


পরামর্শে পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী এবং মৎস্যবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ অধিকর্তা (ফার্মস) ডঃ কেশব চন্দ্র ধারা।
ভাইরাসের পরিচয়
নিপা একটি আরএনএ ভাইরাস। দ্রুত রূপ পরিবর্তন করতে সক্ষম। মানুষের দেহে প্রবেশের পর মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফেলাইটিস) ও শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করে।
আতঙ্কের শুরু
নিপা প্রথম শনাক্ত হয়
১৯৯৮–১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ার নিপা গ্রামে। সেই সময়ে শুয়োর প্রতিপালনের খামারে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে অজানা এনসেফালাইটিস দেখা যায়। গবেষণায় জানা যায়, ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের বাহক।
অন্যান্য দেশে প্রাদুর্ভাব—
বাংলাদেশ (প্রায় প্রতিবছর বিচ্ছিন্নভাবে)
ভারত (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ ও কেরল)
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর
নিপার প্রাকৃতিক বাহক
নিপা জুনোটিক ভাইরাস। বাদুড়ের লালা, মূত্র ও মলের মাধ্যমে পরিবেশ দূষিত হয় ও ভাইরাস ছড়ায়।
মানবদেহে সংক্রমণের পথ
প্রাণী থেকে মানবদেহে:
বাদুড় দ্বারা আংশিক খাওয়া ফল খেলে।
বাদুড়ের লালা বা মূত্র দ্বারা দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান করলে।
সংক্রামিত শুয়োরের সংস্পর্শে এলে।
মানুষ থেকে মানুষে:
রোগীর লালা, কাশি, শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বেরনো কফ, সর্দি ও এরোসলে থাকে ভাইরাস। ওই এরোসল সুস্থ ব্যক্তির হাতে লাগলে ও নাক বা মুখে সেই হাত দিলে, ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে শরীরে।
এছাড়া পরিচর্যাকারী কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই রোগীর কাছে গেলে শ্বাস প্রশ্বাসের সঙ্গে এরোসল নাসিকাপথে শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ক্ষমতার কারণে নিপা ভাইরাস অত্যন্ত বিপজ্জনক।
উপসর্গ
প্রবল জ্বর তীব্র মাথাব্যথা গলা ব্যথা ও কাশি বমি ও শরীর ব্যথা অতিরিক্ত দুর্বলতা
গুরুতর লক্ষণ
শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া
মানসিক বিভ্রান্তি ও অস্বাভাবিক আচরণ
খিঁচুনি
মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফেলাইটিস)
কোমা
সতর্কতা
নিপা ভাইরাসে মৃত্যুহার
সাধারণত ৪০ থেকে ৭৫
শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যারা বেঁচে যায়, তাদের অনেকের মধ্যেই দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা যেমন স্মৃতিশক্তি হ্রাস, স্নায়বিক দুর্বলতা, মনসিক ও আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। পুনরায় এনসেফালাইটিসের ঝুঁকিও থাকে।
রোগ নির্ণয
নিপা ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য বিশেষ ধরনের ল্যাবরেটরি প্রয়োজন। রোগ নির্ণায়ক পরীক্ষাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
আরটি-পিসিআর পরীক্ষা।
এলাইজা।
রক্ত, লালা, মূত্র বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা।
উচ্চ ঝুঁকির কারণে এসব পরীক্ষা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট সরকারি বা অনুমোদিত ল্যাবে করা হয়।
চিকিৎসা
নিপা ভাইরাসের কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত টিকা নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক—
রোগীকে আইসিইউতে রাখার দরকার হতে পারে।
লাগতে পারে শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা।
প্রয়োজন জ্বর ও খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ
সেকেন্ডারি সংক্রমণ প্রতিরোধও অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
কিছু ক্ষেত্রে গবেষণামূলকভাবে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হলেও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়।
রোগ প্রতিরোধ করবেন কীভাবে
মাটিতে পড়ে থাকা ও গাছে থাকা আধ খাওয়া ফল না খাওয়া উচিত।
খেজুরের কাঁচা রস পান করবেন না।
খেতে বসার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে গেলে আগে মাস্ক ব্যবহার করুন। রোগীর পরিচর্যাকারী না হলে, রোগীকে দেখতে যাওয়ার সময় দূরত্ব বজায় রাখুন।
উপসংহার
নিপা ভাইরাস প্রকৃতিতে মারাত্মক হলেও প্রতিরোধযোগ্য। তবে কোনও টিকা নেই। তাই সচেতনতা, দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।