


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি দেওয়া নতুন ঘটনা নয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই প্রচুর ছাত্র বিলেতে যেতেন উচ্চশিক্ষার জন্য। সেই সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েছে। তবে, মোদি জমানা যেন সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে! বিজেপি সরকারের ১০ বছরে উচ্চশিক্ষা খাতে ভারতীয় মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ বেড়েছে ২০০০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ২০ গুণ। শিক্ষাবিদদের মতে, দেশে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবই এর প্রধান কারণ। সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুলেছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আসন। অথচ, মান একেবারেই আশাব্যাঞ্জক নয়।
নীতি আয়োগ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় রিপোর্ট বলছে, ২০২১-২২ সালে ৪৬ হাজার ৮৭৮ জন বিদেশি পড়ুয়া ভারতে এসেছেন। সেখানে ১১ লক্ষ ৫৯ হাজার পড়ুয়া ভারত থেকে বিদেশে পড়তে গিয়েছেন। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয় ১৩ লক্ষ ৩৬ হাজার। রিজার্ভ ব্যাংকের লিবারেল রেমিটেন্স স্কিম অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে উচ্চশিক্ষার অ্যাডমিশন এবং টিউশন ফি খাতে ৯৭৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল। সেটাই ২০২৩-২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার কোটি টাকা। ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ধরলেও এই খরচ ২০০০ শতাংশ বা ২০ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিদেশে পড়তে গিয়ে থাকা, খাওয়া, যাতায়াত সহ ভারতীয় পড়ুয়াদের সামগ্রিক খরচ কত? অ্যাসোচেমের হিসেব বলছে, ২০২০ সালে এর পরিমাণ ছিল ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ‘দ্য ইন্ডিয়ান স্টুডেন্ট মবিলিটি রিপোর্ট’-এর হিসেব বলছে, ২০১৯ সালেই এই পরিমাণ ২ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি টাকার কম ছিল না। ২০২২ সালে সেটা বেড়ে হয় ৩ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকা। পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ফি এবং অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি ধরলে এই অর্থের পরিমাণ ২০২৫ সালে ৬ লক্ষ কোটি হওয়ার কথা। এই পরিমাণ অর্থ ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে উচ্চশিক্ষা বাজেটের ১০ গুণ এবং ভারতের জিডিপির ২০ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় সরকারের হিসেবই বলছে, দেশের যত বাণিজ্য ঘাটতি, তার ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষা খাতে বিদেশে অর্থ চলে যাওয়ার কারণে। তাই এতদিনে টনক নড়েছে কেন্দ্রের। বিদেশি পড়ুয়া বাড়িয়ে এই ঘাটতি কমাতে চাইছে তারা। তাই ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত এক লক্ষ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩ লক্ষ ৫৯ হাজার এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ৭ লক্ষ ৮৯ হাজার বিদেশি পড়ুয়া টানার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে কেন্দ্র।
তবে এই লক্ষ্য কতটা পূরণ হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে যথেষ্ট। কারণ, কেন্দ্রের রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে, দেশের ১২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাড়ে চার কোটি পড়ুয়ার মধ্যে বিদেশি ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ভগ্নাংশেও আসে না। কারণ, ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একটিও এখন আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে প্রথম সারিতে নেই। এই অবস্থায় কেন্দ্র চাইছে দেশের প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে অভিযান শুরু করতে। সেখানে বিদেশিদের আনা শুরু হবে। বিশ্বজুড়ে অন্তত সাড়ে তিন কোটি ভারতীয় উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের অ্যাম্বাসাডর হিসেবে নিয়োগ করা হবে। ভারতীয় প্রাচীন জ্ঞান, বিজ্ঞান, যোগ ও দর্শনের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকেও তুলে ধরা হবে। নালদা বা তক্ষশীলার মতো প্রাচীন ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিদেশি পড়ুয়াদের পড়তে আসার বিষয়টিও তুলে ধরা হচ্ছে। চুক্তি করা হচ্ছে বহু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। কেন্দ্রের আশা, এর ফলে ২০৪৭ সালে ‘বিকশিত ভারত’-এ বিদেশি পড়ুয়ার সংখ্যা আট লক্ষের কাছাকাছি পৌঁছোবে। প্রক্রিয়াটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনালাইজেশন অব হায়ার এডুকেশন’।