


বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: ১৯৯৭ সালের গায়ে কাঁটা দেওয়া সিনেমার কথা মনে আছে? নিকোলাস কেজ এবং জন ট্র্যাভোলটা অভিনীত ‘ফেস অফ’। যেখানে কুখ্যাত অপরাধী এবং এফবিআই এজেন্টের ‘মুখ’ অদলবদল হওয়ার পর রুদ্ধশ্বাস গতিতে এগিয়ে চলে ছবি।
তার ঠিক তিনবছর আগে ১৯৯৪ সালে ভারতে ঘটে গিয়েছিল সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনা। মেশিনে মাথা ঢুকে গিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয় ৯ বছরের সন্দীপ কৌর। তার মুখটাই খুলে বেরিয়ে আসে। সেই অবস্থায় তাকে নিয়ে ক্রিশ্চিয়ান মেডিকেল কলেজে ছুটেছিলেন মা। সঙ্গে প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা ছিল মুখটি! দেশের অন্যতম সেরা মাইক্রোসার্জন ডাক্তার আব্রাহাম থমাস ১০ ঘণ্টা ধরে অপারেশন করে মুখ বাঁচিয়েছিলেন সন্দীপের। গিনেস বুকে নাম তোলা সেই অপারেশনটি ছিল পৃথিবীর প্রথম ফেস রিপ্ল্যান্ট সার্জারি। পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত ৫০টি মতো মুখ বদল সার্জারি হয়ে গিয়েছে। আদি সূত্রপাত মিশর (১৬০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ) এবং ভারতে ( ৮০০খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ)। রাজ্যের এক নম্বর সরকারি হাসপাতাল পিজি-র কাছে রয়েছে সেই ফেস ট্রান্সপ্লান্টের বিরল লাইসেন্স। অনেকেরই মনে হয়েছিল, লাইসেন্সটি বোধহয় শুধু হ্যান্ড ট্রান্সপ্লান্টেশনের বা হাত প্রতিস্থাপনের। কিন্তু রোটো সূত্রের খবর, ওই একই লাইসেন্সে করা সম্ভব মুখ বদল বা ফেস ট্রান্সপ্লান্ট ও। এছাড়া পেনিস এবং স্ক্রোটাম বা শুক্রাশয় প্রতিস্থাপনের লাইসেন্সও দেওয়া রয়েছে সেখানে। তাহলে কি পিজিতে অদূর ভবিষ্যতে ফেস ট্রান্সপ্লান্ট হতে পারে? মুখ বদলের লাইসেন্স থাকার কথা স্বীকার করে প্লাস্টিক সার্জারির প্রধান ডাঃ অরিন্দম সরকার বলেন, রাজ্যে শুধুমাত্র আমাদের হাসপাতালের হাতেই রয়েছে কম্পোজিট টিস্যু ট্রান্সপান্টের লাইসেন্স। যেসব অঙ্গের মধ্যে কোষ, মাংসপেশি, হাড়সহ সবকিছু থাকে, সেইসব অঙ্গই আমরা প্রতিস্থাপন করতে পারব। মুখ এবং বেশকিছু অঙ্গও তার মধ্যে পড়ে। তবে মুখ প্রতিস্থাপনে প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দাতা নির্বাচন। ঘটনা-দুর্ঘটনায় বিকৃত হয়ে যাওয়ায় মুখ প্রতিস্থাপন যেখানে অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, গ্রহীতা পাওয়া। সামাজিক এবং ধর্মীয় নানা কারণে প্রিয়জনের ব্রেন ডেথের পর বেশিরভাগ বাড়ির লোকজনই মুখ দান করতে চাইবেন না। তেমন দাতা পাওয়া কপাল! তৃতীয়ত, এই ধরনের প্রতিস্থাপনের পর সারা জীবন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে রাখার ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। মানতে হবে নানা সাবধানতা। চতুর্থত, প্রতিস্থাপনের পর মানুষটি একটি অন্য মানুষের মতো দেখাবে। কাছের মানুষ, প্রিয়জন, পাড়া-প্রতিবেশী কতটা গ্রহণ করবেন, সেই কাউন্সেলিং চলবে। পঞ্চমত, প্রতিস্থাপন বিফল হলে মৃত্যুও হতে পারে। তা নিয়ে অবহিত থাকা জরুরি। তবে পিজিতে মুখ প্রতিস্থাপন হওয়া অসম্ভব নয়। অন্যান্য অঙ্গ প্রতিস্থাপন এখন প্রায় জলভাত হয়ে যাওয়ায় এবং প্লাস্টিক সার্জারিতেও নাক, মুখ, আঙুলসহ বিভিন্ন অঙ্গ পুনগর্ঠন হওয়া এখন রুটিনে পরিণত হয়েছে। তাই প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েই রয়েছে। বললেন শহরের নামকরা প্লাস্টিক সার্জন।