


বিশেষ নিবন্ধ, শুভজিৎ অধিকারী: সেই কবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ লিখেছিলেন, ‘ইতিহাসবিহীন জাতির দুঃখ অসীম। এমন দুই একজন হতভাগ্য আছে যে, পিতৃ-পিতামহের নাম জানে না। এবং এমন দুই-এক হতভাগ্য জাতি আছে যে কীর্ত্তিমন্ত পূর্বপুরুষগণের কীর্ত্তি অবগত নহে। সেই হতভাগ্য জাতিদিগের মধ্যে অগ্রগণ্য বাঙ্গালী।’
অতঃপর, বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি। অতীত-ঐতিহ্যকে ভুলে মেরে দেওয়া তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। আর বাঙালির এহেন দুর্বল হৃদয়-মন্দিরে অত্যন্ত সুকৌশলে সিঁদ কেটে চলেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির ধারক-বাহক একদল লোক। বেশ কয়েক বছর ধরে তারা এই কাজটা বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই করছে। প্রয়োজনে নানা উপকরণের জোগানদারও হয়ে উঠছে। ইদানীং গ্রামবাংলায় একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, যে ছেলেরা গ্রামের শীতলাপুজো, জঙ্গলমহলের টুসু উৎসব, কিংবা ধর্মমত নির্বিশেষে মহোৎসব অনুষ্ঠানে একশো টাকা চাঁদা চাইলে মুখ ঘুরিয়ে অন্যপথে হাঁটা দেয়, তারাই আবার সশস্ত্র শোভাযাত্রা কিংবা কলস যাত্রায় সানন্দে হাজার টাকা ঢালছে। পাড়ায় হনুমানজি’র মন্দির গড়তে কেউ সিমেন্ট দিচ্ছে, কেউ বালি। সেই মন্দিরে তিন চারদিনের জমকালো অনুষ্ঠান হচ্ছে। শব্দদানব ডিজে বাজছে। গ্রামজুড়ে হরেক লাইটিং। নিশিরাতে ব্যালে হাঙ্গামা (বিশেষ এক ধরনের নৃত্যানুষ্ঠান)-এর আসর বসছে। সঙ্গে দেদার খানাপিনা। অথচ, ভেঙে পড়া গ্রামের প্রাচীন শীতলা মন্দির, ওলাইচণ্ডীর মন্দির, কালীমন্দির, হরিমন্দির অথবা জরাজীর্ণ চণ্ডীমণ্ডপটির দিকে নজর নেই অনেকের! প্রশ্ন হল, যাঁদের পকেটে একশো টাকা থাকে না, তাঁরা একটি ভিন্ন সংস্কৃতিকে জাগিয়ে ও চাগিয়ে তুলতে প্রচুর উপকরণ পাচ্ছেন কোথা থেকে?
আসলে, ওই যে বললাম ওরা চায়, যেভাবেই হোক বাঙালির আত্মগরিমাকে ভুলিয়ে তার জাতিসত্তাকে
ধ্বংস করতে। আমরা বুঝে হোক, না বুঝে হোক, ওদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছি। ওদের উদ্দেশ্য বেশ স্পষ্ট, বাঙালি
জাতি যেন আর বিশ্ব দরবারে তাদের মাথাটি অহঙ্কারের সঙ্গে উঁচু রাখতে না পারে।
বাংলার ‘নববর্ষ’ সেই অহঙ্কারেরই একটা সুপ্রাচীন স্বর্ণমুকুট। বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্প্রীতির লোকউৎসব। আবহমানকাল ধরে সর্বজনীন রূপ নিয়ে বাংলায় চলে আসছে। আমাদের এই নববর্ষের মধ্যেই জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয়, জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির বিকাশ। নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালি ঋদ্ধ করেছে তার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে। ফলে, বাংলা বর্ষবরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নির্ভর কোনো লোকাচার নয়। বরং দিনটি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদের ভাবমূর্তিকে বাঁচিয়ে রাখার জিয়নকাঠি। একইসঙ্গে বাঙালিকে নিয়ে যায় তার শেকড়ের সন্ধানে।
সেই শেকড় সন্ধান করতে গেলে উঠে আসে বাঙালি জাতির সম্প্রীতি-সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের কথা। যাকে কেন্দ্র করেই মূলত গাত্রদাহ বাংলায় ভিন্ন সংস্কৃতিকে আমদানিকারীদের। তা না হলে এই বাংলার ভোট-বাজারে নেমে কোনো এক রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী বলতে পারেন, এখানে উত্তরপ্রদেশের মতো পরিবেশ তৈরি করা হবে। প্রমাণ স্বরূপ বুলডোজার নিয়ে দলীয় প্রার্থীর মনোনয়ন! এবার তা হলে দেখা যাক, ওদের গাত্রদাহের কারণটা ঠিক কোথায়?
সৌরপঞ্জিকা মতে বাংলা ক্যালেন্ডারও ১২ মাসের। এটা বহুকাল আগে থেকেই চলে আসছে। ওই সৌরপঞ্জিকা শুরু হতো জুলিয়ান পঞ্জিকার (পরে গ্রেগরীয়) এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি থেকে। বৈদিক যুগে যাকে বলা হতো ‘পঞ্চাঙ্গ’ বা চান্দ্র-নাক্ষত্রিক ক্যালেন্ডার। তখনও পহেলা বা পয়লা বৈশাখ পালিত হতো ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে। সেই উৎসবের মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। আমাদের প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেও বৈশাখের প্রথম দিনে কী কী করণীয়, তা সবিস্তারে বলা হয়েছে। প্রথমে কৃষিকাজে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে গোয়ালঘরে দুধ উথলাতে হবে। তারপর গোরুর কপালে, শিঙে, ঘরের দরজাতে, ধানের গোলাতে, লাঙলে, মইয়ে এবং বীজপাত্রে তেল-সিঁদুর লাগিয়ে মাঠে যেতে হবে। সেখানে জলভরা ঘটে আম্রপল্লব দিয়ে এককোণে স্থাপন করতে হবে। ঘটের নীচে দিতে হবে আতপচাল ও ভিজে ছোলা। তারপর ফুল-বেলপাতা দিয়ে পুজো। পুরোহিত দিয়ে সেই পুজো করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পুজো শেষ হলে জমিতে বীজ ফেলে বাড়ির পথ ধরতে হবে কৃষককে। এরপর ফসলের উৎপাদন। এবং তার ভিত্তিতে জমিদারদের খাজনা প্রদানের পালা।
মুঘল সম্রাটরা জমিদারদের কাছ থেকে ইসলামীয় হিজরি পঞ্জিকা মেনে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করতেন। হিজরি সন মূলত নির্ধারিত চাঁদের অবস্থানের ওপর। ফলে, ওই সন কৃষি ফসলের উৎপাদনের সঙ্গে খাপ খেত না। কৃষকদের অসময়ে খাজনা প্রদান করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হত। তখন দিল্লির মসনদে সম্রাট আকবর। তিনি সমস্যার সমাধানে বর্ষপঞ্জির আমূল সংস্কারের আদেশ দিলেন। কাজের দায়িত্ব পড়ল বাংলার তৎকালীন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ-উল্লাহ সিরাজীকে। তিনি সৌর সন, পঞ্চাঙ্গ ও হিজরি সনের মেলবন্ধন ঘটিয়ে একটি নতুন সন বা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন করেন। প্রথমে সেই সনের নামকরণ করা হয়েছিল ‘সন-ই-ইলাহি’। অনেক ঐতিহাসিক ‘ফসলি সন’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। কালের বিবর্তন ধারায় সেটাই এখন বাংলা সন বা ‘বঙ্গাব্দ’। এই সন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচলিত হয় ১৫৫৬ সালে। ওই বছরই আকবর সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন। সেই থেকে চৈত্রের শেষ দিনে কৃষকদের সব খাজনা পরিশোধ করতে হত। পরের দিন পয়লা বৈশাখ। ভূস্বামীরা তাঁদের নিজেদের এলাকার কৃষকদের মিষ্টি মুখ করাতেন। বাড়িতে নানা উৎসবের আয়োজন করতেন। বাংলায় এই দিনটিকে ‘পুণ্যাহ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ। সেটাই কালক্রমে বাংলার সর্বজনীন সামাজিক লোক-উৎসবে পরিণত হয়। বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনের অন্তর্নিহিত চেতনায় হিন্দু-মুসলিম কোনো প্রভেদ নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ, বাংলা নববর্ষের সৃষ্টিতেই সৌর সন ও হিজরি সনকে একত্রিত করে সম্প্রীতির সুরটা বেঁধে দিয়েছিলেন সম্রাট আকবর।
সেই সুরের ছন্দে দীর্ঘকাল ধরে বাংলা নববর্ষ আম বাঙালির কাছে বারো মাসের তেরো পার্বণের একটি ও অন্যতম বলে প্রতিষ্ঠিত। ধর্মমত নির্বিশেষে সবাই দিনটি উদযাপন করে। প্রধান অনুষঙ্গ অবশ্যই চৈত্র সংক্রান্তির মেলা ও বৈশাখী মেলা। বাংলার বিভিন্ন এলাকায় এইসব মেলা বসত। কদমা, বাতাসা, খই, মুড়কি, নাড়ু ইত্যাদি বিক্রি হত। হাতপাখা, খেলনা হাতি, খেলনা ঘোড়া, একতারা, ডুগডুগি, ঢোল সহ বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রীর পসার সাজিয়ে বসতেন শিল্পীরা। বিনোদনের অঙ্গ হিসেবে থাকত বৌ-নাচুনি, ঘোড়া নাচ, পুতুল নাচ, চরকা ঘুরানো প্রভৃতি। কোথাও কোথাও রাতভর হরিনাম সংকীর্তন, চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল, শীতলামঙ্গলের কাব্য মঞ্চস্থ করতেন কলাকুশলীরা। গাজনের গীত পরিবেশিত হতো গ্রামে গ্রামে। বহুরূপী শিল্পী, পটশিল্পীরা ঘুরে ঘুরে শিশুদের বিনোদন জোগাতেন। পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে যাত্রাপালাও হতো স্থানে স্থানে। নতুন জামা-কাপড় পড়ে ওইসব মেলায় যাওয়ার আনন্দটাই ছিল বাঙালির বেঁচে থাকার শ্বাস-প্রশ্বাস। সে সব এখন ভিন্ন সংস্কৃতির আগ্রাসনে বাঙালির জীবন থেকে ক্রমেই হারাতে বসেছে। একমাত্র হালখাতার অনুষ্ঠান নববর্ষের মূল অনুসঙ্গ উৎসব হয়ে থেকে গিয়েছে।
নববর্ষের এইসব গ্রামীণ উৎসব-সংস্কৃতির সঙ্গে শহুরে লোক-কালচারের একটা ফারাক ছিল। সেই ফারাক অবশ্যই আভিজাত্যের আঙ্গিকে মোড়া। তবে, উৎসবের মূল দর্শনের সঙ্গে গ্রাম-শহরের কোনো পার্থক্য ছিল না। সেই দর্শন হল, মূখ্যত অসাম্প্রদায়িক বাঙালির মহামিলন যজ্ঞ।
বাঙালির আভিজাত্যের নিরিখে রুচি-সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা হয় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িকে। প্রতিবছরই নানা বৈচিত্রে নতুন বছরকে স্বাগত জানাতেন ঠাকুর পরিবারের সদস্যরা। দু’টি পর্যায়ে হতো নববর্ষ উদযাপন। একটি পর্যায় ছিল বাড়ির অন্দরমহলে। অন্যটি বাড়ির বাইরে বাগানবাড়িতে। লেখক, কবি, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ সহ সমাজের বিদগ্ধজনেরা আমন্ত্রিত হতেন ঠাকুরবাড়িতে। তালিকায় থাকতেন সাহেব-মেমরাও। মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করা সরলাদেবী তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘সেদিন (পয়লা বৈশাখ) অতিভোরে ব্রাহ্মমুহূর্তে দেউড়িতে ঘণ্টা বেজে উঠত। ঘুমিয়ে থাকলেও জেগে উঠে বাড়িশুদ্ধ পুরুষরা নবশুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে প্রস্তুত হয়ে, উঠোনে উপাসনা সভায় সমবেত হতেন। আর মেয়েরা খড়খড়িতে। উপাসনাদি হয়ে গেলে বয়সের তারতম্যনুসারে আলিঙ্গনাদি সেরে মেয়ে মহলেও সরবত পান হত। সেদিন সকলের একত্রে ভোজন হতো মধ্যাহ্নে।’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ প্রফুল্লময়ী তাঁর ‘আত্মকথা’য় বলেছেন, ‘নববর্ষ উৎসবের সময় আমাদিগকে নানারকম গহনা পরিয়া সাজিতে হইত।’
ঠাকুরপরিবারেও পালিত হতো পুণ্যাহ উৎসব। রবীন্দ্রনাথ এক নববর্ষ সম্পর্কে লিখছেন, ‘সেদিন যাকে বলে জমিদারি সেরেস্তার পুণ্যাহ। খাজনা আদায়ের প্রথম দিন। কাজটা নিতান্তই বিষয়-কাজ। কিন্তু, জমিদারি মহলে সেটা হয়ে উঠেছে পার্বণ। সবাই খুশি। যে খাজনা দেয় সেও, আর যে খাজনা বাক্সেতে ভর্তি করে সেও। এর মধ্যে হিসেব মিলিয়ে দেখবার গন্ধ ছিল না। যে যা দিতে পারে, তাই দেয়।’
কবিগুরুর জীবনের শেষ নববর্ষ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে। অর্থাৎ আশিতম জন্মদিনও পালিত হয়েছিল পয়লা বৈশাখের দিন। অসুস্থ কবি হুইল চেয়ারে বসেছিলেন উদয়ন গৃহে। তাঁর সামনেই ‘সভ্যতার সংকট’ পাঠ করেছিলেন ক্ষিতিমোহন সেন—‘ঐ মহামানব আসে।’
ওপার বাংলাতে ধর্মীয় উন্মত্ততার কারণে বাঙালির নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এখন গভীর সঙ্কটে। আমাদের এই বাংলাতেও ভিন্ন সংস্কৃতির ধারকরা সন্দর্পণে গ্রাস করে চলেছে বাংলা-বাঙালির অস্মিতাকে। সত্যিই আজ ‘হতভাগ্য’ বাঙালি জাতির অভ্যুত্থানে এক ‘মহামানব’-এর বড্ড প্রয়োজন।