


তিন দিন পরপর ছুটি। এ সুযোগ কি ছাড়া যায়? ছোটখাট একটা ট্রিপ তো করতেই হবে এই সুযোগে। ঠিক হল ঝাড়গ্রাম যাব। শাল-পিয়ালের জঙ্গলে প্রকৃতির মাঝে কত কিছুই দেখার আছে, যা সবার চোখে পড়ে না। এসব অনুভবের।
লম্বা যাত্রাপথের সুখ উপভোগ করতে করতে ক্রমে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে। শালবনি, জামবনি পেরিয়ে পৌঁছলাম ঝাড়গ্রাম। সন্ধের অন্ধকারে কোথাও আর যাওয়ার নেই তাই সেদিনের মতো পরিপূর্ণ বিশ্রাম।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়লাম বেলপাহাড়ির উদ্দেশে। হোটেল থেকে বলে দিয়েছিল যাওয়ার সময় ‘কাঁচালঙ্কা’ রেস্তরাঁয় লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে যেতে। কিন্তু আমরা রেস্তরাঁ খুঁজে পাইনি। চললাম প্রথম সাইট সিয়িং, ঢাঙ্গিকুসুম ঝরনার উদ্দেশে। কিছুদূর এগিয়ে বাঁ হাতে পড়ল ঢাঙ্গিকুসুম যাওয়ার রাস্তা। এই ঝরনাটিকে স্থানীয় মানুষ হুদহুদি ঝরনা বলে। তারপর গেলাম ঘাগরা ফলস দেখতে। পাথরের উপর দিয়ে হেঁটে যেতে হল বেশ খানিকটা। যেখান দিয়ে ফলসের জল নীচে নেমে আসছে সেদিকটা দড়ি দিয়ে আটকানো, যাতে পর্যটকরা তার বাইরে না যান। তবু একটু ঝুঁকি নিয়েই আমরা দড়ির সীমান্ত পর্যন্ত এগলাম। সে এক
অপূর্ব দৃশ্য!
ওখান থেকে বেরিয়ে খাঁদারানি লেক যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু আঞ্চলিক লোকজন বললেন সেখানে তেমন কিছু নেই দেখার মতো। তাই আর গেলাম না। ঘাগরা ফলস দেখে আমরা গেলাম তারাফেনি ব্যারেজে দেখতে। ফেরার সময় চোখে পড়ল ‘কাঁচালঙ্কা’ রেস্তরাঁ। খিদেও পেয়েছিল খুব। ভাবলাম অর্ডার দিলে কতক্ষণ আর সময় লাগবে খাবার দিতে! কিন্তু না, প্রচুর ভিড়। তার মধ্যে আমাদের খাবার দেওয়া ওদের পক্ষে অসম্ভব। তাই খুব সাধারণ একটি পথচলতি রেস্তরাঁয় লাঞ্চ সারতে হল।
এবারই হল বিপত্তি। গাড়ি আর স্টার্ট নেয় না কিছুতেই। আমাদের ঘোরা তখনও অর্ধেক বাকি। এদিকে রোদ পড়ে যাচ্ছে। স্থানীয় একজন টোটো করে আমার ড্রাইভারকে কাছাকাছি এক গ্যারেজে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পর এলেন মেকানিক। দেখে বললেন, গাড়ির ব্যাটারি বদল করতে হবে। নতুন ব্যাটারি কিনে, আবার রওনা দিলাম পরের গন্তব্যের দিকে। কিন্তু বেলা গড়িয়ে যাওয়ায় কাঁকড়াঝোড় যাওয়া অসম্ভব। অগত্যা কাছেই গাডরাসিনি পাহাড় দেখতে গেলাম। দু’পাশে জঙ্গল, অন্ধকার রাস্তা। পৌঁছলাম যখন একে অন্ধকার, তায় অল্প বৃষ্টি পড়ছে। পাহাড়ের ঠিক নীচে রয়েছে আশ্রম। অল্প এগিয়ে পাহাড়ে ওঠার রাস্তা। উপর থেকে পুরো বেলপাহাড়ির সবুজ সৌন্দর্য প্রত্যক্ষ করা যায়। রাতের অন্ধকারে তার কিছুই দেখা যাবে না। আশ্রমের সন্ন্যাসীরা বললেন, বন্য জন্তুর কবলে পড়াও এ সময় বিচিত্র নয়। অতএব ফিরে চলো হোটেলে। অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে। বৃষ্টিও পড়ছে অবিরাম। ফাঁকা রাস্তা, দু’ধারে শালের জঙ্গলে পাতার খসখস শব্দ। গহিন অন্ধকারে গাড়ি তার চোখ দুটো জ্বেলে বৃষ্টির মধ্যে আমাদের নিয়ে চলল ফিরতি পথে।
পরদিন স্নান সেরে ব্রেকফাস্ট করে বেরতে একটু বেলাই হল। প্রথমে গেলাম ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি। রাজবাড়ির একটা অংশে অতিথিনিবাস। রাজবাড়ির মন্দিরে গেলাম। পাশে দাঁড় করানো রয়েছে রাজার রথ। মন্দির চত্বরে রয়েছে পালকি। তার দু’পাশে রাখা রয়েছে মুগুর।
সেখান থেকে বেরিয়ে চললাম কনকদুর্গা মন্দির। গুগল ম্যাপে দেখাল ১২ কিলোমিটার, কিন্তু কোথায়? ডুলুং নদীর ব্রিজ পেরিয়ে রাজবাড়ি বাঁ হাতে রেখে চলেছি তো চলেইছি। ম্যাপে কিলোমিটার বাড়ছে, সমানে ইউ টার্ন নিতে বলছে। ১৮ কিলোমিটার, ২৩ কিমি পার হলে আমরা থামলাম। পথচলতি মানুষের সাহায্যে ডুলুং নদী পেরিয়ে খানিকটা এগতেই বাঁ হাতে লালমাটির রাস্তা। ভাবতেই পারিনি ওই রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাবে। অল্প একটু ঢুকেই পেলাম কনক অরণ্যের গেট। তা পেরিয়ে গাড়ি পার্ক করে হেঁটে যেতে হবে মন্দির চত্বরে। দু’পাশে জঙ্গল। লোকালয় বর্জিত এই মন্দিরের চারপাশে ৩৬৫ প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্ম। সেই জঙ্গলের মধ্যে কৃত্রিম বন্যপ্রাণীর মূর্তি বসানো আছে। হঠাৎ চোখ পড়লে চমকে যেতে হয়। শতাব্দী-প্রাচীন কনকদুর্গা মন্দির। অনেক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে তাকে ঘিরে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, চারদিকে গভীর জঙ্গলের মধ্যে সামন্ত রাজাদের এই মন্দিরে আজও অষ্টমীর রাতে নিজেই ভোগ রান্না করেন দেবী। বিগ্রহ এখানে অশ্বারোহিণী চতুর্ভূজা। আগে নরবলি হত। বর্তমানে পুজোর নবমীতে মোষবলি হয়। দেবীর মূর্তিটি অষ্টধাতুর। প্রাচীন রীতিতে ব্যতিক্রমী, আড়ম্বরহীন পুজো। বহু ইতিহাস মন্দিরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, চিল্কিগড়ের রাজাকে দেবী স্বপ্ন দিয়েছিলেন, রানির হাতের কঙ্কন দিয়ে তাঁর মূর্তি গড়ার জন্য। সেই কারণেই নাম ‘কনকদুর্গা’। সেইমতো তৈরি হয় সোনার দুর্গা মূর্তি। মূর্তিটি মাঝে চুরি হয়ে গিয়েছিল। প্রায় তিন দশক মূর্তি ছাড়াই এখানে পুজো হয়। পরে রাজ পরিবারের তরফে বর্তমানের অষ্টধাতুর মূতিটি তৈরি করে দেওয়া হয়। পাশে রয়েছে প্রাচীন রাধাগোবিন্দ মন্দির। সেটির উপর বাজ পড়ে মাঝ বরাবর ফাটল ধরে গিয়েছে। সেখানে আর পুজো হয় না।
ডুলুং নদী পেরিয়ে চিল্কিগড় রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখতে চললাম। মেদিনীপুর জেলার ছোট্ট রাজ্য জামবনির রাজধানী ছিল চিল্কিগড়। মূল তোরণে বিশাল একটি অশ্বত্থ গাছ আছে। তার পাশেই রয়েছে উঁচু শিবালয়। তা পেরিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে কাছারিবাড়ি ও খানিক দূরে মূল রাজবাড়ি। কাছারিবাড়ির পাশেই কর্মচারীদের থাকার জায়গা ও কালাচাঁদের মন্দির। মলিন চিল্কিগড়ের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। রাজবাড়ি সংলগ্ন ন’টি চূড়া বিশিষ্ট রাধাগোবিন্দর মন্দিরে আজও পুজো হয়। রাতের অন্ধকারে এই রাজবাড়ি প্রাঙ্গণ ভূতুড়ে মনে হবে। সেখান থেকে ফিরে জঙ্গলমহল জুলজিকাল পার্কে গেলাম। তারপর ফেরার পথ ধরলাম।
মানসী গঙ্গোপাধ্যায়