


শহরের উপকণ্ঠে অক্সিটাউন। বেশ সাহেবি নাম। এলাকার মধ্যে কিন্তু বেশ একটা গ্রাম্য ব্যাপার। ছোট পিচের রাস্তার দু’পাশে হাঁটু সমান ঘাস। বিরাট বিরাট খোলা ড্রেন। দু’পাশের গাছের পাতা ঝুঁকে পড়েছে রাস্তার মাঝে। সেখানেই ‘পি ৭৩’ নম্বরের বাড়িটা। সবুজ লতা-পাতাই সেই বাড়ির রক্ষক। উঠোনে নোংরার স্তূপে সূর্যের আলো আঁচড় কাটে। তারই মধ্যে উঁকি দেয় শ্যাওলা পড়া রংচটা অর্ধগোলাকার বারান্দা। সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে একটা হিসহিসে শব্দ। শরীর শীতল হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে চামচিকে উড়ে যায় চোখের সামনে দিয়ে। ফিরে আসে স্মৃতি। ১৯৯৯ সালের ৯ জুনের।
বাড়িটার সামনে দিয়ে হাঁটা যাচ্ছিল না। তীব্র গন্ধে ঘুম উড়েছিল এলাকাবাসীর। গন্ধটা চেনা নয়। কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে। একবার নাকে এলে আর ভোলা যায় না। যেন জামায় লেগে থাকে। পুলিসে খবর দিয়েছিল এলাকার লোকজন। তারাই এসে খুলেছিল দরজা। দেখেছিল, ভিতরে পড়ে আছে চারটে দেহ। গলার নলি কাটা। বডিগুলো পড়ে আছে। জমাট বেঁধে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের মধ্যেই। সবার হাত বাঁধা। পচন ধরেছে শরীরে।
সোহিনীর সঙ্গে গৃহশিক্ষকের সম্পর্কটা বাড়ির কারও অজানা ছিল না। গৃহশিক্ষক মানে, লক্ষ্মীনারায়ণ চক্রবর্তী। বিবাহিত। বাড়ি, পাশেই। তারপরও সম্পর্ক? রহস্যটা কী? পাড়ার কেউ জানত না। ফিসফাস চলত সর্বত্র। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কারণ, ওই পরিবারের কোনও খবরই আসত না চার দেওয়ালের বাইরে। সবাই শুধু দেখত চারটে প্রাণীকে। সোহিনী, তার বোন ত্রিপর্ণা, মা মঞ্জুলিকা, আর বাবা বিদ্যুৎ পাল। নিজেদের মতোই থাকত গোটা পরিবার। গোখেল কলেজের বিএ ফাইনাল ইয়ার সোহিনীর। বোন ত্রিপর্ণা উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছিল। মা মঞ্জুলিকা সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের কর্মী। ভবানীপুর শাখা। বাবা বিদ্যুৎ পাল একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন। সেই চাকরিটা কোনও কারণে চলে গিয়েছিল। কেন? জানত না পাড়া-পড়শি। তারপর হঠাৎ এই ঘটনা।
তদন্ত শুরু করল পুলিস। পরিবারে আর কে আছে? কাদের কাদের যাতায়াত ছিল বাড়িতে? কোথাও কোনও বেআইনি কাজে এই পরিবার জড়িয়ে পড়েছিল কি? এই সব প্রশ্নই তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু উত্তর কোথায়? জেরা শুরু হল পাড়া-প্রতিবেশী, মঞ্জুলিকাদেবীর ব্যাঙ্কের সহকর্মী, বিদ্যুৎ পালের প্রায় সম্পর্ক না রাখা তিন ভাই এবং লক্ষ্মীনারায়ণ চক্রবর্তীর। সোহিনীর গৃহশিক্ষক। পার পেলেন না লক্ষ্মীনারায়ণের সত্তরোর্ধ্ব মা এবং সাত বছরের সন্তানও। দুটো বিষয় প্রথম দফায় জানতে পারল সিআইডি। ১) লক্ষ্মীনারায়ণ নামে ব্যক্তিটি সোহিনীর গৃহশিক্ষক। তাঁর সঙ্গে সোহিনীর একটা ‘সম্পর্ক’ গড়ে উঠেছিল। ২) বিদ্যুৎ পালের রহস্যজনক ব্যবসা। হঠাৎ হঠাৎ বাড়িতে বাক্স আসত। চট দিয়ে মোড়া। কী থাকত তাতে? কেউ জানে না। কিন্তু সবাই দেখত, ওই মাল আসার পরপরই বাড়ির আসত একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর। তিনজন থাকত সেই গাড়িতে। মালগুলো উঠে যেত তাতে। কালো ধোঁয়া উড়িয়ে উধাও হয়ে যেত সেটি। ব্যস, ওখানেই শেষ। কী থাকত বাক্সে? কোথায় ‘ডেলিভারি’ হতো? কত টাকার ডিল? কেউ কিচ্ছু জানত না। এই দু’টি সমীকরণেই থমকে গেল সিআইডি। সূত্র এই দুয়ের মধ্যেই আছে। অবৈধ সম্পর্ক, বা অবৈধ ব্যবসা। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকড় কোথায়? (চলবে)