


দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: পুশব্যাক নয়। আবার নাগরিকত্বও নয়। স্রেফ শরণার্থীর মর্যাদা! তার মানে, থাকতে দিলেও দায়িত্ব নেবে না রাষ্ট্র! তা হলে কী পরবর্তী গন্তব্য ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’? পয়লা সেপ্টেম্বর অভিবাসন সংক্রান্ত কেন্দ্রের গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর এমন প্রশ্নে উৎকণ্ঠায় সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষজন। তাঁদের স্পষ্ট কথা—‘হিন্দু শরণার্থীদের নিয়ে ছেলেখেলা করতে চাইছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।’
প্রাথমিকভাবে ওই বিজ্ঞপ্তিতে ২০১৪ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আসা বাংলাদেশি হিন্দুদের পুশব্যাক তত্ত্ব ছিলে না। তাতে অনেকটাই স্বস্তি পেয়েছিলেন সীমান্তের লোকেরা। কিন্তু ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ছবিটা বদলাতে থাকে সীমান্ত এলাকাগুলিতে। কেননা, ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যায় নাগরিকত্ব পাবেন না শরণার্থীরা। দেশভাগের সময় আত্মীয়-স্বজন, বাস্তুভিটে হারিয়ে বাংলাদেশ থেকে কাতারে কাতারে মানুষ এপারে চলে এসেছেন। এখনও হিন্দুরা সে দেশে আক্রান্ত এপারে থাকে আত্মীয়দের বাড়িতে চলে আসছেন। গত এক বছরে নদীয়ার ধানতলা-হাঁসখালি কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত পেরিয়ে আসতে গিয়ে অনেকেই ধরা পড়েছেন। বিদেশি নাগরিক আইনে মামলা তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হতো। কেন্দ্রের নয়া অভিবাসন নীতিতে এখন আশঙ্কার মেঘ দেখছেন সকলেই। তাঁদের মতে, শরণার্থীর মর্যাদা দিয়েও নাগরিকত্ব না দেওয়া কেন্দ্রের দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
বৃহস্পতিবার কথা হচ্ছিল সীমান্ত ঘেঁষা ধানতলা নওগাঁ পাড়ার শৈলেন মালাকারের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘আমার অনেক আত্মীয় বাংলাদেশে থাকেন। সেখানে হিন্দুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা আকছার ঘটছে। এখন তাঁরা যদি ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে আমার কাছে চলে এল। অর্থাৎ, তাঁরা এদেশে শরণার্থী। অথচ, তাঁদের নাগরিকত্বই দেওয়া হবে না। ব্যাপারটা দাঁড়াল এরকম, শরণার্থীকে থাকতে দিলাম। কিন্তু দায়িত্ব নিলাম না। কেন্দ্রের এমন অবস্থান বেশ ধোঁয়াটে। হয় প্রত্যেককে নাগরিকত্ব দিতে হবে, না হলে ফেরত পাঠাতে হবে। ভোটের লোভে মধ্যপন্থা মোটেও কাম্য নয়।’ কৃষক হারান মণ্ডল শৈলেনবাবুর কথায় থাবা বসিয়ে বলতে শুরু করলেন—‘শরণার্থীদের মর্যাদা দেওয়া কথা বলা হচ্ছে। অথচ, তাঁদের কোথায় থাকতে দেওয়া হবে, তা স্পষ্ট
করছে না। দু’দিন বাদে ভোট ফুরোলে তাঁদের নিয়ে গিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে না তো?’ কেন্দ্রীয় সরকারকে বিশ্বাস করতে পারছেন না শুক্লা বিশ্বাস। তাঁর কথায়, ‘এ বিষয়ে কেন্দ্রকে বিশ্বাস করার প্রশ্নই নেই। এত লোককে আমাদের দেশে এনে থাকতে দেওয়া হলে, তাঁদের দায় কে নেবে? হয় তাঁদের নাগরিকত্ব দিক, যাতে তাঁরা নিজেরা খেটে খেতে পারেন। সেটা না পারলে পাঠিয়ে দেওয়া হোক। আসলে, হিন্দু শরণার্থীদের করুণ অবস্থা নিয়ে প্রহসন করা হচ্ছে।’ স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষক কল্যাণ রায়ও বলছিলেন, হিন্দু শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হোক। আমরা এর বিরুদ্ধে নই। কিন্তু তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হোক।’ এদিন বিধানসভার অধিবেশনেও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করে একই দাবি তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। -নিজস্ব চিত্র