


সন্দীপ স্বর্ণকার, নয়াদিল্লি: দেশের অতি গরিব রেশন গ্রাহকের মুখের গ্রাসও কি এবার কেড়ে নেবে নরেন্দ্র মোদি সরকার? তুলেই দেওয়া হবে অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা? এই প্রশ্ন উঠছে। কারণ, ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন’ সংশোধনের উদ্যোগ। উল্লিখিত আইনের তিন নম্বর ধারা সংশোধনে সংসদে বিল আনছে সরকার। লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জেরে তা একপ্রকার অনায়াসেই ভোটাভুটিতে পাশ হয়ে যাবে। ফলে কমে যাবে দেশের প্রান্তিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল নাগরিকদের রেশনের চাল-গমের বরাদ্দ।
মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্বের জ্বালা থেকে মুক্তির কোনো দিশা গত কয়েক বছরে দেখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রিজার্ভ ব্যাংকও। বিশেষত খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার আকাশছোঁয়া। এই পরিস্থিতিতে রেশনের মাধ্যমে খাদ্যের অধিকারই প্রান্তিক মানুষের একমাত্র সহায়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আনা খাদ্য সুরক্ষা আইনের ভিত্তিতে গণবণ্টন ব্যবস্থায় রেশন দোকানের মাধ্যমে দুই শ্রেণির নাগরিক বিনামূল্যের খাদ্যশস্য পেয়ে থাকেন। প্রায়োরিটি হাউসহোল্ড (পিএইচএইচ) এবং অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা (এএওয়াই)। প্রথম ক্ষেত্রে চাল-গম মেলে ‘ব্যক্তি’ পিছু। মাসে পাঁচ কেজি। অন্ত্যোদয়ে ‘পরিবার’ পিছু মাসে ৩৫ কেজি। তা সে পরিবারে যত সদস্যই থাকুন না কেন। আইন সংশোধন করে এবার এই পরিবার পিছু ৩৫ কেজি চাল-গম দেওয়ার ব্যবস্থাটাই বন্ধ করতে চলেছে মোদি সরকার। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মাসে দেওয়া হবে মাত্র ৭ কেজি। ব্যক্তি পিছু। অর্থাৎ, কোনো পরিবারে যদি চারজন সদস্য থাকেন, তাদের প্রাপ্ত চাল-গমের পরিমাণ একধাক্কায় ৭ কেজি কমে যাবে। আর তিনজন থাকলে রেশন কমবে ১৪ কেজি। আবার এমন নয় যে, কোনো পরিবারে যদি সাতজন সদস্য থাকেন, তাহলে তারা ৪৯ কেজি চাল-গম পাবেন! তাঁদের ক্ষেত্রে কিন্তু সীমা বেঁধে দেওয়া হবে সেই ৩৫ কেজিতেই। অর্থাৎ তখন ব্যক্তি পিছু হিসাবে বরাদ্দ বাড়াবে না সরকার। সেই মতোই আনা হচ্ছে ‘জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা (সংশোধনী) বিল ২০২৬’। মোদি সরকারের যুক্তি হল, পিএইচএইচে যদি একজনের জন্য পাঁচ কেজি বরাদ্দ হয়, তাহলে অন্ত্যোদয়ে নয় কেন?
মন্ত্রকের ‘গোপন নোটে’র ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ‘বর্তমান’-এ মোদি সরকারের এই ‘উদ্যোগে’র খবর প্রকাশ হয়েছিল। খাদ্যমন্ত্রক এখন সরকারিভাবে এই আইন সংশোধনের কথা জানিয়ে সাধারণ মানুষের মতামত চেয়েছে। তা নিয়ে সরকারের বিরোধিতা করছেন ‘অল ইন্ডিয়া ফেয়ার প্রাইস শপ ডিলার্স ফেডারেশনে’র সাধারণ সম্পাদক বিশ্বম্ভর বসু। বলেছেন, ‘এটি জনবিরোধী, গরিব বিরোধী। এতে কেন্দ্রের খাদ্যশস্য বিতরণ করে রেশন দোকানদাররাও যে কমিশন পায়, তা কমে যাবে। উপার্জনে আঘাত আসবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি লিখব।’
সরকারের যুক্তি হল, অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনায় পরিবারে গড়ে সাতজন সদস্য—এমনটা ধরে নিয়েই মাসে ৫ কেজি হিসাবে রেশন দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকৃত এএওয়াই পরিবার কত রয়েছে? সমীক্ষা চালিয়েছিল কেন্দ্র। সেখানে দেখা গিয়েছে, গোটা দেশে এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা ২ কোটি ২৮ লক্ষ ৫৭ হাজার ৮১৪। কিন্তু এর মধ্যে ‘সাতজন’ রয়েছে এমন পরিবারের সংখ্যা ৬ লক্ষ ২১ হাজার ১৪৯। ফলে সরকারের ভাঁড়ার থেকে প্রত্যেক মাসে বেরিয়ে যাচ্ছে অতিরিক্ত ২ লক্ষ ৮৩ হাজার ১২৩ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। তাই ব্যক্তি পিছু ব্যবস্থা হলে অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা থেকেই বছরে সরকারের সাশ্রয় হবে ১৩ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা। তাই গত ১০ মাস ধরে গোপন নোট চালাচালি থেকে সংসদে সংশোধনী বিল এনে অতি গরিবের বরাদ্দ কাটছাঁট করতে চলেছে কেন্দ্র।