


শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসের বুকে পুরু ‘বরফে’র আস্তরণ দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, এর নীচে জল থাকতে পারে। তাহলে কি প্রাণের অস্তিত্বও রয়েছে? তা জানার জন্যই পাঠানো হবে রোবটিক সাপ। লিখেছেন কল্যাণকুমার দে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসের তথ্য অনুযায়ী শনি গ্রহের বর্তমানে মোট ২৭৪টি উপগ্রহ আছে। যা সৌরজগতের যেকোনো গ্রহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ফলে শনিতে এখন ‘চাঁদের হাট’। শনির উপগ্রহগুলির মধ্যে টাইটান হল সবচেয়ে বড়ো। ১৭৮৯ সালের ২৮ আগস্ট ব্রিটিশ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেল শনির আর একটি বড়ো উপগ্রহ আবিষ্কার করেন। উইলিয়ামের পুত্র জন হার্শেল ১৮৪৭ সালে বাবার আবিষ্কৃত শনির উপগ্রহটির নাম রাখেন এনসেলাডাস। আমাদের সৌরজগতের অধিকাংশ গ্রহ ও উপগ্রহের নাম গ্রিক বা রোমান ভাষা থেকে নেওয়া। একমাত্র ‘আর্থ’ (পৃথিবী) নামটি ছাড়া।
এনসেলাডাস এই নামটিও গ্রিক পুরাণ থেকে নেওয়া। সেখানে এনসেলাডাস ছিলেন গাইয়া (পৃথিবী) ও ইউরেনাস (আকাশ বা স্বর্গের)-এর সন্তানদের মধ্যে অন্যতম। তিনি হিংস্র ও অপ্রতিরোধ্য শক্তিশালী দৈত্য বা গিগ্যান্টস। ওলিম্পিয়ানের সঙ্গে দৈত্যদের যুদ্ধে এনসেলাডাস ছিলেন প্রধান যোদ্ধা এবং দেবী এথেনার প্রতিপক্ষ। দেবী এথেনা ছিলেন প্রাচীন গ্রিক উপকথায় জ্ঞান এবং যুদ্ধ ও সাহসের দেবী। তিনি জিউসের কন্যা। প্রবল যুদ্ধে এনসেলাডাস কিন্তু জিততে পারেননি। হেরে গিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর তারপর তার উপর সিসিলির গোটা মাউন্টেন এটনা ছুড়ে মারা হয়। সেই বিশাল পর্বতের নীচে নাকি বন্দি হন এনসেলাডাস।
উপকথা অনুযায়ী, এই যে মাঝে মাঝে ভূমিকম্প হয়, আগ্নেয়গিরি জেগে ওঠে। এটা নাকি ওই এনসেলাডাসের মাটির নীচে নড়েচড়ে ওঠার কারণে। যাইহোক, উপগ্রহের কথায় ফিরি। এনসেলাডাস শনিগ্রহের ষষ্ঠ বৃহত্তম এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় বরফাচ্ছন্ন উপগ্রহ। সেই কারণে এর পৃষ্ঠতল অত্যন্ত মসৃণ, সাদা ও প্রতিফলনশীল। এটি প্রায় ৫ কিমি পুরু বরফ দিয়ে ঢাকা। বিজ্ঞানীরাও সন্দেহ করছেন, বরফের পৃষ্ঠের নীচে প্রচুর পরিমাণে জল থাকতে পারে। এই উপগ্রহটির ব্যাস প্রায় ৫০০ কিমি। এই উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে ‘টাইগার স্ট্রাইপস’ নামে একটি ফাটল থেকে অনবরত বরফের কণা ও জলীয় বাষ্পের জেট মহাশূন্যে ছিটকে পড়ে। যা পৌরাণিক চরিত্রটির অস্থিরতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিন্ত করেছেন যে, বরফের কঠিন স্তরের নীচে প্রায় ৬৫ কিমি গভীর পর্যন্ত তরল মহাসাগর রয়েছে, যা উপগ্রহের ভেতরের তাপের কারণে জমে না। মহাসাগরের গভীরের তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ১.০৯৫ থেকে ১.২৭২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই মহাসাগরটি পৃথিবীর মহাসাগরের মতো লবণাক্ত এবং এতে কার্বন, নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, ফসফরাস সহ জীবন সৃষ্টির জন্য সবরকম প্রয়োজনীয় উপাদানই আছে।
১৯৯৭ সালের ১৫ অক্টোবর ‘ক্যাসিনি হাইগেন্স’ মহাকাশযানটিকে শনিগ্রহের উদ্দেশে উৎক্ষেপণ করা হয়। সাত বছর যাত্রা করার পর ২০০৪ সালের ১ জুলাই শনির কক্ষপথে মহাকাশযানটি পৌঁছয়। আমাদের সৌরজগতে শনি হল সূর্য থেকে দূরত্বের নিরিখে ষষ্ঠ গ্রহ এবং বৃহস্পতি ও ইউরেনাস গ্রহের মাঝখানে অবস্থিত। আর পৃথিবী থেকে শনিগ্রহের দূরত্ব প্রায় ১৪০ কোটি কিলোমিটার। অভিযানটি ছিল নাসা, ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ও ইতালির স্পেস এজেন্সির যৌথ উদ্যোগে। এই মহাকাশযানটি ২০০৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শনিকে প্রদক্ষিণ করে এবং এর বায়ুমণ্ডল, বলয়, চৌম্বক ক্ষেত্র এবং দুই উপগ্রহ টাইটান ও এনসেলাডাসে প্রাণের সম্ভাবনা আছে কি না খতিয়ে দেখে। ক্যাসিনি মহাকাশযানের তথ্য অনুসারে, এনসেলাডাসের পৃষ্ঠে তরল জলের স্রোতের দাগ রয়েছে।
সৌরজগতের অন্য কোনো গ্রহ বা উপগ্রহে জীবন রয়েছে কি না তা জানতে হন্যে হয়ে খুঁজছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জানিয়েছে, তাঁদের ক্যাসিনি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল শনির বরফের উপগ্রহ এনসেলাডাস নিয়ে গবেষণা চালানো। সেই অভিযান চলাকালীনই বিজ্ঞানীরা এখানে খোঁজ পান হাইড্রোজেন সায়ানাইডের। যাকে তাঁরা জীবনের উৎপত্তির অন্যতম চাবিকাঠি বলে দাবি করেছেন। এই হাইড্রোজেন সায়ানাইডের অণু প্রাক্পৃথিবীতে প্রাণ সঞ্চারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে ধরা হয়। হাইড্রোজেন সায়ানাইড যদিও একটি অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস। কিন্তু আদিম পৃথিবীতে জৈব অণু এবং প্রোটিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড ও নিউক্লিক অ্যাসিডের মতো জটিল জৈব অণু গঠনে হাইড্রোজেন সায়ানাইড একটি অপরিহার্য উপাদান। এর আগে ২০১৭ সালে বিজ্ঞানীরা এনসেলাডাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও হাইড্রোজেনের উপস্থিতি অনুমান করেছিলেন।
এবার জীবনের সন্ধানে শনির উপগ্রহ এনসেলাডাসে নাসা ‘সাপ’ পাঠাচ্ছেন। এটা যে সে সাপ নয়। রোবট সাপ! সাপের মতো রোবট অনুসন্ধান চালাবে শনির এই উপগ্রহে। নাসা এই রোবটটিকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে সমুদ্র, বিশ্বের যেকোনো ভূখণ্ড, তরল মাধ্যম, গোলকধাঁধা পরিবেশ— সমস্ত জায়গায় কাজ করতে পারে। শনির উপগ্রহে পৌঁছে তা প্রথমে বরফের বৈশিষ্ট্যগুলি পরীক্ষা করবে। এই রোবট সাপের নাম দেওয়া হয়েছে ইইএলএস। পুরো কথা হল—এক্সোবায়োলজি এক্সট্যান্ট লাইফ সার্ভেয়ার। এই রোবটটি এনসেলাডাসের পৃষ্ঠে অবতরণ করবে। ওই উপগ্রহে জল ও জীবন আছে কি না তার প্রমাণের সন্ধান করবে।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবোরেটরি এই অত্যাধুনিক রোবট তৈরি করেছে। এর মধ্যে আছে অ্যাকচুয়েশন ও প্রপালশন মেকানিজম। সহজ করে বললে, রোবটের অ্যাকচুয়েটর পেশির মতো কাজ করে। আর প্রপালশন মেকানিজম গতিশীল করে যন্ত্রটিকে। সাপ আকৃতির এই রোবটটি লঞ্চের দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি।
রোবটিক সাপ দেখতে অনেকটা বাস্তব সাপের মতো লম্বা ও নমনীয়। রোবটটির দৈর্ঘ্য ১৬ ফুট এবং ওজন ১০০ কেজি। এটি অনেকগুলো ছোটো অংশ বা সেগমেন্ট দিয়ে তৈরি। প্রতিটি অংশ আলাদাভাবে নড়াচড়া করতে পারে, ফলে এটি অসমান জায়গায় সহজে চলাচল করতে পারে। রোবটটির গায়ে বিশেষ ধরনের স্ক্রু-আকৃতির চাকা রয়েছে, যা বরফ, বালি বা পাথুরে জমিতেও একে সহজে চলতে সাহায্য করে। এটি শুধু মাটিতে নয়, বরফের ফাটল বা গর্তের মধ্যে দিয়েও ভেতরে ঢুকতে পারে। বরফ কাটা খুব একটা সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু এই রোবটিক সাপ লক্ষ লক্ষ কিলোমিটার দূরে শনির উপগ্রহের বরফ কেটে নীচে সমুদ্রে প্রবেশ করবে, অন্বেষণ করবে জীবনের নানা উপাদান।
এটির মাথায় উন্নত মানের ক্যামেরা, সেন্সর এবং বৈজ্ঞানিক যন্ত্র রয়েছে। এই যন্ত্রগুলোর মাধ্যমে রোবটটি চারপাশের পরিবেশ পরীক্ষা করে থ্রি-ডি ম্যাপ করতে পারবে। এটি রিয়াল টাইম ছবিও পাঠাবে। এর গায়ে একটি পেলোড আছে, যা বিজ্ঞানীদের ভূপৃষ্ঠের চাপ পরিমাপ করতে সক্ষম করবে। যদি এই রোবট সাপ সফলভাবে এনসেলাডাসে পৌঁছতে পারে, তবে এটি বরফের নীচের সমুদ্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। সেই তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন সেখানে জীবনের কোনো চিহ্ন আছে কি না। যদি সত্যিই পৃথিবীর বাইরে কোথাও জীবনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সেটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর একটি হবে। মহাকাশ অনুসন্ধানে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। নাসার এই রোবটিক সাপ ভবিষ্যতে মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। এর মাধ্যমে মানুষ হয়তো একদিন পৃথিবীর বাইরে জীবনের রহস্য উন্মোচন করতে পারবে।