


রাজা ভট্টাচার্য: রাত্রি প্রায় দুই প্রহর। এই রাত-দুপুরে রামচন্দ্রের হুঁকো টানার শব্দ যেন দ্বিগুণ জোরালো শোনাচ্ছে। আর থাকতে না পেরে বিছানা থেকে সাবধানে নেমে এলেন শ্যামাসুন্দরী। সমস্ত দিন যজমানদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরতে হয় তাঁর স্বামীকে। স্বভাবতই অন্য দিন তিনি সন্ধ্যার ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন।
কিন্তু আজ যেন রামচন্দ্রের হুঁকো টানা আর শেষ হচ্ছে না। স্বামীর চোখে ঘুম নেই কেন, তার খোঁজ করতে শেষমেশ ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন শ্যামাসুন্দরী। দাওয়ার পূর্ব কোণের বাঁশের খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে হুঁকো টানছেন রামচন্দ্র।
‘কী হল আজ আপনার?’ স্বামীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন শ্যামাসুন্দরী, ‘ঘুমোবেন না? সারা রাত ধরে হুঁকো টেনেই যাবেন?’
রামচন্দ্র বললেন, ‘বোসো বউ। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
শ্যামাসুন্দরী অবাক হয়ে বললেন, ‘এই মাঝরাত্তিরে কী এমন কথা মনে পড়ল?’
‘নাহ্, মাঝরাতে হঠাৎ মনে পড়েনি। কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম। কিন্তু আর সহ্য করতে পারছি না।’
এইবার স্বামীর পাশে বসে পড়লেন শ্যামাসুন্দরী, ‘খুলে বলুন দেখি, কী ব্যাপার?’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে রামচন্দ্র বললেন, ‘এমন দুর্ভিক্ষ তো কখনো দেখিনি বউ! মন্বন্তর তো জীবনে কম দেখলাম না। কিন্তু এ যে সত্যিই দুর্ভিক্ষ! ভিক্ষা দেওয়ার মানুষ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া ভার হয়ে দাঁড়িয়েছে এবার। গরিব মানুষগুলো রাস্তায় পড়ে ধুঁকছে! গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবার!’
শ্যামাসুন্দরী নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এ নিয়ে মন খারাপ করবেন না। আপনি নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, দেখেন বেশি— তাই হয়তো বেশি খারাপ লাগছে। কিন্তু আপনি একা আর কী-ই বা করতে পারেন, বলুন দেখি!’
কথাটা মিথ্যে নয়। রামচন্দ্র নিজেও ধনী মানুষ নন। কায়ক্লেশে দিন চলে তাঁর। সামান্য কয়েক বিঘা দেবোত্তর জমি, আর কয়েকটা বাড়িতে যজমানি করে এমন কিছু আয় হয় না তাঁরও। সমস্ত জেলা জুড়ে যে বিশাল দুর্ভিক্ষ ঘনিয়ে এসেছে, তার সামনে তিনি এক তুচ্ছ দরিদ্র ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কিছুই নন।
‘কিন্তু সে-কথা ভাবলে যে আমি থাকতে পারছি না বউ! খিদেয় ছটফট করতে করতে মানুষ মরে যাচ্ছে— এই দৃশ্য দেখতে দেখতে মানুষ নিজে কী করে খায়, তা আমি এবার আর বুঝতে পারছি না।’
‘সেই জন্যেই বুঝি আজ ভাত ফেলে উঠে গেলেন?’ চমকে উঠলেন শ্যামাসুন্দরী।
জবাব না দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রামচন্দ্র। তারপর বললেন, ‘আমার একটি কথা রাখবে? তুমি আমার সঙ্গে না থাকলে আমি অমন কাজে হাত দেওয়ার সাহস পাব না।’
‘আপনার কোন কথাটা আজ অবধি রাখিনি বলুন শুনি,’ বললেন তিনি।
রামচন্দ্র আশা-ভরা চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘গোলায় গত বছরের ধান বেশ কিছু এখনও আছে। আমি ঠিক করেছি... মানে তুমি যদি মত দাও... তাহলে প্রতিদিন কিছুটা খিচুড়ি করে, যতজন আসবে, তাদের খাওয়াতে থাকি। অন্তত কিছু মানুষের তো পেট ভরবে তাতে!’
শ্যামাসুন্দরী জানতেন এই প্রস্তাব আসতে চলেছে। সত্যি বলতে, দুর্ভিক্ষের আঁচ তাঁর রান্নাঘরে না ঢুকলেও, চারদিকের গ্রামে যে হাহাকার পড়ে গিয়েছে, সে কথা তিনিও জানেন বইকি! তবু বললেন, ‘কিন্তু এভাবে ক’জনের উপকার করতে পারবেন আপনি? চারদিকে হাজার হাজার অভুক্ত মানুষ। তার মধ্যে আপনার এই এক কড়াই খিচুড়ি ক’জনের পেট ভরাতে পারবে?’
রামচন্দ্র ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘যদি দশজনের মুখেও অন্ন জোগাতে পারি, তবুও তো কিছু উপকার হয়! কিন্তু তার আগে আমার জানা দরকার, তোমার এতে অমত নেই তো? শেষ অবধি সংসারটা তো চালাও তুমিই!’
কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শ্যামাসুন্দরী বললেন, ‘তাহলে কাল থেকেই শুরু করে দিই?’
কৃতার্থ চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন রামচন্দ্র।
....
কী করে যে এই সংবাদ রাষ্ট্র হয়ে গেল, তা ঈশ্বরই বলতে পারবেন। কিন্তু পরদিন সূর্য মাথার উপরে উঠতে না উঠতেই দেখা গেল, রামচন্দ্রের বাড়ির উঠোনে উবু হয়ে বসে আছে অন্তত কুড়িজন দুর্ভিক্ষের কাঙালি। তাদের হাড় জিরজিরে দেহ দেখলে যতটা না ভয় করে, তার চেয়েও বেশি চমকে উঠতে হয় তাদের চোখের দিকে তাকালে। সে চোখে কোনো আশা নেই, কোনও ভাষা নেই। ড্যাবড্যাবে চোখে তারা ধৈর্য ধরে তাকিয়ে রয়েছে উঠোনের একেবারে ডানপাশের রান্নাঘরের দিকে।
একটু পরেই দু’জন বলিষ্ঠ দেহের পুরুষ প্রকাণ্ড লোহার কড়াইটা কোনোক্রমে বয়ে নিয়ে এল উঠোনের মাঝখানে। তারপরেই পাতা পড়ল সারি সারি।
‘কই গো, সব বসে যাও দেখি! খিচুড়ি কিন্তু শুধু। আর কিছু করার অবসর হয়নি।’
শ্যামাসুন্দরী কড়াইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে কাঙালির দল প্রায় ছুটে এসে বসে পড়ল পাতার পাশে। আজ বহুদিন পর তারা কিছু খেতে পাবে।
গরম গরম খিচুড়ি পাতার উপর ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। পাগলের মতো তার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে বুভুক্ষু মানুষের দল। খিচুড়ি এখনও প্রচণ্ড গরম। তাদের মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, তাদের হাত, তাদের জিভ— সব পুড়ে যাচ্ছে সেই উত্তাপে। কিন্তু ক্ষুধা— তীব্র ক্ষুধা তাদের উন্মাদ করে দিয়েছে। বিকৃত মুখে দু’হাতে সেই আগুনের মতো গরম খিচুড়ি খাওয়ার চেষ্টা করছে তারা।
দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালেন শ্যামাসুন্দরী। এই দৃশ্য দেখেও নির্বিকার থাকতে পারা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
আর ঘুরে দাঁড়ালেন বলেই তিনি দেখতে পেলেন এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দু’হাতে দুটো পাখা নিয়ে বেরিয়ে এসেছে তাঁর মেয়ে। গত পৌষে এগারো বছর বয়স হয়েছে তার। বিয়ে হয়ে গিয়েছে ছয় বছর আগে। এমনভাবে সকলের মাঝখানে বেরিয়ে আসার কথা নয় তার। এতক্ষণ সেও রান্নাঘরে মাকে সাহায্য করছিল। কিন্তু এবার আর থাকতে না পেরে কোনোমতে ঘোমটাটা তুলে বেরিয়ে এসেছে উঠোনে।
কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা এগিয়ে গিয়ে সারদা বসল সেই দুর্ভিক্ষপীড়িত দুর্ভাগা মানুষগুলোর সামনে। দু’হাতে দুটো পাখা নিয়ে প্রাণপণে বাতাস করতে করতে সে বলতে লাগল, ‘আস্তে খাও, বাবারা! তাড়া নেই কোনো। কেউ তোমাদের খাবার নিয়ে চলে যাবে না। কিন্তু এভাবে খেলে যে জিভ, গলা— সব পুড়ে যাবে গো! আস্তে খাও, ধীরেসুস্থে খাও। আমি বাতাস করছি।’
সত্যি সত্যিই প্রত্যেকের সামনে গিয়ে বসছে সারদা। বাতাস করছে প্রাণপণে। চেষ্টা করছে খিচুড়ি যেন তাড়াতাড়ি জুড়িয়ে যায়। আর তার সঙ্গে অনবরত কথা বলে চলেছে অপরিচিত গরিব মানুষগুলোর সঙ্গে, ‘আস্তে খাও। আরেকটু জুড়িয়ে যাক, তারপরে খেও। জল দেব একটু?’
এইবার সত্যিই খাওয়ার গতি কমাচ্ছে মানুষগুলো। অবাক হয়ে তাকাচ্ছে সারদার দিকে, যেন এই আদর-মাখা কথা ক’টা তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে— তারা মানুষ। ক্ষুধার্ত হলেও, দুর্ভাগা হলেও তারা মানুষ। তাদেরই মধ্যে কেউ একজন কেঁদে উঠল হাউ হাউ করে। ভাঙা গলায় বলল, ‘মা! মা গো!’
আর কী আশ্চর্য, এগারো বছরের বালিকা এক ছুটে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে। জোরে জোরে হাওয়া করতে করতে বলল, ‘কেঁদো না বাবা। আস্তে আস্তে খাও। জল খাও একটু। ফুরিয়ে গেলে আবার দেব।’
ক্রমশ শান্ত হচ্ছে মানুষগুলো, যেন আজ বহুকাল পর তারা শুধু খেতেই পায়নি, ফিরে পেয়েছে তাদের জননীকে। শিশু সারদা শুধু তাদের খাদ্য জোগায়নি; অন্যের উঠোনে বসে রবাহূত অতিথির মতো অপরের অন্ন খাওয়ার মধ্যে যে গ্লানি রয়েছে, তা নিঃশেষে মুছে দিয়েছে।
আচমকা উঠোনের অন্য প্রান্তে একটা হই হই শুনে চমকে উঠে সেদিকে তাকাল সারদা।
একটি মেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেছে। কথা নেই বার্তা নেই, উঠোনে ঢুকে সোজা ছুটে গিয়েছে গোরুর জন্য ডাবার মধ্যে যে কুঁড়ো ভেজানো রয়েছে, তার দিকে। তারপর সটান সেই গোখাদ্য খেতে শুরু করে দিয়েছে সে। বোঝাই যাচ্ছে, ক্ষুধা তাকে প্রকৃতই উন্মাদ করে দিয়েছে।
এতক্ষণ বেশ শক্ত হয়ে সবাইকে সামলাচ্ছিল সারদা। এইবার তার চোখ হঠাৎ জলে ভরে গেল। মেয়েটার বয়স কুড়ি-বাইশের বেশি হবে না বোধহয়। ডোম বা বাগদিদের মেয়ে। তেলের অভাবে চুলে জট পড়ে গিয়েছে। চোখের দৃষ্টি প্রকৃতিস্থ নয়।
এদিক থেকে সকলে মিলে চিৎকার করে উঠেছে, ‘ওরে, ওগুলো খাস নে। এদিকে খিচুড়ি দেওয়া হচ্ছে!’
ক্ষুধায় উন্মাদ মেয়েটি কিছু শুনতে পাচ্ছে না দু’হাতে সেই ভেজানো কুঁড়ো তুলে সে মুখে দিচ্ছে। খাওয়ার চেষ্টা করছে গবগব করে।
হাত থেকে পাখা দুটো ফেলে দিয়ে ছুটতে ছুটতে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সারদা। তারপর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মেয়েটিকে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে। বিনা দ্বিধায় মুখের মধ্যে তর্জনী ঢুকিয়ে বের করে আনল সেই কুঁড়ো। তারপর কোনো মতে বলল, ‘এ কী করছ দিদি? এসো আমার সঙ্গে!’
মেয়েটার চোখ দুটো স্থির হয়ে রইল সারদার চোখের উপর। বোধহয় এই সংক্ষিপ্ত জীবনে সে কখনো কারও মুখে এত মায়া দেখেনি।
‘এসো বলছি!’ বলে তার হাত ধরে টান দিল সারদা। নিয়ে চলল পাশের পুণ্যিপুকুরের দিকে।
‘হাত ধুয়ে নাও।’ জলের পাশে তাকে বসিয়ে দিয়ে সারদা বলল, ‘মুখে-চোখে জল দাও। কুলকুচো কর। তোমাকে আজ আমি নিজের হাতে খাইয়ে দেব।’
বশ মেনে গেছে মেয়েটা। বাধ্য শিশুর মতো হাতমুখ ধুলো। সারদা খানিকটা তেল নিয়ে থাবড়ে থাবড়ে ঘষে দিল তার মাথায়। তারপর হাতের অঞ্জলিতে জল নিয়ে ঢেলে দিল। একটু পরে যখন পুকুরের পাড় থেকে উঠে এল দু’জনে, তখন মেয়েটি যেন শান্ত হয়েছে।
‘এইবার বসো দিদি। চুপটি করে বসো। আমি তোমার জন্য খিচুড়ি নিয়ে আসি।’
চুপ করে বসে রইল মেয়েটি। এখনও তার কপাল থেকে গড়িয়ে নামছে জল। কিন্তু তার চোখ মাটির দিকে। এই মুহূর্তে তাকে দেখলে মনে হচ্ছে না, একটু আগে সে গোরুর জাবনা খেতে গিয়েছিল ক্ষুধার জ্বালায়।
একটু পরেই তার সামনে রাখা পাতায় খিচুড়ি ঢেলে দিল সারদা। তারপর জোরে জোরে পাখার হাওয়া করতে করতে বলল, ‘দাঁড়াও, এখনই হাত দিও না বাপু! একেবারে আগুন গরম। হাত তো পুড়বেই, গলা, জিভ— সমস্ত পুড়ে যাবে। ওই দেখ, ওদের কী অবস্থা। কেবল ঘটি ঘটি জল খাচ্ছে জিভ পুড়িয়ে।’
শক্ত হয়ে বসে রইল মেয়েটি।
আরও কিছুক্ষণ পরে সারদা বলল, ‘এইবার বেশ জুড়িয়ে এসেছে। খাও ধীরে ধীরে।’
এক গরাস খিচুড়ি মুখে দিয়ে চুপ করে বসে রইল মেয়েটি। এতক্ষণে তার গাল বেয়ে নেমে এল চোখের জল। কোনোক্রমে ঢোক গিলে সামনে বাবু হয়ে বসে থাকা মেয়েটির উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘তুমি কে মা?’
অবাক হয়ে সারদা বলল, ‘আমি আবার কে! আমি এই বাড়ির মেয়ে, সারদামণি। ওই যে আমার মা দাঁড়িয়ে রয়েছেন!’
মেয়েটি কিন্তু সারদার ইঙ্গিত অনুযায়ী শ্যামাসুন্দরীর দিকে তাকাল না। জল-ভরা চোখে একদৃষ্টে সে তাকিয়ে রইল সারদামণির দিকে।
জয়রামবাটি গ্রামের নিতান্ত গরিব বাড়ির এই মেয়েটি যে একদিন সৎ-এর মা, অসৎ-এরও মা হয়ে উঠবেন, সে কথা অবশ্য সেদিন তারা কেউই জানত না।