


বিজেপির প্রতিষ্ঠাতাপুরুষ বঙ্গসন্তান শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই দলটিই নাকি এখন পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ একাধিকবার ভারতের শাসনক্ষমতা দখল করেছে। বেশিরভাগ রাজ্যে চলছে মোদি-শাহ জুটির সাধের ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। অঙ্গ, কলিঙ্গও বিজেপির করতলগত। তাদের তাঁবের বাইরে গুটিকয়েক রাজ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পশ্চিমবঙ্গ। একুশের ভোটে বাংলা দখলের জন্য একেবারে জান লড়িয়ে দিয়েছিল গোটা গেরুয়া শিবির। কিন্তু দিনের শেষে ইতিহাস এই ক্ষমতালোলুপ গোষ্ঠীর জন্য চরম ব্যর্থতারই লিখেছিল। এদিকে ভারতে মোদিযুগের অবসান কেবল সময়ের অপেক্ষা বলেই অনুমান রাজনৈতিক মহলের। বিজেপির অন্দরের খবর, তাদের ভিতরে ‘হয় এবার নয় নেভার’ আওয়াজও উঠেছে। অর্থাৎ ছাব্বিশের ভোটে নবান্ন দখল করতে না-পারলে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে বাংলায় বিজেপি সরকার দেখা হবে না। বাংলা আজও বিজেপির সেই অধরা মাধুরী।
কিন্তু এই চ্যালেঞ্জে জয়ী হওয়ার জন্য নৈতিকভাবে যা যা করণীয় ছিল, বিজেপি পার্টি বা তাদের কেন্দ্রীয় সরকার তার কিছুই করেনি। তাই তারা বাঁকা আঙুলে ঘি তোলার প্ল্যান নিয়ে এগোচ্ছে বলেই আঁচ পাচ্ছে রাজনৈতিক মহল। কেন্দ্রীয় শাসক দল বা সরকারের পক্ষে সবটা যে সম্ভব নয়, তা সকলের জানা। এজন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করেছে একাধিক কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে। সবশেষে ভর করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের উপর। আর কমিশনও সেবাদানে কোনো ত্রুটি রাখছে না। যেমন এবার নিল এক বেনজির সিদ্ধান্ত। ভারতে ভোটের ইতিহাসে এবারই প্রথম সমস্ত রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা বুথের বাইরে বসবেন! এ কেউ কোনো জন্মে শোনেনি! কিন্তু কমিশন সূত্রে এমন খবরই মিলেছে। বিষয়টি নিয়ে বিজ্ঞপ্তি আকারে এখনো কোনো নির্দেশনামা জারি না-হলেও রিটার্নিং অফিসার (আরও) এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসারদের (এআরও) কাছে এই ফরমান পৌঁছে গিয়েছে। ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গই যে কমিশনের পাখির চোখ তা এসআইআর সূচনা পর্বেই নানাভাবে পরিষ্কার করে দিয়েছিল ইসিআই স্বয়ং। ভোট ঘোষণার দিন থেকে একের পর এক আমলাকে বদল করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিবকে দিয়ে এর শুরু। পরবর্তী পর্বে দফায় দফায় সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং কলকাতাসহ অন্যান্য শহরের পুলিশ কমিশনারদের (সিপি)। বিভিন্ন জেলার ডিএম, এসপি থেকে শুরু করে বিডিও, ওসি প্রভৃতিও বদল করা হয়েছে, যাকে বলে পাইকারি হারে! ২০২১ সালে গোটা বিধানসভা নির্বাচন পর্বে পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১৫ জন অফিসারকে বদলি করেছিল ইসিআই। অন্যদিকে, ভোটমুখী বাংলায় সাম্প্রতিক ১৭ দিনে সরানো হয়েছে ৪৮৩ জন অফিসারকে! ভোটমুখী পাঁচ রাজ্যের ছবির পাশে বাংলার বেনজির খতিয়ান রেখে দেখা যাচ্ছে, ইসিআই সর্বমোট বদলি করেছে ৫০৬ জন অফিসারকে। সেখানে শুধু বাংলা থেকেই ৪৮৩ জন! এই ছবির অর্থ ব্যাখ্যা আজ নিষ্প্রয়োজন।
রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস সরাসরি অভিযোগ করেছে, বিজেপিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতেই কমিশনের এই কারসাজি। এজেন্টদের বুথের ভিতর বসতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পর্যন্ত এই বিষয়ে জনসভা থেকেও সরব হয়েছেন, ‘তোতাপাখির কমিশন এখন বলছে, এজেন্টরা বাইরে থাকবে, আর সেন্ট্রাল ফোর্স ভিতরে!’ কমিশন সম্পর্কে তিনি আগেই ‘বিজেপির বি টিম’ মন্তব্য করেছেন। তবে নয়া সিদ্ধান্তের আড়ালেও একাধিক প্রশ্ন জিইয়ে রেখেছে ইসিআই। বুথে স্থান না-পাওয়া রাজনৈতিক দলের এজেন্টরা তাহলে কোথায় বসে কাজ করবেন? কীভাবে তাঁদের কাজ করতে হবে? পুরোপুরি অন্ধকারে ভোট পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসাররা। অথচ ভোট পরিচালনায় রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের ভূমিকা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। ভোটগ্রহণ দ্রুত সম্পন্ন করতে ভোটকর্মীদের নানাভাবে সাহায্য করেন তাঁরা। এবার সেই সুযোগ ছেঁটে দেওয়ার ফলে ভোটপ্রক্রিয়া শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা থাকছেই। তাহলে এবার কি বিএলওদের সঙ্গে বসে কাজ করতে হবে ভোটকর্মীদের? কমিশনের অন্য একটি নির্দেশে এই জল্পনাই জোরদার হয়েছে। এখন তাহলে বাকি থাকে শুধু মোদির একটা পুতুলকে কোলে নিয়ে নবান্নের চোদ্দোতলার পবিত্র চেয়ারটিতে বসিয়ে দেওয়া! এছাড়া তো বঙ্গে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী লাভের আর কোন পথ দেখা যায় না। অঙ্গ, কলিঙ্গ জয় হয়েছে; বিজেপিকে বঙ্গ জয়ের জন্য শেষমেশ এই পথই বেছে নিতে হবে নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে। ইসিআই কি মোদিবাবুর নির্দেশে এই কাজটিও করবে এবার?