


ঘটনা ১: অ্যালবাম হাতে পেয়ে খুশি হতে পারলেন না সুস্মিতা-মৃদুল। অনেক আশা নিয়ে, বিশ্বাস করে একজন ফোটোগ্রাফারকে বিয়ের ছবি তোলার গুরুদায়িত্ব দিয়েছিলেন। নিরাশ হলেন। ভালো ওঠেনি ছবিগুলি। আসল মুহূর্তগুলিই তো অধরা। লাইটের গণ্ডগোল। তাড়াহুড়ো করে ফোটোগ্রাফার নির্বাচন করেছিলেন। যাচাই করেননি। এ জন্যই জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবিগুলির এই দশা!
ঘটনা ২: বিয়ের যাবতীয় অনুষ্ঠানের পর ছবির ফাইলের লিংক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ক্যামেরা পার্সন। ব্যস্ততার মাঝে তা ডাউনলোড করে উঠতে পারেননি নবদম্পতি। কিছুদিন পর ছবি দেখতে গিয়ে দেখলেন, লিংকটি আর খুলছে না! ফের ছবিগুলি চাইলেন ক্যামেরা পার্সনের কাছ থেকে। ফোটোগ্রাফার অপারগ। তিনি যে ততদিনে ডিলিট করে দিয়েছেন ছবিগুলি।
বিয়ের মরশুম চলছে। সাজগোজ, অতিথি, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছু মিলে তৈরি হয় অনন্য স্মৃতির কোলাজ। আর জীবনের এই বিশেষ দিনের স্মৃতি রেখে দিতে চান সকলেই। সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট হোক বা অ্যালবামে সাজানো— বিয়ের প্রতিটি অনুষ্ঠানের ছবি, ভিডিও চাই-ই চাই। মুহূর্তকে ক্যামেরাবন্দি করার এই ‘গুরুদায়িত্ব’ পড়ে একজন ওয়েডিং ফোটোগ্রাফারের কাঁধে। সে কারণে এখন ওয়েডিং ফোটোগ্রাফির রমরমা। কেবল ক্যামেরায় ক্লিক করাই নয়, একজন দক্ষ ফোটোগ্রাফার জানেন কোন মুহূর্তটি ফ্রেমে ধরতে হবে, কোথায় আলো একেবারে নিখুঁত, কোন অভিব্যক্তি চিরকাল রেখে দেওয়ার মতো। তবে উপরের ঘটনাগুলির মতো বাস্তবেও নানা অনভিপ্রেত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে নবদম্পতিদের। সে কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে থেকেই সঠিক ফোটোগ্রাফার বেছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আবার, এখন ওয়েডিং ফোটোগ্রাফির বাজেটও আকাশছোঁয়া। সেক্ষেত্রে কম খরচে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানকে ক্যামেরাবন্দি করতে পারবেন, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ওয়েডিং ফোটোগ্রাফি নিয়ে কিন্তু এক্সপেরিমেন্ট করা যায় না।
• বাজেট নির্ধারণ করুন: প্রবাদ রয়েছে, লাখ কথার পর বিয়ে হয়। এখন কেবল লাখ কথা নয়, কয়েক লক্ষ টাকাও লাগে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য। তার মধ্যে অনেকটা জুড়ে থাকে ওয়েডিং ফোটোগ্রাফি। বর্তমানে ওয়েডিং ফোটোগ্রাফাররা বিভিন্ন প্যাকেজ অফার করেন। যেমন ধরুন, প্রি-ওয়েডিং থেকে শুরু করে রিসেপশন পর্যন্ত একটি প্যাকেজ হয়। এগুলির মধ্যে থাকে— ১. এক বা একাধিক লোকেশনে প্রি ওয়েডিং বা বিয়ের আগে ফোটোগ্রাফি। ২. মেহেন্দি বা সঙ্গীতের কোনো অনুষ্ঠান। ৩. গায়ে হলুদ।
৪. বিয়ে। ৫. বিদায় বা বাসি বিয়ে। ৬. রিসেপশন। যেহেতু একাধিক দিন, সে কারণে এই প্যাকেজের খরচ একটু বেশি। আবার, কেবল বিয়ে আর বিদায়ের অনুষ্ঠানের জন্যও ফোটোগ্রাফারকে বলতে পারেন। সেক্ষেত্রে বিষয়টি সাশ্রয়ী হয়। এখন আবার অনেকে আলাদা করে ভিডিওগ্রাফিও করান। আপনি যত বেশি দিন আর যত বেশি ক্যামেরা পার্সনের টিমকে নিয়ে কাজটা করতে চাইবেন, তার খরচও সেই অনুযায়ী তত বাড়বে। সবার আগে ঠিক করুন আপনার বাজেট। বিয়ের জন্য আরও নানা খাতে খরচ রয়েছে। তাই ফোটোগ্রাফির জন্য সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করতে পারবেন, তা নির্ধারণ করুন।
• ফোটোগ্রাফার নির্বাচন: বাজেট নির্ধারণ হয়ে গেলে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সারা জীবনের সম্পদ হিসেবে যে ছবিগুলি আপনার কাছে থাকবে, সেগুলি ভালো না হলে চলে! তাই প্রয়োজন সেরা ফোটোগ্রাফার। তবে সেটি পকেটফ্রেন্ডলি না হলেই সমস্যা। সে কারণে ভালো করে বুঝেশুনে তারপর সিদ্ধান্ত নিন। একজন ফোটোগ্রাফারের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে কয়েকটি ভালো ছবি দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। অন্তত একটি বিয়ের অ্যালবাম দেখুন। ওই ক্যামেরা পার্সন যদি আপনার পরিচিত কারও বিয়ের ছবি তুলে থাকেন, তাহলে তো সহজেই অ্যালবাম দেখতে পারবেন। কিন্তু যদি বাধ্য হয়ে অনলাইন থেকে বাছতে হয়, সেক্ষেত্রে বারবার তাঁর পেজের রিভিউ পড়বেন। সম্ভব হলে অন্য কোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে কথা বলে দেখুন। ক্যামেরা পার্সন সময়মতো অ্যালবাম, ছবি ডেলিভারি করেন কি না, ক্লায়েন্টের চাহিদা বুঝতে পারেন কি না, এ সব জানা প্রয়োজন। পাশাপাশি জেনে নিন, ক্যামেরা পার্সনের আচরণ কেমন, সেই অভিজ্ঞতাও ভবিষ্যতে আপনার কাজে লাগবে। কেবল ফলোয়ারের পিছনে ছুটবেন না। ছবির সঙ্গে আপনি যদি ভিডিও-ও করাতে চান, সেক্ষেত্রেও ভালো করে দেখে নিন আগের কোনও কাজের নমুনা। অ্যাঙ্গল প্রসঙ্গে ফোটোগ্রাফারের ধারণা, আলোর কাজ, সম্পাদনা, রং... সমস্ত ধারণা পাওয়া যায় পূর্ববর্তী কাজের নমুনা থেকে।
• চুক্তি নিয়ে সঠিক আলোচনা: আপনি অ্যালবামে কতগুলি ছবি চান, কতদিনের মধ্যে ডিজিটাল মাধ্যমে ছবি প্রয়োজন, ভিডিও হলে তা কবে চাই— তা ভালো করে কথা বলে নিন। চুক্তিতেও লেখা থাকুক সেসব। অনেক সময় ছবির লিংক পাঠিয়ে দেওয়ার পর সেগুলিকে নিজের ফাইল থেকে ডিলিট করে দেন ক্যামেরা পার্সন। এর জেরে ভবিষ্যতে সমস্যায় পড়েন দম্পতিরা। তাই আপনি স্পষ্ট জানিয়ে রাখুন, বিয়ের পর কয়েকদিন ব্যস্ত থাকবেন, একটি নির্দিষ্ট সময় পরই যেন ছবিগুলি ডিলিট করেন ফোটোগ্রাফার। প্রি ওয়েডিং ফোটোগ্রাফির লোকেশন কী থাকছে, সেটিও কিন্তু আলোচনা করে নেবেন। কারণ অনেক জায়গায় ছবি তোলা নিষেধ থাকে। সেখানে ছবি তুলতে গেলে বিপাকে পড়তে পারেন। তাই আগেভাগে কথা বলে নেওয়াই মঙ্গল। পেমেন্ট টার্মস, ক্যান্সেলেশন নীতি, কপিরাইটের বিষয় সহ যাবতীয় সবকিছু নিয়ে কথাবার্তা বলে তবেই অ্যাডভান্স করবেন। আরও একটি কথা বলে নিন— ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহার করা যাবে কি না। অনেক ফোটোগ্রাফার নিজেদের কাজের স্যাম্পল হিসেবে ছবি সমাজমাধ্যমে দেন। এতে আপনার সম্মতি রয়েছে কি না, তা সাফ জানিয়ে দিন।
• কম খরচে কীভাবে সম্ভব: ওয়েডিং ফোটোগ্রাফির বাজেট অনেকেরই নাগালের বাইরে। তাহলে? কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই কম খরচে কাজটা সেরে নিতে পারেন। প্রথমত, অভিজ্ঞতার তুলনায় প্রতিভাকে অধিক গুরুত্ব দিন। এমন অনেকেই রয়েছেন, যাঁদের হয়তো ফলোয়ার কম কিন্তু দারুণ কাজ করেন, তাঁদের নির্বাচন করুন। সুযোগ দিন। প্যাকেজ কাস্টমাইজ করেও বাজেট কমাতে পারেন। ধরুন, সিনেম্যাটিক ভিডিওর পরিবর্তে যদি ডকুমেন্টারি স্টাইল ভিডিও নেন, সেক্ষেত্রে খরচ সামান্য হলেও কমে। আবার ড্রোন জাতীয় ডিভাইস ব্যবহৃত হলেও খরচ বাড়ে। সেখানেও কাঁচি চালাতে পারেন। আপনার ফোটোগ্রাফারকে বলুন, কম টিম নিয়ে কাজ করতে। তাহলে পার হেড মজুরি কম পড়ে। প্রি ওয়েডিং ছবির ক্ষেত্রে স্টুডিওর পরিবর্তে প্রকৃতির মাঝে লোকেশন বাছুন। তাহলে আপনার পকেটফ্রেন্ডলি হবে বিষয়টি। দরদাম করতে কিন্তু লজ্জা পাবেন না। আপনার কোনো বন্ধুবান্ধব থাকলে, তাঁদের অনুরোধ করলেই কাজটি কম খরচে হয়ে যেতে পারে।
ওয়েডিং ফোটোগ্রাফি মানে কিন্তু কেবল দাঁড়িয়ে স্ন্যাপ তোলা নয়। একে অপরের দিকে তাকিয়ে নানা এক্সপ্রেশন দেওয়াও নয়। এটি আর্ট। ছবিতে থাকতে হবে গল্প, আবেগ। তবেই আপনার বিশেষ দিনের ছবি হয়ে উঠবে সবচেয়ে সেরা। তাই শুভক্ষণের আগে বিশ্বাসযোগ্য আর নির্ভরশীল কাউকেই দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন।
শান্তনু দত্ত