


নিজস্ব প্রতিনিধি, বরানগর: বুচু নেই! এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না বৃদ্ধা মা। বারবার প্রশ্ন করছেন, ‘বুচু কখন ফিরবে? আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে বলেছিল। কেন এত দেরি করছে!’ বৃদ্ধা গায়ত্রীদেবীর প্রশ্নে বাকরুদ্ধ অমল বন্দ্যোপাধ্যায়। একমাত্র পুত্রের দেহ নিয়ে দিনভর আর জি করে দৌড়ে বেড়িয়েছেন। স্বাস্থ্যদপ্তর ও পুলিশের চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন, ‘আমার সুস্থ ছেলেটাকে খুন করে দেওয়া হয়েছে।’ সেই বৃদ্ধও বাড়ি ফিরে কার্যত বাক্যহারা, নিশ্চুপ। মৃতের স্ত্রী শোকে পাথর। একমাত্র পুত্রকে আঁকড়ে ধরে চোখের জলে ভাসছেন। অসহায় ভাবে বলছেন, ‘একরত্তি ছেলে, শ্বশুর ও শাশুড়িকে নিয়ে কীভাবে বাঁচব?’
দক্ষিণ দমদম পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের কালিন্দী ১২২, এসএইচকেবি সরণির বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। দক্ষিণ দমদম পুরসভার অস্থায়ী কর্মী ছিলেন। স্ত্রী সোনালি বন্দ্যোপাধ্যায় একজন আশা কর্মী। বৃহস্পতিবার ছিল অরূপবাবুর জন্মদিন। ওই রাতে বাড়িতে খেলার সময় অরূপবাবুর চার বছরের ছেলে বিছানা থেকে পড়ে হাত ভাঙে। বন্ধুদের আনা কেক ফেলে ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে আর জি করে দৌড়েছিলেন অরূপবাবু। কিন্তু ভোররাতে সেখানে লিফট দুর্ঘটনায় তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
ঘটনার আকস্মিকতায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে অরূপবাবুর সাজানো সংসার। শোকে মুহ্যমান এলাকাবাসী। ছেলেকে চিকিৎসা করাতে নিয়ে গিয়ে হাসপাতাল থেকে বাবার মৃতদেহ ফেরার ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছেন সকলেই। বলছেন, গাফিলতিতে যুক্ত প্রত্যেকের কঠোর শাস্তি চাই। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের সহযোগিতায় শুক্রবার সন্ধ্যায় আর জি কর হাসপাতাল থেকে ছেলেকে নিয়ে সরাসরি সাতগাছির নার্সিংহোমে গিয়েছিলেন সোনালিদেবী। শনিবার ওই নার্সিংহোম থেকে ছেলের চিকিৎসার জন্য বাইপাসের এক নার্সিংহোমে যান। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত সোনালিদেবী বলেন, ‘ওর জন্মদিনে আমার জীবনের সব আলো কেড়ে নেওয়া হল। কী নিয়ে বাঁচব, বলতে পারেন? দু’ঘন্টা ধরে আটকে রইল। আমি বেসমেন্টে পড়ে আছি। ওর শরীরের রক্ত আমার শরীরে এসে পড়েছে। সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে লোক ডাকছি। যতক্ষণে ওরা এল, তখন সবশেষ। আমার এই ছোট্ট ছেলে, শ্বশুর, শাশুড়িকে নিয়ে কীভাবে জীবনযুদ্ধের লড়াই চালাব? আমার অস্থায়ী কাজ। স্থায়ী কাজ খুব প্রয়োজন।’
দক্ষিণ দমদম পুরসভার সিআইসি সঞ্জয় দাস বলেন, ‘অরূপ তো আমাদের পরিবারের সদস্য। বাড়ির ভাই। কিছু মানুষের ক্ষমাহীন গাফিলতির শিকার হতে হয়েছে ওঁকে। আমরা শোকগ্রস্ত পরিবারের পাশে রয়েছি। এখন নির্বাচনি বিধি কার্যকর রয়েছে। নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর ওঁর পরিবারের জন্য যা করা প্রয়োজন, তা-ই করা হবে।’