


সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত: ‘গাড়ি ঘোড়া ট্যাক্সিতে রণভূমি থৈ থৈ/ভোটদাতা দিশাহারা কোথা করে ঢেরা-সই।’ ভোট এলেই মনে পড়ে যায় শরচ্চন্দ্র পণ্ডিত ওরফে দাদাঠাকুরের এই নিদারুণ রসিকতা। সেই মধ্যযুগ থেকেই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যাপারস্যাপার ঢুকে পড়েছিল বাঙালির রক্তে। কোম্পানি শাসনের আগে পর্যন্ত গ্রামবাসীরা সম্মিলিত সভায় বসে ধ্বনি ভোটে হাত তুলে মতামত প্রকাশ করতেন। নিজেদের প্রতিনিধিও বেছে নিতেন। তবে ঔপনিবেশিক ভোট ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলার পরিচয় কোম্পানি আমল শেষ হওয়ার পর, সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনে। ১৮৭৪ সালে পুর আইন সংশোধন করে তারা প্রথমবার ভোটাধিকার দেয় ‘নেটিভ’ নাগরিকদের। তারপরই নবগঠিত কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের প্রথম ভোট। নির্বাচন এলেই প্রার্থীদের ধুন্ধুমার... সেই যুগেও ছিল। সঙ্গে অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতি! আর ছিল আজকের মতো তারকা প্রার্থীও।
কংগ্রেসের মধ্যে প্রাদেশিক আইনসভায় যোগদান করা নিয়ে মতবিরোধ হয়। তার জেরেই ১৯২৩ সালের ১ জানুয়ারি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গঠন করেন স্বরাজ্য দল। সেই বছরের শেষেই ছিল বিভিন্ন প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন। ভোটের ময়দানে নামেন দেশবন্ধুর পাঁচ শিষ্য—ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়, শরৎচন্দ্র বসু, নির্মলচন্দ্র চন্দ্র, তুলসীচন্দ্র গোস্বামী ও নলিনীরঞ্জন সরকার। শ্রীরামপুরের রাজবাড়ির ছেলে তুলসীচন্দ্র গোস্বামীর কাছে ‘রোলস রয়েস’ গাড়ি ছিল। সেই যুগে যার দাম পঞ্চাশ হাজার টাকার কম নয়! গাড়িটির প্রতি তুলসীবাবুর ভালোবাসা বড়ো কম ছিল না। যখন-তখন যে-কোনো রাস্তায় সেটি ব্যবহার করতেন না। স্বরাজ্য দলের ভোট যুদ্ধে স্বমহিমায় হাজির হল এই ‘রোলস রয়েস’। বন্ধু নির্মলচন্দ্রের প্রচারেও সেটির যথেচ্ছ ব্যবহারে তুলসীবাবুর আপত্তি ছিল না। ভোট প্রচারে এই ‘রোলস রয়েস’কে দেখার জন্য ভিড় করতেন বহু মানুষ। তা বুঝতে পেরে গাড়ি দিয়েই প্রচারের নতুন কৌশল নিলেন নির্মলচন্দ্র। শোনা যায়, ওই নির্বাচনে বন্ধু নির্মলচন্দ্র ও বিধানচন্দ্র রায়ের প্রচারে ৪০ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করেছিলেন তুলসীবাবু।
এই ভোট যুদ্ধে দু’টি ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল। প্রথম ঘটনাটি হল, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এস এন দাশ পরাজিত হলেন স্বরাজ্য দলের নবীন প্রার্থী সাতকড়িপতি রায়ের কাছে। আর বারাকপুর কেন্দ্রে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে হেরে গেলেন বাংলার মুকুটহীন রাজা রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শ মেনেই সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন বিধানচন্দ্র। স্বরাজ্য দল তাঁকে সমর্থন করেছিল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ততদিনে নেতৃত্বের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে কংগ্রেস ছেড়েছেন। গঠন করেছেন ‘ইন্ডিয়ান লিবারেশন ফেডারেশন’। বারাকপুর তাঁর খাসতালুক। কংগ্রেস বা স্বরাজ্য দল কোনো পক্ষই প্রার্থী দেয়নি তাঁর বিরুদ্ধে। এমন সময় স্বরাজ্য দলের সমর্থন নিয়ে আসরে নামলেন বিধানচন্দ্র। এই কেন্দ্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শালীনতার সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। বিধানচন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধেও উঠেছিল ভয়ঙ্কর অভিযোগ। তিনি নাকি নির্বাচন যুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হেয় করার জন্য এক স্ত্রীলোককে জোগাড় করে সভায় সভায় সুরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে বিকৃত কামনার অভিযোগ করান! অনেকে বলেন, এই মিথ্যা অভিযোগই ছিল সুরেন্দ্রনাথের পরাজয়ের কারণ। এই বিতর্ক তৎকালীন বঙ্গ রাজনীতিতে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।
এর কয়েকমাস পরেই ছিল কলকাতায় পুরসভার ভোট। তখন শুধুমাত্র করদাতারাই ভোট দিতে পারতেন। শহর পরিচালনার ভার ছিল ঝানু ব্রিটিশ সিভিলিয়ানদের উপর। সেবারই প্রথম দেশীয়দের সামনে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ। সেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে স্বরাজ্য দল। সদ্য রাজনীতিতে পা রাখা তরুণ সুভাষচন্দ্র বসু হলেন দেশবন্ধুর ক্যাপ্টেন। সেই সময় কলকাতার ২২ নম্বর ওয়ার্ড ছিল ভবানীপুর। এই কেন্দ্র থেকেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন সুভাষচন্দ্র। ১৯২৪ সালের মার্চে কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচনে মোট ৫৫টি আসন পেয়ে বোর্ড গঠন করে স্বরাজ্য দল। এই নির্বাচন নিয়েও উঠেছিল বহু অভিযোগ। দেশবন্ধুর বিরুদ্ধে ছিলেন মেয়র পদপ্রার্থী ছিলেন দু’জন— প্রিয়নাথ মল্লিক ও ডব্লিউ এস উইলসন। কিন্তু মাঝপথে প্রিয়নাথবাবু নাম প্রত্যাহার করে নেন। তাঁকে ভয় দেখিয়ে সেকাজ করানো হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন উইলসন। আঙুল তোলেন দেশবন্ধুর অনুগামী বিধানচন্দ্র রায়, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখের দিকে। ভোটের ফল প্রকাশ হলে দেখা যায়, দেশবন্ধু পেয়েছেন ৫৯টি ভোট। উইলসনের ভাগ্যে জুটেছিল মাত্র ১৩টি।
দেশবন্ধুর প্রভাবে বিখ্যাত অভিনেতা প্রমথেশ বড়ুয়া পর্যন্ত যোগ দিয়েছিলেন রাজনীতিতে। ১৯২৪ সালে তাঁকে সামনে রেখেই অসম বিধানসভা নির্বাচনে নেমেছিল স্বরাজ্য দল। তরুণ প্রমথেশ বড়ুয়া নির্বাচনি প্রচারে ব্যবহার করেছিলেন বিভিন্ন নাটকের অংশ। সেই নির্বাচনেও অনায়াস জয় পায় স্বরাজ্য দল।
পরাধীন ভারতের নির্বাচনি যুদ্ধের আর একটি বর্ণময় স্মৃতি হল ‘বিদ্রোহী কবি’ কাজী নজরুল ইসলামের প্রার্থী হওয়া। ১৯২৬ সালের ঘটনা। সেবছরের শেষ দিকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নজরুল তখন বাংলার জনপ্রিয় কবি। ঢাকা বিভাগ থেকে আইনসভায় দু’জন মুসলিম প্রতিনিধির কোটা ছিল। সেই ভোটে কংগ্রেস সমর্থিত স্বরাজ্য দলের প্রার্থী হন নজরুল। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ নিয়ে গঠিত একটি আসন থেকে। প্রচারে তাঁর হয়ে মাঠে নামেন ‘পল্লিকবি’ জসীমউদ্দিন। নির্বাচনের প্রচারে গান গেয়ে অভিনব প্রচার করেছিলেন নজরুল। ফরিদপুরের এক জনসভায় জসীমউদ্দিনকে এও বলেছিলেন, ‘জসীম, তুমি ভেবো না! নিশ্চয়ই সবাই আমাকে ভোট দেবে। ঢাকায় আমি শতকরা ৯৯টা ভোট পাব। তোমাদের ফরিদপুরের ভোট যদি কিছু পাই, তাহলেই কেল্লাফতে!’
কিন্তু ভোটের মাঠে নেমেই বদলে যেতে থাকে ‘বিদ্রোহী কবি’র অভিজ্ঞতা। সবথেকে বিপাকে পড়লেন ভোটপ্রচারের খরচ নিয়ে। দলের থেকে নির্বাচনি ফান্ডে তিনি পেয়েছিলেন তিনশো টাকা। কিন্তু সেই টাকায় কিচ্ছু হওয়ার জো নেই! তাঁর নিজেরও খরচ করার সংগতি ছিল না। তাই নজরুলের জনসভাগুলোতে মানুষ এলেও তারা গান শুনেই চলে যেতে লাগল। ভোটের ফলেও ভরাডুবি হল কবি নজরুলের। ১৮ হাজার ১১৬ ভোটের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৬২টি ভোট পেয়েছিলেন। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে তিনি চতুর্থ। জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। ভোটের ময়দানে অর্থের খেলা দেখে ব্যথিত নজরুল পরবর্তীতে ‘শিখা’ কবিতায় লিখেছিলেন—
‘যে হাতে পাইত শোভা খর তরবারি
সেই তরুণের হাতে ভোট-ভিক্ষা-ঝুলি
বাঁধিয়া দিয়াছে হায়! রাজনীতি ইহা!
পলায়ে এসেছি আমি লজ্জায় দু’হাতে
নয়ন ঢাকিয়া! যৌবনের এ লাঞ্ছনা
দেখিবার আগে কেন মৃত্যু হইল না?’
ভোট নিয়ে রঙ্গরসিকতাও কম হয়নি এই বঙ্গদেশে। একবার তো তেলেভাজার দোকানিকে ভোটে দাঁড় করিয়েছিলেন দাদাঠাকুর। তিনি থাকতেন মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে। এলাকায় প্রান্তিক মানুষজন তো ‘দা-ঠাকুর’ বলতে অজ্ঞান। তাঁদেরই একজন তেলেভাজাওয়ালা কার্তিকচন্দ্র সাহা। জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির ত্রৈমাসিক ট্যাক্স আচমকা বেড়ে তিন আনা থেকে ছয় আনা হয়ে যাওয়ায় বিপদে পড়ে তিনি এসেছিলেন দাদাঠাকুরের কাছে। সব শুনে দাদাঠাকুর ট্যাক্স মকুবের জন্য মিউনিসিপ্যালিটিতে চিঠি দিলেন। কিন্তু লাভ হল না। দাদাঠাকুর এবার অন্য মতলব আঁটলেন। ঠিক করলেন চপওয়ালা কার্তিককে ভোটে দাঁড় করিয়ে ‘কমিশনার’ করেই ছাড়বেন। সুযোগও এসে গেল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু প্রবল আপত্তি জানালেন মিউনিসিপ্যালিটির মসনদে থাকা অভিজাত শ্রেণির কর্তাব্যক্তিরা। তাঁরা ঢাল করলেন ভোটের নিয়মকে, প্রার্থীকে বছরে দেড় টাকা ট্যাক্স দিতেই হবে। আর কার্তিকের ট্যাক্স তো তখন তিন মাসে ছয় আনা। বছরে দেড় টাকাই। ব্যস, প্রার্থী হওয়া আর আটকাল না। স্নেহের কার্তিকের জন্য ভোটের গানও লিখলেন দাদাঠাকুর। আর তারপর... হইহই করে জিতে গেলেন কার্তিকচন্দ্র। কী ছিল সেই গান? ‘দাদাঠাকুর’ সিনেমার কল্যাণে তা তো রীতিমতো বিখ্যাত... ‘ভোট দিয়ে যা-/ আয় ভোটার আয়...!’