


রাহুল মিশ্র, কলকাতা: গভীর রাতে হাওড়া স্টেশনে ভিড় কমে এসেছে। প্ল্যাটফর্মের এক কোণে পিঠের ব্যাগকে বালিশ বানিয়ে ঘুমোতে চেষ্টা করছেন এক যুবক। কাকভোরে উঠতে হয় তাঁকে। ভোর থেকে রতন বাগলকে নেমে পড়তে হয় জীবনযুদ্ধে। বেসরকারি ঠিকাদারি সংস্থার লাল ইউনিফর্ম পরে কখনও এসএসকেএম, কখনও শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে রোগীদের সেবা করেন। এই করে মাসে আয় মেরেকেটে ১২ হাজার টাকা। ১০ বছর চাকরির পর এই টাকাই হাতে পান তিনি। অথচ রতনবাবুর পকেটে রয়েছে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বি টেক ডিগ্রি। ৭.৫৯ ডিজিপিএ, ফার্স্ট ক্লাস। ইংরেজি লেখা বা বলায় সাবলীল। তা সত্ত্বেও উপযুক্ত চাকরি নেই। মাঝেমধ্যে চোখ ভিজে আসে রতনের। তবুও কারো কাছে হাত পাতেন না। জীবনের রিং টোন যেন, ‘যাহা চাই যেন জয় করে পাই/ গ্রহণ না করি দান।’ বুধবার পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে ছিলেন ডঃ সি ভি আনন্দ বোস। তাঁর পর রাজ্যের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নেন আর এন রবি। রতনের ডিউটি পড়েছিল রাজ্যপালের কাছে। কলকাতার অন্যতম বিলাসবহুল সরকারি অতিথিশালা ‘সৌজন্য’তে কাজ করার সময় রাজ্যপাল ও তাঁর স্ত্রীর নজরে পড়েছিলেন। পরে ওএসডি সন্দীপ সিং রাজপুত জানান, এই যুবক কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। বিষয়টি শুনে রাজ্যপালও বিস্মিত হন। দিল্লি ফিরে যাওয়ার আগে তিনি রতনকে একটি প্রশংসাপত্র দিয়ে আশীর্বাদ করেন। রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গেও রতনের কথা হয়। রাজ্যপালের সেবায় টানা ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় কাটিয়েছেন তবুও সেই সুযোগে তিনি কারও কাছে কোনও অনুরোধ করেননি নিজের সম্পর্কে। রতনের কথায়, ‘আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নিজের উপর ভরসা আছে। আমার সময়ও আসবে।’
পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রাম জেলার দূরবর্তী গ্রাম কিশোরীপুরে রতনের বাড়ি। সরকারি জমিতে তাঁদের বসবাস। নিজস্ব কোনো সম্পত্তি বা পাকা বাড়ি নেই। জঙ্গল থেকে রতনের মা পাতা কুড়িয়ে সংসার চালান। বাবা বীরেন বাগাল দিন মজুরির কাজ করতেন। মাসে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা উপার্জন ছিল বর্তমানে অসুস্থ। তফসিলি জাতিভুক্ত মহার সম্প্রদায়ের এই পরিবারে উচ্চশিক্ষা প্রায় অকল্পনীয়। তবুও বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে বড়ো হবে। স্কলারশিপের সহায়তায় রতন ভরতি হন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজিতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে। ২০১৫ সালে ডিগ্রি হাতে পাওয়ার পর আশা ছিল জীবনে বড় পরিবর্তন আসবে। ক্যাম্পাস প্লেসমেন্টে চাকরি পান একটি ডিটারজেন্ট কোম্পানিতে, মাসে বেতন ৭ হাজার ৫০০ টাকা। পাঁচবছর পর পরিস্থিতি তেমন বদলায়নি। এরপর খড়্গপুরের একটি সার কারখানায় কাজ পান। বেতন ১২ হাজার টাকার বেশি ওঠেনি। তাও ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নয়, সাধারণ কেমিস্টের কাজ করতেন। ২০২৪ সালে তাঁর বাবা যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকরা বাঁচানোর আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। রতন চাকরি ছেড়ে কয়েক মাস বাবার সেবা করেন। শেষপর্যন্ত সুস্থ হন বাবা। তাঁর চোখের অপারেশনও করা হয়। এসময় পরিবারের দায়িত্ব রতনের কাঁধে এসে পড়ে। বর্তমানে জীবিকার জন্য তিনি হাসপাতালে বেসরকারি ঠিকাদার সংস্থার অধীনে ওয়ার্ড বয় হিসেবে কাজ করছেন। দিনে ১২ ঘণ্টা ডিউটি। যাতায়াত সহ প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময় লাগে। থাকার জায়গা না থাকায় রাত কাটে হাওড়া স্টেশনের পাশের ফুটপাতে। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরও কেন নিজের অবস্থার কথা তাঁকে বলেননি? রতনের শান্ত জবাব, ‘আমি ভিক্ষা চাই না। পরিশ্রম করে যা পাব, সেটাই আমার।’ ফুটপাথে ঘুমনো ফার্স্ট ক্লাস ইঞ্জিনিয়ার হাসিমুখেই বলেন, ‘নিজের উপর ভরসা আছে। একদিন আমারও সময় আসবে।’