


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: মাকে বরণ করা হল না। একটি মাত্র গাঁদা ও রজনীগন্ধার মালা গলায় পরে বেরল মা। নিরাভরণ দুর্গাকে বিদায় জানাতে বুক ফেটে গেল। সিঁদুর পরা হল না। কৈলাশ পর্যন্ত দীর্ঘ পথ যাবে, খিদে পাবে মেয়েটার। তাই কোনোক্রমে একটুকরো মিষ্টি মুখে দিতে পেরেছিলেন কেউ। এরকম অনাড়ম্বর বিদায় পুজোর আকাশে ঘোর অমঙ্গল। সকলের প্রার্থনা, ‘ক্ষমা করো মা...’
শনিবার গোটা চোরবাগান শোকে বিহ্বল। মূর্তি বাহকরা দুর্গাকে নিয়ে যাচ্ছেন রাস্তা দিয়ে। দু’ধারে ভিড় করে দাঁড়িয়ে মানুষ। চোখের জল সামলাতে পারলেন না কেউ-ই। দুর্গার এরকম বিদায়যাত্রা কেউ কোনোদিন দেখেনি। জীবদ্দশায় কোনোদিন দেখতেও চায় না। জোড়হাত করে সকলের প্রার্থনা, ‘অপরাধ নিয়ো না মা। আশীর্বাদ করো, বাংলার পুজোয় আর যেন কোনোদিন এই কালো অধ্যায় ফিরে না আসে। পদপিষ্ট ১৯ নিরাপরাধ মানুষকে শান্তি দিও। যাঁরা এই অব্যবস্থার জন্য দায়ি তাঁদের শাস্তি দিয়ো। মঙ্গলদায়িনী, কল্যাণময়ী মা, দুষ্টের দমন করো, শিষ্টের পালন করো...’
পুজোর প্রথম সপ্তমীর রাত বাংলার পুজোর কালো দিন হিসাবেই থেকে যাবে ভবিষ্যতের ক্যালেন্ডারে। চোরবাগানের ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাতে হয়েছে ১৯ জনকে। জখম ২৫। পুলিশ ন’জন পুজো উদ্যোক্তাকে গ্রেপ্তার করেছে। রাজ্য সরকার প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে সিট গঠন করে তদন্ত শুরু করেছে। সিটের চেয়ারপার্সন হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী মণ্ডপ পরিদর্শনের পর জানান, মণ্ডপ না খুলে প্রতিমা নিরঞ্জন হতে পারে। ঘটনাস্থলের পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ নষ্ট যাতে না হয় নজর রাখতে হবে। তারপর শনিবার চোরবাগানে দুর্গার নিরঞ্জনের আয়োজন হয়। পুলিশ কার্যত মাছি গলার জায়গা রাখেনি। মণ্ডপের একটি ছোটো জায়গা দিয়ে মূর্তি বের করেন বাহকরা। তা নিয়ে যাওয়ার ছবি সকলকে বিহ্বল করে ফেলে। অমঙ্গলের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। তারপরই অভূতপূর্ব এক ছবি।
কলকাতা বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদে সামিল হয়েছে মোমবাতি হাতে। চোরবাগান ও আশপাশের বাসিন্দারা শনিবার মোমবাতি হাতে মিছিল করলেন। শোকজ্ঞাপন করলেন। পদপিষ্ট হয়ে মৃতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন। অব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসলেন। এই ঘটনার অভিঘাত পড়েছে সর্বত্র। চোরবাগানের পুজোর শিল্পী সুশান্ত শিবানী পাল শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। শনিবার বলেছেন, ‘জানি না, কীভাবে এই শোক কাটিয়ে উঠব কিংবা আদৌ পারব কি না।’ এরপর খানিকটা আকস্মিকভাবেই বলেন, ‘আর কখনো পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকব, থাকতে পারব কি না, এখনও ভেবে উঠতে পারছি না। মুখগুলো (মৃতদের) তাড়া করে বেড়াচ্ছে সর্বক্ষণ।’
লালবাজার জানিয়েছে, ডিসি (সেন্ট্রাল) প্রবীণ প্রকাশ নিরঞ্জন পর্বের তদারকি করেছেন। দুই অতিরিক্ত কমিশনার ও চার ইন্সপেক্টর দায়িত্বে ছিলেন। বিসর্জনের প্রতিটি মুহূর্ত ভিডিয়ো করেছে পুলিশ। সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ বিসর্জন শেষ হয়। লালবাজার জানিয়েছে, পদপিষ্টের ঘটনায় ৪০ প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান রেকর্ড হয়েছে। শনিবার দ্বিতীয় ঘোষক ধৃত কালিয়াকে আদালতে পেশ করার পর তাঁর ৬ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ হয়েছে। আর এক ঘোষক সেন্টুকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাঁদের কণ্ঠের নমুনা সংগ্রহ করে ঘটনার দিনের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবে লালবাজার।
নিরঞ্জনের পথে চোরবাগানের প্রতিমা। শনিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।