


রবীন রায়, আলিপুরদুয়ার: ইতিহাসের বারো ভুঁইয়াদের কথা কারও অজানা নয়। আলিপুরদুয়ারের পলাশবাড়িতে ভুঁইয়াদের পারিবারিক দুর্গাপুজোয় মৃন্ময়ী মা পূজিতা হন লাল রঙে। মায়ের আগুনরঙা বা অগ্নিবর্ণা রূপ দেখতে আজও পলাশবাড়ির ভুঁইয়াবাড়িতে ছুটে আসেন ভক্তরা। এই পুজো এ বছর ১৮০ বছরে পড়ল।
অবিভক্ত বাংলায় তখন বারো ভুঁইয়াদের দাপট। ওপাড় বাংলার ফরিদপুর জেলার কেদারবাড়ি গ্রামে বারো ভুঁইয়াদের এক বংশধর স্বর্গীয় ক্ষেত্রমোহন ভুঁইয়া এই পুজোর সূচনা করেন। জনশ্রুতি আছে ক্ষেত্রমোহন ভুঁইয়া স্বপ্নাদেশে দুর্গাকে লাল রঙে দেখেছিলেন। সেই থেকে ভুঁইয়াদের পারিবারিক পুজোয় রক্তবর্ণের দুর্গা পূজিতা হয়ে আসছেন। দেশভাগের যন্ত্রণার শিকার হয়েছিল এই পরিবারটিও। ভুঁইয়া পরিবারের সদস্যরা ওপাড় বাংলা ছেড়ে এপাড় বাংলায় পলাশবাড়িতে এসে ঠাঁই নেন। তখন থেকে পলাশবাড়িতে আজও ভুঁইয়াবাড়িতে পুজো হয়ে আসছে মায়ের।
ওপাড় বাংলা থেকে আসার সময় ভুঁইয়ারা মায়ের প্রতিমার শাল কাঠের কাঠামো ও কাঁসা-পিতলের সরঞ্জাম নিয়ে এসেছিল। সেই পুরনো কাঠামো ও বাসনপত্র দিয়ে আজও পূজিতা হন উমা। এখন অনেক পারিবারিক পুজোতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। কোথাও আবার আধুনিকতার সঙ্গে পুরনো ধর্মীয় শাস্ত্রীয় রীতিনীতির মিশেলে পুজো হচ্ছে। কিন্তু, ভুঁইয়াবাড়িতে আজও মায়ের পুজোয় প্রচীন রীতিনীতির বদল হয়নি। বাড়ির স্থায়ী মন্দিরে মায়ের প্রতিমা তৈরির কাজ চলছে। আগে নবদ্বীপ থেকে মৃৎশিল্পী এসে প্রতিমা গড়তেন। এখন স্থানীয় মৃৎশিল্পী শালকুমারহাটের সুভাষ রায় প্রতিমা তৈরি করেন। আগে ভুঁইয়াদের পুজোয় মোষ বলি দেওয়া হত। সেই প্রথা অবশ্য পরবর্তীতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
ভুঁইয়াবাড়িতে সারা বছর মায়ের কাঠামোর পুজো হয়। মহালয়ার দিন থেকে চণ্ডীপাঠ শুরু হয়। যা চলে নবমী পর্যন্ত। অষ্টমীতে দরিদ্রনারায়ণ সেবা করানো হয়। পরিবারের মহিলাদের পুজোর ক’দিন অলঙ্কার পরে মায়ের মন্দিরে ঢোকা নিষেধ। গয়না খুলে রেখে চুল ছেড়ে দিয়ে তবেই মায়ের মণ্ডপে ঢোকেন বাড়ির মহিলারা। এই নিয়ম আজও চলছে।
ভুঁইয়াবাড়ির অশীতিপর সদস্য সাক্ষীগোপাল ভুঁইয়া ও রেখারানি ভুঁইয়া জানান, কঠোর ধর্মীয় অনুশাসন মেনে আজও তাঁদের পারিবারে মায়ের পুজো হয়ে আসছে।
চাকরির জন্য ভুঁইয়াবাড়ির বহু সদস্য দেশের বিভিন্ন রাজ্যের পাশাপাশি বিদেশেও ছড়িয়ে আছেন। বর্তমানে ভুঁইয়াদের সদস্য সংখ্যা একশো ছাড়িয়ে গিয়েছে। ভুঁইয়াবাড়ির নবীন প্রজন্ম মলি ভুঁইয়া বলেন, দেশে-বিদেশে থাকলেও মায়ের টানে পুজোর সময় বাড়ি আসেন কমবেশি সকলেই। তখন বাড়িতে পুনর্মিলন উৎসব হয়। দেদার খাওয়াদাওয়া থেকে হইহুল্লোড় হয় পুজোর ক’দিন। • ফাইল চিত্র।