


সমীর সাহা, নবদ্বীপ: মায়াপুরের বামুনপুকুর থেকে জল পথে নৌকায় করে রথ আনা হয়েছিল নবদ্বীপের প্রাচীন মায়াপুরের বালক সাধুর আশ্রমে। আর জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাদেবীর মূর্তি এসেছিল বাংলাদেশ থেকে। প্রায় একশো বছরেরও বেশি পুরোনো এই বালক সাধুর রথযাত্রা। এমনটাই দাবি কর্তৃপক্ষের। নবদ্বীপ প্রাচীন মায়াপুরের সিদ্ধ মহাত্মা বালক সাধু মহারাজের আশ্রমের এই প্রাচীন রথ ঘিরে আজও উন্মাদনায় মেতে ওঠেন নবদ্বীপবাসী।
প্রাচীন এই বালক সাধুর রথে ঐতিহ্য বজায় রেখে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাদেবী বৈষ্ণবতীর্থ নবদ্বীপের রাজপথে বের হন। তবে এবছর এই রথ আরও নতুনভাবে পুরীর জগন্নাথদেবের রথের আদলে সাজানো হচ্ছে। ১৫ ফুট উচ্চতায় রথ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ ফুট। হেরিটেজ স্বীকৃত নবদ্বীপের প্রাচীন বালক সাধুর আশ্রমে জগন্নাথ মন্দিরে বছরভর অসংখ্য মানুষ পুজো দেন। আর রথের সময় রশি টানতে রাস্তার দু›ধারে থাকেন অসংখ্য পূণ্যার্থী। আজ, ২৭ জুন শুক্রবার জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উৎসব। এদিন প্রাচীন মায়াপুর জগন্নাথদেবের মন্দির থেকে রথ বের হয়ে স্থানীয় রামকৃষ্ণ মঠ পর্যন্ত আনা হয়। সেখান থেকে ঘুরে মাসির বাড়ি গৌরাঙ্গ জন্মস্থান মন্দিরে রথটি রাখা হয়। সেখানে চলে বিশেষ পূজার্চনা। উল্টোরথে জগন্নাথদেব আবার নিজ মন্দিরে ফিরে আসেন।
জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার বড়বাঁসালিয়া গ্রাম থেকে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে যাদবচন্দ্র রায় নবদ্বীপে এসেছিলেন। বালক বয়স থেকে ভগবৎ প্রেমে মগ্ন থাকতেন বলেই লোকে তাঁকে বালক-সাধু নামে ডাকতেন। মাত্র ছ’বছর বয়সে বড়বাঁসালিয়ার বাড়িতে খেলতে খেলতে কাঁঠাল গাছের নীচে জগন্নাথদেবের একটি চিত্রপট পেয়েছিলেন। সেই চিত্রপটটি বুকে নিয়ে সেই সময় থেকেই জগন্নাথদেবের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। পরবর্তীতে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাদেবীর মূর্তি তৈরি করে পূজার্চনা শুরু করেন তিনি।
এরপর বাংলাদেশ থেকে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে এদেশে চলে আসছিলেন। এসময় জগন্নাথদেবে স্বপ্নাদেশে বালক সাধুকে বলেন, বাংলাদেশে একটি নতুন জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাদেবীর মূর্তি নির্মাণ করে রেখে পুরনো মূর্তিগুলি নিয়ে চৈতন্যভূমিতে চলে গিয়ে সেবা পুজো চালাতে। এরপর বালক সাধু বাংলাদেশ থেকে তিনটি টিনের বাক্সে মূর্তিগুলি আনেন। নিরাপত্তার কড়াকড়ি ছিল কিন্তু, তিনটি টিনের বাক্সে কি আছে তা নিয়ে নিরাপত্তা রক্ষীরা কোনও প্রশ্নই করেনি। ঈশ্বরের এই লীলা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।
বালক সাধু এদেশে এসে নবদ্বীপের গৌরাঙ্গ জন্মস্থান মন্দিরের কাছে জগন্নাথদেবের মন্দিরে ওই তিনটি মূর্তি স্থাপন করেন। কিন্তু রথ না থাকায় বালক সাধু যাদবচন্দ্র বিষন্ন হয়ে পড়েন। আরাধ্য দেবতাদের প্রার্থনা জানাতে থাকেন। সেই সময় জনৈক এক ভক্ত তাঁর কাছে এসে বামুনপুকুরে একটি রথের সন্ধান দেন। এরপরই নৌকা করে জলপথে সেই রথ আনার উদ্যোগ হয়। কিন্তু সেই সময় নদীতে জল কম থাকায় কিভাবে রথ আনবেন জগন্নাথদেবের কাছে আকুতি মিনতি জানাতে থাকেন। শোনা যায়, এরপর দুদিন ধরে প্রবল বৃষ্টিতে নদীতে জল বেড়ে যায়। তখন দুটি নৌকা এক সঙ্গে বেঁধে নৌকা করে ওই রথ আনা হয়েছিল। এরপর থেকেই চৈতন্যভূমিতে বিখ্যাত বালক সাধুর রথযাত্রা উৎসব শুরু হয়।
জগন্নাথবাড়ি ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক গৌরগোপাল সাহা বলেন, সারাবছর এই মন্দিরে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রাদেবীর নিত্যপুজো হয়। দিনে পাঁচবার ভোগ দেওয়া হয়। সকালে বাল্য ভোগ থেকে শুরু করে দুপুরে অন্ন, পঞ্চ ব্যঞ্জন, পরমান্ন, বৈকালিক ফল, মিষ্টি ভোগের পাশাপাশি রাতে লুচি সব্জি , হালুয়া, মিষ্টি ভোগ নিবেদন করা হয়। নবদ্বীপ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর জন্মস্থান মন্দিরের অধ্যক্ষ অদ্বৈতদাস বাবাজি মহারাজ বলেন, এখানে আট দিন সপরিবারে থাকবেন জগন্নাথদেব। উল্টো রথের দিন ফিরে যাবেন। দিনে পাঁচ থেকে ছ›বার ভোগ নিবেদন করা হয়। এক একদিন এক এক রকমের ভোগ।