থেকে গ্রামে যাত্রা বন্ধ করার দুঃসাহস আর দেখাননি কেউ। তবে কত বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না বাসিন্দারা। এমনকী, মায়ের পুজোর বয়স নিয়েও নির্দিষ্ট তথ্য নেই গ্রামে। তবে গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা অরুণ চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, মায়ের পুরাতন মন্দিরের পোড়া ইট পরীক্ষা করে এক গবেষক বলেছিলেন, এই ইট মধ্যযুগের। গ্রামের রায় বংশের হাত ধরেই এই পুজোর সূচনা হয়েছিল বলে অনুমান করা হচ্ছে। কারণ রায়বাড়ির ইটের সঙ্গে মন্দিরের ইটের সাদৃশ্য পেয়েছিলেন ওই গবেষক। প্রবীণ ওই বাসিন্দা জানাচ্ছেন, কালীপুজোর সারারাত ধরে মায়ের পুজো হয়। পরেরদিন দুপুরে যাত্রাপালার অনুষ্ঠিত হয়। বিকেলের মধ্যেই সেই যাত্র শেষ হয়। তারপরই মায়ের বিসর্জন হয়। পরম্পরা মেনে সূর্যাস্তের আগেই গ্রামের পুকুরে মায়ের বিসর্জন হয়। বাসিন্দা সম্রাট বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বহুকাল আগে গ্রামের বাসিন্দারা মিলে ‘জয়কালী অপেরা’ নামে একটি যাত্রার দল শুরু করেছিলেন। বাসিন্দারাই গ্রামে অনুষ্ঠিত যাত্রায় অভিনয় করেন। এই ভাবেই বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বাসিন্দারা।
সাজিনা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, কালীপুজোর রাতে মন্দিরের বাইরে বৈদ্যুতিন আলো জ্বললেও মন্দিরের ভিতর শুধুমাত্র মোমবাতি আর প্রদীপের আলো জ্বলে। এমনকী, যজ্ঞের আগুনও কোনও লাইটার কিংবা দেশলাই দিয়ে জ্বালানোর রীতি নেই। প্রাচীন প্রথা মেনে চকমকি পাথরের সাহায্যেই আগুন জ্বালানো হয়। -নিজস্ব চিত্র