


শান্তনু দত্ত, কলকাতা: অজস্র শব্দের মধ্যেও তাঁর ছবিতে থাকত অদ্ভুত এক নীরবতা। সেই নীরবতার মাঝে বাঙ্ময় হয়ে উঠত ‘মেঘে ঢাকা তারা’র নীতার কান্না, ‘সুবর্ণরেখা’র সীতার আর্তি। তিনি ঋত্বিক ঘটক। নিজস্ব ভাবনায় যে পরিচালক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন বাংলা তথা ভারতীয় ছবিকে। বুধবার কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে কিংবদন্তি সেই পরিচালককে স্মরণ করলেন তাঁরই ছাত্র আদুর গোপালকৃষ্ণন। তিনি নিজেও আন্তর্জাতিক মহলে একজন সমাদৃত পরিচালক। সঙ্গে ছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ ও অনুপ সিং। ঋত্বিকের শতবর্ষে প্রথমবার এই লেকচার আয়োজন হয়েছিল। উৎসবের চেয়ারপার্সন গৌতম ঘোষ জানালেন, এবার থেকে প্রতি বছর এই লেকচার আয়োজিত হবে।
পুনের ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র ছিলেন আদুর। বুধবার শিশির মঞ্চে বসে যেন তিনি ফিরে গেলেন সেই সময়। বললেন, ‘ঋত্বিক ছিলেন সমস্ত শিক্ষকদের থেকে আলাদা। ক্লাসে সিনেমার থিওরি আলোচনা করতেন না। নিজের তৈরি সিনেমা দেখাতেন। তারপর বোঝাতেন ফ্রেমের ব্যাখ্যা। কেন অন্যভাবে অ্যাঙ্গেল নিলেন না, তা বলতেন।’ এভাবেই ঋত্বিকের মেঘে ঢাকা তারা, সুবর্ণরেখা দেখেছেন তিনি। সঙ্গে হাতেকলমে বুঝেছিলেন ঋত্বিকের সিনেমার ব্যকরণ। আদুর জানালেন, ঋত্বিক ঘটক ক্লাসে কোনও সময় মদ্যপ অবস্থায় ঢুকতেন না। ক্লাসরুমে ৫-৬ জন থাকতেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুমার সাহানি, মণি কউল। প্রত্যেক ছাত্রের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান কথা বলতেন, ক্লাস নিতেন ঋত্বিক। সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ঋত্বিকের ফারাকও ব্যাখ্যা করেছেন আদুর। বললেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের তুলনায় তাঁর কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। সত্যজিৎ রায়ের ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল পেন্টিং। আর ঘটক ছিলেন থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ডের।’ দুই কিংবদন্তি পরিচালকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আদুর জানিয়েছেন, সিনেমার প্রতি ঋত্বিকের ডেডিকেশন, প্যাশন তাঁকে অবাক করে। ঋত্বিকের ছবির মিউজিক, সম্পাদনা, প্রকৃতি, সবই শিক্ষণীয়। তাঁর কথায়, ‘সিনেমা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না তিনি।’ আদুরের আক্ষেপ, ‘জীবদ্দশায় ন্যায্য সম্মান পাননি ঋত্বিক ঘটক। তাঁর মৃত্যুর পর সকলে তাঁকে নিয়ে এত মাতামাতি করেন!’
প্রথমবার কলকাতায় আসার স্মৃতিচারণাও করলেন আদুর। জানালেন, কলকাতা তাঁর অত্যন্ত পছন্দের জায়গা। দ্বিতীয় বাড়ি। প্রায় ১০ বছর সিনেমা বানান না। তবে বর্তমানের ওটিটি, এআই সিনেমার দর্শনের ক্ষতি করছে বলেই মত তাঁর। -নিজস্ব চিত্র