


নয়াদিল্লি: ‘সমালোচনা গণতন্ত্রের আত্মা। যদি আপনার শিরায় শিরায় গণতন্ত্র প্রবাহিত হয়, তাহলে সমালোচনাকে অবশ্যই স্বাগত জানাতে হবে।’ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু সমালোচনার ‘মৌলিক অধিকার’ কি সত্যিই মোদির ভারতে আছে? সংবাদমাধ্যম হোক বা সাধারণ মানুষ—বাক স্বাধীনতার উপর শাসকের দমন নীতির অভিযোগ বারবার উঠেছে। সরব হয়েছে বিরোধীরা। এবার খাতায়-কলমে তারই প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলল। সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বাক স্বাধীনতার মাপকাঠিতে বিশ্বের ৩৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ২৪। অর্থাৎ বিশ্ব তালিকার শেষ দশে জায়গা পেয়েছে বৃহত্তম গণতন্ত্র।
২০২১ সালে আমেরিকার ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের থিঙ্কট্যাঙ্ক ‘দ্য ফিউচার অফ ফ্রি স্পিচ’-এর তরফে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। নাম ‘হু কেয়ারস অ্যাবাউট ফ্রি স্পিচ’। তার উপর ভিত্তি করে ২০২৪ সালের অক্টোবরে ‘ইউ গভ’ ও বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার তরফে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। এই সমীক্ষায় মূলত দু’টি বিষয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ১) বাক স্বাধীনতাকে সমর্থন করতে গিয়ে বিশ্বে কত মানুষ বিভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন? ২) কোন বিষয়গুলি নিয়ে জনগণকে প্রকাশ্যে আলোচনা ও সমালোচনার অনুমতি দেওয়া উচিত? এক্ষেত্রে প্রথম সারিতে রয়েছে নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন, হাঙ্গেরি ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশ। সমীক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে জনগণের মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল। গভর্নমেন্ট সেন্সরশিপ, অর্থাৎ সরকারের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই কি সংবাদ পরিবেশন, ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারেন মানুষজন? সরকারি নীতির সমালোচনা করে কোনও মন্তব্য কি করা যায়? এই ধরনের প্রশ্নেই ভারতের বাক স্বাধীনতার কঙ্কালসার চেহারা উঠে এসেছে। বিস্ময়করভাবে দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স ও আফ্রিকার কিছু দেশের পাশাপাশি ভারতেও জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশের কিছু কম মানুষ মনে করেন, সমালোচনা প্রতিরোধের জন্য সরকার ব্যবস্থা নিতেই পারে! অর্থাৎ কোথাও যেন সাধারণ মানুষ মেনে নিয়েছে, এটাই ভবিতব্য। এটাই নিয়তি। কিংবা অন্ধ সমর্থন—শাসক যা করছে, সেটাই ঠিক! বিরোধীদের প্রশ্ন, এর নেপথ্যে সরকারের প্রতি আতঙ্ক কাজ করছে না তো? সম্প্রতি দেশের এক সংবাদসংস্থার সঙ্গে ঝামেলার জেরে উইকিপিডিয়ার একটি পেজ বন্ধ করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেখানেও বাক স্বাধীনতা নিয়ে সওয়াল করতে দেখা যায় উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনকে। বিরোধীদের কথায়, মোদি জমানায় এ আর নতুন কী? প্রতিষ্ঠান বিরোধী কথা বললেই আইনি জাঁতাকলে বন্দি হতে হবে। কিংবা জুটবে ‘দেশদ্রোহী’র তকমা। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়। এ যেন মনে করিয়ে দেয় নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সেই লাইন—‘সবাই দেখছে যে, রাজা উলঙ্গ, তবুও সবাই হাততালি দিচ্ছে? সবাই চেঁচিয়ে বলছে; শাবাশ, শাবাশ! কারও মনে সংস্কার, কারও ভয়; ...কেউ-বা পরান্নভোজী, কেউ কৃপাপ্রার্থী, উমেদার, প্রবঞ্চক।’