


রাজদীপ গোস্বামী, মেদিনীপুর: জিলিপির নাম শুনলেই জল আসে জিভে। আর সেই জিলিপি যদি হয় মুগ ডালের—তবে তো আর কথাই নেই। গরমের বিকালে ধোঁয়া ওঠা সিঙ্গারার সঙ্গে জিলিপির যুগলবন্দির জুড়ি মেলা ভার। পয়লা বৈশাখের প্রাক্কালে সেই ছবিই যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর সহ বিভিন্ন প্রান্তে। জেলার বিভিন্ন অলিগলি এখন মিষ্টির সুগন্ধে ভরপুর। ছোটো ছোটো দোকান থেকে শুরু করে পুরানো মিষ্টির আড্ডা—সব জায়গাতেই চলছে মুগের জিলিপি তৈরির ধুম। বাঙালির নতুন বছরের শুরুতেই মিষ্টিমুখ করার ঐতিহ্য বহু পুরানো। আর সেই রীতিকে কেন্দ্র করেই এখন কারিগরদের ব্যস্ততা চরমে।
কেশপুর ব্লক অফিসের পাশের এক ছোটো দোকানে সকাল থেকেই কড়াইয়ে ফুটছে তেল। সেই তেলে দক্ষ হাতে মুগডালের পেস্ট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তৈরি হচ্ছে জিলিপির পাক। দোকানের মালিক ও প্রসিদ্ধ মিষ্টির কারিগর দিব্যেন্দু রায় জানালেন, মুগের জিলিপির চাহিদা সবসময়ই ভালো। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০ পিস বিক্রি হয়। আর অর্ডার এলে এক হাজার থেকে দুই হাজার পিস বানাতে হয়। পয়লা বৈশাখের আগে তো কাজের চাপ আরও বেড়ে গিয়েছে।
তবে শুধু চাহিদা থাকলেই তো হয় না—দামের চাপও রয়েছে সমানতালে। কারিগরদের কথায়, মুগ ডাল এবং চিনির দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই বাড়াতে হয়েছে জিলিপির দাম। আগে যেখানে একটি জিলিপি ৫ টাকায় বিক্রি হত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭টাকায়। তবুও ক্রেতাদের আগ্রহে ভাটা পড়েনি একটুও। দোকানে জিলিপি তৈরি হওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
মেদিনীপুর শহরের বাসিন্দা পেশায় শিক্ষক সঞ্জয় দাস বলেন, পয়লা বৈশাখ মানেই বাড়িতে মুগের জিলিপি নিয়ে ফেরা। ছোটবেলা থেকেই এই রীতি চলে আসছে। এখন যদিও আগের মতো সব দোকানে পাওয়া যায় না, তবুও কয়েকটি নির্দিষ্ট দোকানে এখনও সেই স্বাদ অটুট।
আসলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে অনেক কিছু। পুরানো কারিগরদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় আগের মতো সর্বত্র আর দেখা মেলে না এই বিশেষ ধরনের জিলিপির। তবুও কেশপুর, নাড়াজোল, ডেবরা, মেদিনীপুর শহরের বেশকিছু এলাকায় এখনও টিকে রয়েছে এই ঐতিহ্য। পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া এবং হুগলির চন্দননগরেও মুগের জিলিপির সুনাম রয়েছে।
কীভাবে তৈরি হয় এই জিলিপি? মুগের জিলিপি তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ চমকপ্রদ। প্রথমে ভালো মানের মুগ ডাল ভিজিয়ে রেখে পরে তা বেটে মসৃণ পেস্ট তৈরি করা হয়। সেই পেস্ট বিশেষ কৌশলে গরম তেলে জিলিপির আকারে ছাড়া হয়। সোনালি রং ধরার পর সেটিকে ডুবিয়ে দেওয়া হয় হালকা চিনির রসে। আর তাতেই তৈরি হয় সুস্বাদু, সুগন্ধী মুগের জিলিপি।
এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির স্বীকৃতি আরও বাড়ানোর দাবিও উঠেছে। কেশপুরের মুগের জিলিপিকে জিআই ট্যাগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, সঠিক প্রচার এবং সরকারি স্বীকৃতি মিললে এই মিষ্টি জেলার গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্য ও দেশের গর্ব হয়ে উঠতে পারে।
মেদিনীপুর পুরসভার চেয়ারম্যান সৌমেন খান স্মৃতিচারণা করে বলেন, ছোটোবেলায় এই জিলিপি খাওয়ার জন্য বায়না করতাম। এখনো সেই স্বাদ ভোলার নয়। ব্যস্ততার মধ্যেও পয়লা বৈশাখে মুগের জিলিপি খাওয়া যেন এক আলাদা আনন্দ।