


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: পুলিশের এফআইআর, আটক, বাধা, হেনস্তা... তারপরও তাঁদের থামানো যাবে না। বুধবার আরও একবার তা স্পষ্ট করে দিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। বুঝিয়ে দিলেন, ভোট চুরির দায়ে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা না দেওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাবে মহাজোট ‘ইন্ডিয়া’। হুংকার দিলেন—‘মোদি-শাহ বাঁচাতে পারবেন না জ্ঞানেশ কুমারকে। ভোট চুরির প্রতিবাদে যে লড়াই শুরু করেছি, ক্ষমতা থাকলে তা আটকে দেখাক বিজেপি।’ রাহুলের চ্যালেঞ্জ, ‘এটা আমার গ্যারান্টি। নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, মোহন ভাগবত, জ্ঞানেশ কুমাররা যা করছেন, তার শাস্তি হবেই। কেউ বাঁচাতে পারবে না।’
মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন অভিযানের পথে আকাশবাণী ভবন চত্বরে ঢুকে রাত পর্যন্ত ধরনা দেওয়ার ‘অপরাধে’ রাহুল, প্রিয়াঙ্কার পাশাপাশি দীপেন্দর যাদব, রাজা ওয়ারিংয়ের মতো কং-সাংসদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে দিল্লি পুলিশ। সরকারি অফিসে বলপূর্বক কেন ঢুকেছেন? প্রশ্ন পুলিশের। আর রাহুলের প্রতিক্রিয়া? ‘১০০ এফআইআর করেও আমাকে থামানো যাবে না। মোদি-শাহকে আর বিরোধীরা ডরায় না। সরকার যেভাবে পুলিশ দিয়ে আমাদের আটকানোর চেষ্টা করছে, তা আসলে নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহজির প্যানিক রিঅ্যাকশন।’ মঙ্গলবারের সেই রেশ বজায় রেখে বুধবারও জ্ঞানেশ ইস্যুতে চলল বিরোধীদের বিক্ষোভ। তবে এদিন ছিল অঘোষিত। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের আমন্ত্রণে জনপথের একটি দক্ষিণ ভারতীয় রেস্তরাঁয় জমায়েত করেন বিরোধীরা। রাহুল, প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, মহুয়া মৈত্র, সামিরুল ইসলাম। লাঞ্চের আয়োজনে একজোট হয়ে সেখানেই ঠিক হয়—যাওয়া হবে যন্তরমন্তর। যদিও ততক্ষণে এই প্ল্যানের খবর জেনে গিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তাই দেরি না করে দুর্গের আদলে ঘিরে ফেলা হল যন্তরমন্তর। শাটার টেনে দেওয়া হল সেখানকার চারটি দোকানের। বৃদ্ধ আইসক্রিমওয়ালার গাড়ির ফ্রিজারেও লাগিয়ে দেওয়া হল তালা। বিক্রি বন্ধ। ভিড় চলবে না। জারি হল বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা। লোহার ব্যারিকেডে আটকে গেল যন্তরমন্তরগামী অশোক রোড, রাইসিনা রোড। প্রথমে লোহার ত্রিস্তরীয় ব্যারিকেড। তার সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের প্রাচীর।
তবুও থামলেন না বিরোধী সাংসদরা। লাক্সারি বাসে রেস্তরাঁ থেকে রওনা দিলেন যন্তরমন্তর। পুলিশ আটকে দিল উইন্ডসর প্লেসের গোল চক্করেই। অশোক রোডের মুখে। সাংসদদের সেই বাস আটকাতেই জড়ো হওয়া হাজারো যুব কংগ্রেস সমর্থক প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। পুলিশের বাসের মাথায় উঠে পড়লেন তাঁরা। মুখে সরকার বিরোধী স্লোগান। জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভে ফের উত্তাল হল এলাকা। পুলিশ শুরু করে দিল কংগ্রেস কর্মীদের ধরপাকড়। বাসের ভিতর থেকে তা দেখেই তেড়েফুঁড়ে নেমে এলেন রাহুল। নামলেন প্রিয়াঙ্কা, মহুয়ারাও। পুলিশের সঙ্গে শুরু হয়ে গেল ধস্তাধস্তি। লাল মলাটের সংবিধান বুকে চেপে মাটিতে শুয়ে পড়লেন প্রিয়াঙ্কা। মাথার কাছে মহুয়া। রাহুল দিলেন নেতৃত্ব। জানিয়ে দিলেন, ‘রাস্তাতেই রাত কাটাব। দেখি কে আটকায়।’ একে একে ইন্ডিয়ার প্রতিবাদী সাংসদরা রাজধানীর রাজপথে শুয়ে পড়লেন। পুলিশও সংখ্যা বাড়িয়ে শুরু করল ‘ছত্রভঙ্গ-অভিযান’।
অনুরোধ-উপরোধে কাজ না হওয়ায় শেষমেশ রাহুল গান্ধীকে চ্যাংদোলা করে তোলা হল পুলিশের গাড়িতে। রাহুল কিছুতেই বাসে উঠবেন না। কিন্তু তিনি একা। পুলিশ কয়েকশো। রাহুলের পরই প্রিয়াঙ্কা। তিনিও চেষ্টা করলেন প্রতিহত করার। বলপূর্বক আটক করা হল বিজেপি বিরোধী জনপ্রতিনিধিদের। নিয়ে যাওয়া হল কস্তুরবা গান্ধী থানায়। কাউকে আবার ছত্রশাল স্টেডিয়াম। রাহুল আটক শুনে থানায় পৌঁছান তেলেঙ্গানা ও কেরলের মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি এবং ভি ডি সতীশন। রাতে অবশ্য রাহুল সহ সবাইকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ কি শেষ? তা নয়। কারণ, আজ বৃহস্পতিবারও রাস্তায় নামছে বিরোধীরা। বুধবার ‘কালা দিবস’ তাদের কাছে। আজ, বৃহস্পতিবার তারই প্রতিবাদ দেশজুড়ে। আন্দোলনে শামিল হতে দিল্লি পৌঁছে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এককাট্টা হচ্ছে বিরোধীরা। ঘুম ছুটেছে মোদি-শাহের!