


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: রাজপথের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন যে নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের মূল হাতিয়ার হতে পারে, তা সাম্প্রতিক ককরোচদের প্রতিবাদেই প্রমাণিত হয়েছে। আর সেই প্রতিবাদের আঁচ এবার পড়ল সিউড়িতেও। শহরের বুকে গজিয়ে ওঠা বেসরকারি নার্সিংহোমগুলির বেনিয়ম এবং চিকিৎসায় চরম গাফিলতির বিরুদ্ধে এবার ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন মৃত কিশোরের সহপাঠী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, পরিবার-পরিজন এবং শহরের সাধারণ মানুষ। অবরুদ্ধ হয়েছিল রাজপথ। সেই তীব্র আন্দোলনের চাপের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো জেলা স্বাস্থ্যদপ্তর। তড়িঘড়ি নির্দেশ জারি করে বন্ধ করে দেওয়া হল অভিযুক্ত প্রাইভেট হাসপাতালের সমস্ত স্বাস্থ্য পরিষেবা।
ঘটনার সূত্রপাত গত রবিবার রাতে। সিউড়ি শহরের রুটিপাড়ার বাসিন্দা, জেলা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মৈনাক দাসকে হালকা বমি ও সামান্য শ্বাসকষ্টের উপসর্গ নিয়ে আবদারপুরের ১৪ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরিবারের অভিযোগ, কোনো অভিজ্ঞ রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসক ছাড়াই রাতে হাসপাতাল সামলাচ্ছিলেন একজন আরএমও। নার্সিংহোমে একটি ইনজেকশন দেওয়ার মাত্র ১০ সেকেন্ডের মধ্যে ছটফট করতে করতে বমি করে ঢলে পড়ে মৈনাক।
সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ থেকে ময়নাতদন্ত শেষে মৈনাকের দেহ সিউড়ির রুটিপাড়ার বাড়িতে পৌঁছাতেই কান্নার রোল ওঠে। এর পরপরই সুবিচারের দাবিতে ফুঁসে ওঠে শহর। মৃতের সহপাঠী, জেলা স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও স্থানীয় অধিবাসীরা হাতে মোমবাতি নিয়ে এক বিশাল মিছিল বের করেন। নিথর দেহ সামনে রেখে বেণীমাধব মোড়ে ব্যস্ত রাজপথ অবরুদ্ধ করে বসে পড়েন আন্দোলনকারীরা। 'মৈনাকের খুনিদের গ্রেপ্তার করতে হবে'— এই দাবিতে তোলপাড় হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
আন্দোলনের চাপে বাধ্য হয়ে গভীর রাতেই কড়া আইনি পদক্ষেপ নেয় বীরভূম জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক নির্দেশিকা জারি করে সংশ্লিষ্ট 'ডঃ সুবোধ সাহা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেড'-এর ওপিডি, ইনডোর, ভর্তি ও অপারেশনসহ সমস্ত ক্লিনিকাল পরিষেবা অবিলম্বে বন্ধের আদেশ দেন। কোনো তথ্যপ্রমাণ যাত ধ্বংস না করা হয়, তার জন্য প্রেসক্রিপশন ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, জেলার প্রতিটি বেসরকারি নার্সিংহোমকে সতর্ক করে কড়া নোটিশ জারি করা হয়েছে— রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তার ছাড়া আরএমও দিয়ে পরিষেবা চালানো কিংবা পরিকাঠামোগত গাফিলতি পাওয়া গেলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও প্রশাসনিক এই নির্দেশের পরও অনড় ছিলেন মৃতের পরিজনেরা। মৈনাকের দাদা সৌমেন দাস ও চন্দন দাস ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, 'ঝাঁ-চকচকে বিল্ডিং বানিয়ে ব্যবসা চলছে, অথচ রাতের বেলায় কোনো ডাক্তার নেই! ইনজেকশন পুশ করে ভাইটাকে মেরে ফেলা হলো। ওই চিকিৎসক ও আরএমও-কে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে হবে। তবেই অবরোধ উঠবে।' পরবর্তীতে রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছান রাজ্যের কৃষিমন্ত্রী দুধকুমার মণ্ডল। স্বাস্থ্য দপ্তর ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি ক্ষুব্ধ পরিবারকে বুঝিয়ে বলেন, 'অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। তবে পোস্টমর্টেম ও ডিস্ট্রিক্ট মেডিক্যাল টিমের তদন্ত রিপোর্ট হাতে পেলেই পুলিশ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করবে।' অবশেষে কৃষিমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট আশ্বাসে রাত সাড়ে দশটার পর পথ অবরোধ ওঠে এবং মৃত কিশোরের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।