


অগ্নিভ ভৌমিক, হাঁসখালি: মাঠে চাষের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন ষাটোর্ধ্ব যোগেন আধিকারী। মতুয়া অধ্যুষিত হাজিরনগর গ্রামে বাড়ি। কমিশনের সাপ্লিমেন্টারি তালিকা নিয়ে উৎসুক গ্রামবাসী ভিড়। সেখানে শুনলেন, তালিকায় তাঁর নাম নেই। বাদ পড়েছে তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যের নামও। যোগেনবাবু সহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা নাগরিকত্ব পেতে সিএএ’তে আবেদন করেছিলেন। শুনানিও হয়ে গিয়েছে। তিনি বেশ নিশ্চিতে ছিলেন, ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না কমিশন।
যোগেনবাবুর এমন নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ ছিল। মাসখানেক আগে বিজেপি নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সিএএ’তে আবেদন করলেই ভোটার তালিকায় নাম থাকবে। কিন্তু, মঙ্গলবার নাম বাদ পড়তেই বৃদ্ধের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যায়। আক্ষেপের সুরে তিনি বলছিলেন, ‘শুনেছিলান সিএএ’তে আবেদন করলে নাম বাদ পড়বে না। এসআইআরের শুনানিতে নথিপত্র যা ছিল, সবই দিয়েছিলাম। নাম উঠল না। আমাদের আর কিছু করার নেই।’
কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার হাঁসখালি ব্লকের দক্ষিণপাড়া-২ পঞ্চায়েতের মতুয়া ও নমঃশূদ্র অধ্যুষিত হাজারিনগর গ্রামের ১৪১ নম্বর বুথে যোগেনবাবু উদাহরণ মাত্র। এই বুথে ১৬৪ জন ভোটার এবং চন্দনপুকুর গ্রামের ১৪০ নম্বর বুথে ৭০ জন ভোটারের নাম সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় নেই। এঁদের সিংভাগই নাগরিকত্বের আবেদনকারী। সবারই ভোট-ভবিষ্যৎ এখন অথৈ জলে। ক্ষোভে ফুঁসছেন মতুয়া সম্প্রদায়। গেরুয়াতে মোহভঙ্গ হচ্ছে তাঁদের। রাজনৈতিক মহলের দাবি, সিএএ আসলে বিজেপির গিমিক। যোগেনবাবুরা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভারতের নাগরিক হয়েও কেন বাদ? প্রশ্ন তুলছেন অনিতা হালদার, প্রীতি অধিকারী, সরেন পাল, গনেশচন্দ্র অধিকারীরা। প্রীতি বলছিলেন, ‘আমার আর আমার মায়ের নাম বাদ গিয়েছে। আমি ঠাকুমার ২০০২ সালের ভোটার লিস্ট, স্কুল সার্টিফিকেট, আধার কার্ড, জমির দলিল সহ বিভিন্ন নথি জমা করেছিলাম। আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। এজন্যই বিজেপিকে চাইছি না।’ ব্রজেন আধিকারী বলেন, ‘আমি মাঠে কাজ করি। শুনলাম নাম বাদ গিয়েছে। সিএএ’তে আবেদন করছিলাম। শুনানিও হয়েছে। বলা হয়েছিল আবেদন করলেই তালিকায় নাম থাকবে। এখন কি করব বুঝতে পারছি না।’
২০১৮ সাল। পঞ্চায়েত নির্বাচনে এইসব গ্রামে ঘাসফুল ফুটেছিল। ২০১৯ সাল থেকে বিজেপি নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজিমাত করে। কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভার হাঁসখালি ব্লকের হজারিনগর, চন্দনপুকুর, গোপালপুর, জয়নগর, প্রতাপনগর গ্রামের বাসিন্দারা পদ্মের উপর ঢালাও ভরসা রাখেন। দক্ষিণপাড়া-২ পঞ্চায়েতটি তৃণমূল দখল নিলেও বিজেপিও সমান শক্তিশালী। গত লোকসভা নির্বাচনেও সিএএ’র ফানুস উড়িয়ে এই পঞ্চায়েতে বিজেপি এক হাজার ভোটে লিড নেয়। তারপরও বিজেপি মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল না।
দক্ষিণপাড়া-২ পঞ্চায়েত প্রধান মৃত্তিকা বিশ্বাস বলেন, ‘নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের সঙ্গে আমরা দেখা করেছি। সর্বদা ওঁদের পাশে রয়েছি। বিজেপি এইভাবেই মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়।’ তৃণমূলের অঞ্চল সভাপতি করুণাকৃষ্ণ মজুমদার বলেন, ‘বিজেপির ভাঁওতাবাজি সামনে এসে গিয়েছে। সিএএ’র গাজর ঝুলিয়ে মতুয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে। নির্বাচনে বিজেপির এর জবাব পাবে। এঁরা যদি অবৈধ হয় তাহলে ২০২৪ সালের মতুয়া মানুষদের ভোটে জয়ী কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও অবৈধ।’ রানাঘাট লোকসভার বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকার বলেন, ‘নাগরিকত্বের জন্য বিজেপি লড়াই করছে। সাময়িকভাবে যদি করার নাম বাদ পড়ে, তাহলে আমরা অবশ্যই বিষয়টি দেখব। আইনি লাড়াই লড়ব।’