


সংবাদদাতা, ঘাটাল: আদর্শের লড়াইয়ে হার না মানা এক ‘সৈনিক’ তাঁর বার্ধক্য ভাতার জমানো টাকায় আশীর্বাদ করলেন তৃণমূলের প্রার্থীকে। রাজনীতির ময়দান এখন অনেকটা বদলে গিয়েছে। হিসেবনিকেশ আর সমীকরণের ভিড়ে কোথাও যেন হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের সেই আবেগ আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। তবুও সেই আবেগেরই নজির হয়ে রইলেন চন্দ্রকোণা-১ ব্লকের বেলাদণ্ডের বাসিন্দা ৮৩ বছরের প্রৌঢ় বাদল ভুঁইয়া। মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর জীর্ণ মলিন রুমাল থেকে বের হওয়া ৫০০ টাকার একটি নোট দলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোসারা নির্দশন হয়ে উঠল।
বাদলবাবু এলাকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী। যৌবন থেকেই তিনি দক্ষিণপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী। প্রথমে কংগ্রেস এবং পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে তৃণমূলের হাত ধরেছিলেন প্রথম দিন থেকেই। দলের ব্লক সভাপতির পদ সামলেছেন বেশ কয়েক বছর ধরে। বাম আমলের সেই উত্তাল দিনগুলিতে দলের ঝাণ্ডা ধরতে গিয়ে কম অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি তাঁকে। সিপিএমের হাতে মার খাওয়া থেকে শুরু করে খেতের ফসল নষ্ট হওয়া, এমনকি একঘরে পর্যন্ত হতে হয়েছিল তাঁকে। তবুও তিনি পিছু হটেননি। কিন্তু দলের সুসময়ে গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি কার্যত ব্রাত্য হয়ে পড়েছিলেন। কোণঠাসা হয়ে ঘরের কোণেই দিন কাটছিল এই প্রবীণ কর্মীর।
তবে এবার চন্দ্রকোণা বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সূর্যকান্ত দলুই এই পুরনো সৈনিককে ভোলেননি। প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা হওয়ার পরেই তিনি ছুটে গিয়েছিলেন বাদলবাবুর কাছে। প্রবীণ এই নেতার দীর্ঘদিনের ইচ্ছে ছিল একবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে একই মঞ্চে বসার। গত ৩১ মার্চ চন্দ্রকোণায় দলনেত্রীর জনসভায় সেই স্বপ্ন পূরণ করেন সূর্যকান্তবাবু। বাদলবাবুকে সসম্মানে নেত্রীর মঞ্চে বসার ব্যবস্থা করে দেন তিনি।মঙ্গলবার যখন সূর্যকান্তবাবু বেলাদণ্ড গ্রামে প্রচারে যান, তখন এক আবেগঘন দৃশ্যের সাক্ষী থাকেন গ্রামবাসীরা। প্রার্থীকে সামনে দেখে বাদলবাবু তাঁর পকেট থেকে বের করেন একটি মলিন রুমাল। সযত্নে গিঁট দেওয়া সেই রুমাল খুলে তার ভিতর থেকে বার্ধক্য ভাতার জমানো ৫০০ টাকা প্রার্থীর হাতে গুঁজে দেন তিনি। কাঁপাকাঁপা গলায় বাদলবাবু বলেন, আমি জানি সূর্য তুমিই জিতবে। তাও ঠাকুরের আশীর্বাদ যেন তোমার সঙ্গে থাকে, সেইজন্য এই টাকাটা দিচ্ছি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমাকে এই ভাতা দেন, সেই ভাতার টাকা দিয়েই আমার হয়ে তুমি ঠাকুরের কাছে পুজো দিও। একদা সৈনিকের ওই অমলিন ভালোবাসা দেখে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সূর্যকান্তবাবু নিজেও। তিনি বলেন, বাদলবাবুর মতো মানুষদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই আজ দল এই জায়গায় পৌঁছেছে। তাঁর ওই আশীর্বাদ আমার কাছে কোটি টাকার সমান। আধুনিক রাজনীতির জটিল আবর্তে বাদলবাবুর ওই ৫০০ টাকার মানত যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, আজও নিষ্ঠা আর আবেগই হল রাজনীতির আসল চালিকাশক্তি। বেলাদণ্ডের ধুলোমাখা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ওই বৃদ্ধ যেন বুঝিয়ে দিলেন, লড়াইয়ের ময়দান থেকে সাময়িকভাবে সরে গেলেও আদর্শের প্রতি মমতা আজও অটুট থাকে।-নিজস্ব চিত্র