


নিজস্ব প্রতিনিধি, সিউড়ি: বুধবার ভোররাতে তল্লাশি অভিযানের সূচনা হয়েছিল। শুক্রবারও বজায় রইল তার রেশ। টুলু মণ্ডলের বেআইনি সাম্রাজ্য একেবারে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে তাঁর ছায়াসঙ্গীদের ডেরায় হানা দিচ্ছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত সিউড়ি ও মহম্মদবাজারজুড়ে চলল ম্যারাথন অভিযান। টুলুর ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ দাদা মসিরুদ্দিন থেকে শুরু করে একাধিক ম্যানেজার-পুলিশের স্ক্যানার থেকে বাদ পড়লেন না কেউই। টুলুর প্রাসাদোপম বাড়ি সিল হওয়ায় রাস্তায় বসলেন পরিচারিকারা। ঠাঁই হারাল খোদ টুলুর আদরের পোষ্য লিলিও!
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা নাগাদ সিউড়িতে টুলুর বিলাসবহুল ‘দলিলা ভবন’, মহম্মদবাজারের সোঁৎশালে পৈতৃক চারতলা বাড়ি ও পার্কিংয়ে তল্লাশি শুরু হয়। রাতে টুলুর বাগানবাড়ি এবং বোলপুরের ভুবনডাঙা এলাকায় টুলুর দীর্ঘদিনের কর্মী রাকিবুল শেখ ওরফে রাকিবের বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। তাকে আটক করা হয়। পুলিশের ধারণা, টুলুর ব্যবসা সম্পর্কে রাকিব অনেক কিছু জানেন।
বৃহস্পতিবার রাত ১টার সময় টুলুর সিউড়ির বসতবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে পুলিশ। বাড়ি থেকে লক্ষাধিক টাকা ও সোনার গয়না উদ্ধার হয়েছে। সিল করে দেওয়া হয়েছে সেই প্রাসাদ। মালিক ফেরার, টুলুর স্ত্রী ছেলেও নেই। বাড়িতে থাকা ছ’সাত জন পরিচারিকাও এক নিমেষে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। এমনকি, টুলুর আদরের পোষ্য লিলিও আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। শেষমেশ এক পরিচারিকা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। সেই পরিচারিকার দাবি, ‘লিলি এসি ছাড়া বিন্দুমাত্র থাকতে পারে না। মুখে রোচে না সাধারণ খাবার। কীভাবে রাখব তাই ভাবছি।’
শুক্রবার সকালে মহম্মদবাজারের সেকেড্ডা গ্রামে টুলুর অন্যতম ম্যানেজার খোদা বক্সের বাড়িতে হানা দেয় পুলিশ। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, এককালে গ্রামে ঘুরে ঘুরে কাপড় ফেরি করা খোদা বক্সের আজ রমরমা অবস্থা। মূলত টুলুর ঠিকাদারি ব্যবসা এবং ডিসিআর গেট দেখভালের দায়িত্ব ছিল তাঁরই কাঁধে। টুলু কালো টাকার একাংশ গরিব দুঃস্থদের দানধ্যান করতেন। সেই দানধ্যানের বিষয়টিও তিনি সামলাতেন।
ভাঁড়কাটায় টুলু ঘনিষ্ঠ পাথর ব্যবসায়ী সার্তাজ মোল্লা ওরফে বাপ্পার আস্তানাতেও দিনভর অভিযান চলে। তাঁর বাড়িতে টাকা গোনার জন্য পুলিশকে মেশিন আনতে হয়। জানা গিয়েছে, একাধিক খাদান ও ক্র্যাশারের মালিক বাপ্পা আয়ের বড়ো অংশই খেলাধুলোর পিছনে ওড়াতেন।
এছাড়াও মহম্মদবাজারের তৃণমূলের পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি শম্পা মাহারার বাপের ও শ্বশুরবাড়িতেও পুলিশ তল্লাশি চালায়। টুলুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এলাকায় চর্চা রয়েছে।
সিউড়িতে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নীলেশ গাইকোয়াডের নেতৃত্বে তল্লাশি শুরু হয়। তদন্তকারীদের নজরে ছিলেন টুলুর দাদা মসিরুদ্দিন মণ্ডল এবং ভাগ্নে আপেল মোর্তাজা। আপেল নিজেও পাথর ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তবে পুলিশের দাবি, টুলুর এই বিপুল সাম্রাজ্যের অন্যতম ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ ছিলেন তাঁর দাদা মসিরুদ্দিন। ‘পাচামি মাইন্স ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর কার্যকরী সভাপতি এই মসিরুদ্দিনও কোটিপতি। তাঁর নামে ও বেনামে প্রচুর পাথর খাদান এবং ক্র্যাশার রয়েছে। কয়েকমাস আগেই নিজের মেয়ের বিয়েতে এলাহি আয়োজন করে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এদিন এই দাদার প্রাসাদেও চলে চিরুনি তল্লাশি। পুলিশ জানিয়েছে, টুলুর সঙ্গে যাঁদেরই বিন্দুমাত্র যোগসাজশ মিলেছে, তাঁদের বাড়িতেই অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করতে এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেই পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। শুক্রবার টুলু মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বাড়িতে পুলিশি অভিযান।-নিজস্ব চিত্র