


শ্যামল চক্রবর্তী: ‘জোড়া বলদের দুধ নাই / কংগ্রেসের ভোট নাই’, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে সাদা দেওয়ালে একজোড়া বলদ আর একটা শূন্য দুধের বোতলের ছবি দেখে চমকে উঠলেন ‘বিপিন ভিলা’র মালিক আমাদের বিপিনজেঠু, শ্রী বিপিনচন্দ্র পাল। বহুবার গাছের একটা করে পেয়ারা খাওয়ার বিনিময়ে জেঠুর কাছে শুনতে হয়েছে, জেঠুর প্রয়াত পিতৃদেব নাকি স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপিনচন্দ্র পালের স্মৃতিতে বড়ো পুত্রের এই নাম রেখেছিলেন! জেঠু পুরানো কংগ্রেসি। দেওয়ালের লেখা একঝলক দেখেই চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন।
তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। বাবা বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন দেখে বাবার পিছু পিছু পড়া ফেলে সোজা বিপিন ভিলার দিকে।
‘জোড়া বলদের দুধ নাই! হারামজাদা কম্যুনিস্টের দল, ভোটের রেজাল্টে টের পাবি’, চিৎকার শুরু করলেন কর্তা।
‘চুপচাপ দেইখা ঘরে ঢুইকা গেলে ভালো করতেন। চিল্লাইয়া হগল লোকেরে এইখানে টাইনা আনছেন। হগলেই জানে,আপনি কংগ্রেসি’, দাঁতন করতে করতে কখন এসে দাঁড়িয়েছেন বিক্রমপুরের বাঙাল চিত্তখুড়ো।
‘আর একটাও কথা না বিপিনবাবু। এরপর পাশে আবার আজ রাতেই কিছু না লিখে দেয়’, গম্ভীর গলায় বলছেন দিলীপ দাস।
দিলীপবাবু যে বামপন্থীদের চর, কেউ জানত না। পরের দিন সকালেই আগেকার দেওয়াল লিখন এর পাশে আরও একটি চিত্রশিল্প তৈরি করেছেন আমাদের পাশের বাড়ির রামকাকু আর লক্ষ্মণকাকু! স্কুল যাওয়ার পথে আমরা হাঁ করে দেখছি। ‘এবার ভোটে হারছে কারা / বলদের দুধ খাচ্ছে যারা!’ ছবির হাতটা লক্ষ্মণকাকুর ছিল একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মতো। একটা গাধার মাথায় বসে আছেন বিপিন পাল। মাথায় গাধার টুপির সামনে লেখা ‘হেরো / বাগবাজারের মেড়ো / আগে যদি জানতাম / ল্যাজ ধরে টানতাম!’
আমাদের ছেলেবেলায় ভোট ছিল রীতিমতো ছড়ায় আর ছবিতে উন্নতমানের এক শিল্প। ঠাকুরমশাইয়ের চায়ের দোকানে পাশাপাশি বসে ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন কংগ্রেসি আর লাল পার্টির লোকেরা। যখন-তখন ‘বিড়ি বিনিময়।’ ভোট নিয়ে ঠাট্টাতামাশা। রাতে চুরি করে ফিরে সিঁধেল চোর যেমন দুলতে দুলতে বসে থাকে চায়ের দোকানে, দুই দলের কর্মীরাও সেভাবে বসে থাকতেন ঝিম মেরে।
সেবার ভোটে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস জিতেছিল। বিপিন পাল ধুতি-পাঞ্জাবি পরে গলায় গাঁদাফুলের মালা চাপিয়ে হাতজোড় করে এগোচ্ছেন হেঁটে হেঁটে। তাঁর দলের কর্মীরা বাড়িতে বাড়িতে লাড্ডু বিতরণ করছেন। সেই সময় হঠাৎ ঝড়ের বেগে এসে বিপিন পালের গলার মালা খুলে নিজের গলায় পরে নিলেন কমিউনিস্ট নেতা রাজীব পাল। রাজীববাবুর সাঙ্গোপাঙ্গরা স্লোগান দিতে শুরু করেছেন, ‘ভোট চোর বিপিন পাল / তোর জায়গা বালি খাল / চুরি করে জিতলে ভোট / বাংলা কংগ্রেস ভাঙবে জোট।’ সত্যি সত্যি সেবার অজয় মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বামপন্থীদের জোট ভেঙে যাওয়ায় যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি না হয়ে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় এসেছিল আদি কংগ্রেস।
ক’দিন আগে মাতামহ গোঁসাইজি শিষ্যবাড়ি থেকে বিরাট দুটো পোটলা বেঁধে আমাদের বাড়িতে এসেছেন কয়েকদিন বিশ্রাম নিতে। একদিন হঠাৎ করে বেরিয়ে পড়েছেন ভোট নিয়ে চেঁচামেচি হচ্ছে শুনে। ‘বিয়া করে পরে / নাইচা মরে নরে’, তিলকসেবা, গলায় কণ্ঠীর মালা দাদু পইতেতে হাত দিয়ে কাঠের খড়ম খটখট করতে করতে হঠাৎ করে রেগে যাবার ভান করছেন। ‘শিষ্যদের মাথায় হাত বুলিয়ে স্বপাক খেয়ে ছ্যাঁদা বেঁধে ভালোই তো কামিয়ে এলেন গোঁসাই! আপনি তো শুনেছি পুরানো কংগ্রেসি। কংগ্রেসের একটা ভোট নষ্ট হল’, হাসছেন গাঙ্গুলিকাকু।
‘আর কইও না গাঙ্গুলি, পাঁজি দেইখা কত কইরা বারণ করলাম, শিষ্য সুদেব লাহা ঠিক দাঁড়াইয়া গেল লাল পার্টির হইয়া। সুদেবের জামানত জব্দের ভয় আছে। নাইলে এইবার আমদানি আরও বেশি হইত।’
ছোটোপিসির বাড়ি বর্ধমানের দেবীপুরে। একদিন বাবার সঙ্গে ট্রেনে চেপে চলে গেলাম পিসির বাড়ি। মাটির দোতলা বাড়ির চারপাশে মাটির দেওয়াল। দরজার দিকে এগোনোর আগেই চোখে পড়ে গেল ভোটের ছড়া, ‘হুঁশিয়ার খবরদার চারদিক নিঃশব্দ / হ্যারিকেনের জামানত হবে এবার জব্দ।’
পিসির বাড়ির দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই হাসতে হাসতে এগিয়ে এলেন কিরণবালা, ‘কতকাল পরে এলি। আয় আয়।’
‘তোদের বাড়ির দেওয়ালে হ্যারিকেনের সুন্দর ছবি এঁকে রেখেছে। রংগুলি খুব চোখ টানছে’। মাটির বারান্দায় আসন পেতে ঘরে ভাজা মুড়ি আর সরের চাঁচি খাচ্ছি আমি আর বাবা।
‘খেয়াল নাই, এই মাসের শেষে ভোট? শিলুবাবু কংগ্রেসের টিকিট না পেয়ে নির্দল হয়ে দাঁড়িয়েছেন হ্যারিকেন চিহ্নে! তাই ছবি এঁকে ওইসব হাবিজাবি লিখেছে।’
পরদিন সকালে ভোরবেলা উঠে আমি আর বাবা হাঁটতে বেরিয়েছি কালীতলার দিকে। সতী মাসিদের বাড়ির দেওয়ালে আরেক ভোটরঙ্গ, ‘হ্যারিকেনে তেল নাই / অমাবস্যায় ভোট চাই!’ লেখার পাশে খালি গায়ে ধুতি পরা ন্যাড়ামাথা শিলুবাবু দাঁড়িয়ে আছেন ‘হাতে হ্যারিকেন’ নিয়ে। হ্যারিকেনের চিমনি কালো রং করা! সেই ঘটনা থেকেই এখন অতি জনপ্রিয় ‘হাতে হ্যারিকেন’ শব্দবন্ধের জন্ম কি না, এই প্রশ্ন করে, হে পাঠক, এই সামান্য লেখককে ল্যাজেগোবরে করবেন না!
পিসির বাড়ির পাশ দিয়েই ডিভিসির ক্যানাল। একটা ছিপ জোগাড় করে বড়শিতে আটামাখার টোপ লাগিয়ে জলে বসে ফেলতেই ফাতনা ডুবছে। মৎস্যশিকারি বাবার কাছ থেকে এই বিদ্যাটা পেয়েছি একেবারে কম বয়সে। ছিপ ধরে টান মারতেই বড়ো সাইজের একটা বেলে মাছ। পরপর দুটো বেলে মাছ তুলতেই ক্যানালের উলটো দিক দিয়ে যাওয়া সাইকেল মিছিল থেকে ভেসে আসছে সংলাপ, ‘সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ / দিনে হ্যারিকেন, রাতে কংগ্রেস!’
পিসিমার বাড়ি থেকে পরদিন দেবীপুর স্টেশন হয়ে গিয়েছি পাণ্ডুয়া। তখন ওই অঞ্চলে মাটির নীচে লাল বালির খাদ কেটে বালি তোলা নিয়ে চলছে চাপানউতোর।
পাণ্ডুয়া স্টেশন থেকে পিসেমশাইয়ের ভাইয়ের বাড়িতে যাওয়ার রাস্তায় দেওয়াল জুড়ে দৃষ্টিনন্দন শিল্প, ‘তুলে নিল বালি / জগার বাড়ি খালি।’ পাশে গালে হাত দিয়ে কঙ্কালসার কমিউনিস্ট প্রার্থী জগবন্ধু পাল দূরে জড়ো করা বালির পাহাড়ের দিকে তর্জনী তুলে হাউ হাউ করে কাঁদছেন!
ভোটে উত্তাপ ছড়াতে শুরু করল একটা সময় থেকে। ততদিনে জোড়া বলদ আর বলদ নেই, হাত হয়ে গিয়েছে। ‘যার হাত, তার পাত’ লিখে কংগ্রেসিরা হাত ধুয়ে ফেলেছেন। লেখার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হুমকি, পাতে খাবার চাইলে হাতে ছাপ মারতেই হবে। আমাদের পাড়ার দুই কমিউনিস্ট রামকাকা আর লক্ষ্মণকাকা এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকছেন। বের হচ্ছেন রাতে।
গঙ্গার পাড়ে প্রখ্যাত উকিলের বাড়ির বাইরে রামকাকাদের ‘শিল্পী সংসদ’ এক মধ্যরাতে বিশাল দেওয়াল ক্যানভাসে তৈরি করে ফেলেছে দারুণ একটা ছবির কোলাজ, নট্ট কোম্পানির শান্তিগোপাল লেনিন সেজে আঙুল তুলে বলছেন, ‘হাতে মারলে, পাতে মরবে / ভেবেচিন্তে ছাপ মারবে!’
পরদিন সকালেই দেখা গেল রাতারাতি শান্তিগোপালের বাণীর ‘ছাপ’কে কারা যেন ‘সাপ’ বানিয়ে পাশে একটা বিশাল ফণাতোলা সাপের ছবি উপহার দিয়ে গিয়েছেন! বসে নেই শান্তিগোপালের শিষ্যরা। হঠাৎ করে খেলার মাঠে দেওয়াল জুড়ে সুকুমার রায়, ‘বাবুরাম সাপুড়ে / কোথা যাস বাপু রে / আয় বাবা দেখে যা / ধেড়ে সাপ রেখে যা / যে হেলের বিষ নেই / তাকে নিয়ে ধেই ধেই / করছে যে নৃত্য / দেখে হাসে ভৃত্য।’
শৈশব স্মৃতি বেঁচে থাকে আমৃত্যু। প্রথম যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসিরা রাগে দাঁত কিড়মিড় করছেন। যেখানে সেখানে লেখা হচ্ছে নতুন একটা ছড়া, ‘হাতে মাত্র কয়েক মাস / মুখ্যমন্ত্রীর মনে ত্রাস / হঠাৎ করে ভাঙবে জোট /আবার বুঝি আসছে ভোট।’
সত্যি সত্যি ভেঙে গেল মন্ত্রিসভা। আবার ভোট হতেই ক্ষমতায় হাতের তালু। চারদিকে বুটের শব্দ। স্কুলে স্কুলে ‘চীনের চেয়ারম্যান।’ এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে চারপাশের পরিবেশ, বুঝে উঠতে নাকানিচোবানি খাচ্ছেন বয়স্করাও। দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে যেতেই চারপাশ উত্তাল। মাঝে মাঝে পাটের দড়িতে মোড়া ‘পেটো’ টেস্ট করছেন লক্ষ্মণ কাকারা। বোম মানে যে ‘পেটো’ একদিন কানে কানে বললেন পাশের বাড়ির সুবীরদা।
একদিকে স্কুল-কলেজের দেওয়ালে দেওয়ালে ‘এই বুর্জোয়া শিক্ষায় যে যত বেশি পড়ে, সে তত মূর্খ হয়।’ কাস্তে-হাতুড়ি ভেঙে আগেই কাস্তে ধানের শিষ হয়ে গিয়েছে। ধানের শিষ আর হাতে হাতাহাতি নেই, গলাগলি! ‘ভোট দেবেন কিসে / ডাঙ্গে ধানের শিষে’র দেওয়াল লিখনের ফাঁকে ফাঁকে কংগ্রেসের কমিক রিলিফ, ‘চীনের প্রতীক হাতুড়ি আর পাকিস্তানের তারা / এখনও কি চিনতে বাকি দেশের শত্রু কারা।’
ভোটরঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে একাত্তর। শেখ মুজিবের ঘোষণা ভাসছে এপার বাংলার রেডিওতে। একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে দু’পার বাংলার মানুষকে। ততদিনে এ রাজ্যের ক্ষমতায় কংগ্রেস এসে ভেঙে তছনছ করে দিল ভোটের শান্তি। হাজার হাজার যুবক বাড়িছাড়া। কলকাতা ময়দানে কৃষ্ণচূড়ার লালের নীচে সবুজ ঘাসে চাপ চাপ রক্ত। বাংলাদেশ তৈরি হতেই পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লাইন দেওয়ালে দেওয়ালে, ‘রাস্তায় খানখান কে / গড়াগড়ি যায় ট্যাংকে / পশ্চিমা বীর নিয়াজী পিঁয়াজি / চীন মার্কিন টের পাক / এ কঠিন ঠাঁই কড়া পাক।’
...............................................................
• কার্টুন : সেন্টু
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র