


সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: বাণিজ্য চুক্তির জয়গান। দূর-ভবিষ্যতের উজ্জ্বল স্বপ্ন ফেরি। কিন্তু বাস্তবটা কী? রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও বাণিজ্যকে কি মার্কিন শর্তের মুখে বলিদান দেওয়া হয়েছে? সংসদের অন্দর ও বাইরে বিরোধীরা লাগাতার এই প্রশ্ন করে চলেছে। সরকারপক্ষ সরাসরি উত্তর দিতে নারাজ। বরং গত ৪৮ ঘণ্টায় বিস্ময়কর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে মন্ত্রিমহলে। রাশিয়া থেকে তেল কেনা ভারত কি বন্ধ করে দিচ্ছে? যা আমেরিকা দাবি করছে, তা কি ঠিক? এই প্রশ্নের উত্তরে লাগাতার কেন্দ্রীয় শিল্প-বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল বলে যাচ্ছেন, ‘বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে রাশিয়ার তেল কেনার কোনো সম্পর্ক নেই। সবটাই বলতে পারবে বিদেশ মন্ত্রক। প্রশ্ন করতে হবে বিদেশ মন্ত্রককে।’ আর বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকরকে প্রশ্ন করলে তিনি বলছেন, ‘বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রকের সঙ্গে। তেল কেনা, মার্কিন শর্ত মেনে নেওয়া, কিংবা চুক্তি স্বাক্ষর—এর একটাও বিদেশ মন্ত্রকের কাজ নয়। এই প্রশ্ন বাণিজ্য মন্ত্রককে করুন। বাণিজ্যমন্ত্রীই উত্তর দিতে পারবেন।’ সরকারের মধ্যে এমন সমন্বয়হীনতা এবং চুক্তির প্রধান শর্ত নিয়ে একে অন্যের উপর দায় চাপানোর এই প্রবণতা বেনজির। কিন্তু এর মধ্যে কেন্দ্র কী করছে? শুরু হয়ে গিয়েছে বিকল্প তেল কেনা। ইতিমধ্যে ২০ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেলের জন্য ভেনেজুয়েলার কাছে অর্ডারও চলে গিয়েছে। কোন ভেনেজুয়েলা? প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে রাতের অপারেশনে তুলে আনার পর যে দেশের তৈলভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। আর সেই দাবি প্রকাশ্যেই করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর নির্দেশে অন্য কোনো দেশের ট্যাঙ্কার ভেনেজুয়েলায় ঢুকতেই দিচ্ছে না আমেরিকার বাহিনী। ফল? ট্রাম্পের অনুগত হওয়া ছাড়া গতি নেই। ভারতও সেটাই করল। নতি স্বীকার। জানা যাচ্ছে, এপ্রিল মাসে ভারতে ডেলিভারি হবে ২০ লক্ষ ব্যারেল তেল। নজর করার মতো বিষয় হল, ঠিক এই কথাটাই মার্কিন প্রশাসন শুক্রবার বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল—ভারত এবার আমেরিকা এবং ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কিনবে। সেটাই হল।
বিরোধীদের প্রশ্ন হল, এটাই যদি সত্যতা হয়, তাহলে তা প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে না কেন? বিরোধীরা সংসদ ভবনে সোমবার এই ইস্যুতে সরব হয়েছে। কংগ্রেস সহ মহাজোট ইন্ডিয়ার তাবৎ দল বলেছে, এ কেমন সরকার চলছে? এক মন্ত্রী অন্য মন্ত্রীর দিকে দায় ঠেলে দিচ্ছেন। রাশিয়া থেকে ভারত তেল কেনা বন্ধ করছে কি করছে না? এর তো সহজ উত্তর থাকবে! সরকারপক্ষ যত এই উত্তর দিতে ভয় পাবে, ততই কিন্তু সন্দেহ বাড়বে। ভেনেজুয়েলার থেকে তেলের অর্ডারের খবর অবশ্য ধীরে ধীরে সন্দেহের জট কাটাচ্ছে। কারণ, ভেনেজুয়েলার তেলের ডিলে সরাসরি অধিকার আমেরিকার। ওই দেশের তেল যারাই কিনুক, লাভ হবে আমেরিকার। আর রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে? ভারতের উপর সেই ২৫ শতাংশ শুল্ক-জরিমানার খাঁড়া তো ঝুলছেই।
লাগাতার এই চাপে এদিন বিকেলে বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি অবশ্য অদ্ভুত এক যুক্তি দিয়েছেন। রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধের বিষয়টি সযত্নে এড়িয়ে তাঁর জবাব, ‘জাতীয় সুরক্ষার স্বার্থে আমাদের অনেক দিক ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আমরা কোন উৎস বন্ধ করছি, এই প্রশ্নের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল আমরা আরও কতগুলো সোর্স বাড়াচ্ছি। কারণ আমরা নির্দিষ্ট কোনও উৎসের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে চাই না। সরকারের কাছে অগ্রাধিকার শুধুমাত্র নাগরিকের। জ্বালানির নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা তো বটেই, সেই তেল যাতে সুরক্ষিত হয় এবং ন্যায্যমূল্যে মানুষ পায়, সেটাই আমরা দেখছি।’ যদিও গত কয়েক বছরে অশোধিত তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে তলানিতে যাওয়ার পরও সাধারণ মানুষ কতটা ন্যায্যমূল্যে পেট্রল-ডিজেল কিনেছে, সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে।