


শান্তনু দত্তগুপ্ত: পরিসংখ্যান, পরিসংখ্যান নিয়ে কলকাঠি, আর বাস্তব। এই তিনের মধ্যে ফারাক কিন্তু সুতোর মতোই। এই ফারাকটুকু ভরাট হয় মানসিকতা দিয়ে। রাষ্ট্রের মানসিকতা। কীভাবে? ধরে নিন আপনি শুনলেন, সরকার দাবি করছে, ৩০ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়া যাচ্ছে বাজারে। শুনেই আপনি আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটলেন দোকানে। বললেন, ‘ভাই আমাকে ৩০ টাকার চাল ১০ কিলো দাও দেখি।’ দোকানদার এমনভাবে আপনার দিকে তাকাবে, যেন আপনি টাইম মেশিনে চেপে ২০১০ সাল থেকে সোজা এখানে এসে ল্যান্ড করেছেন। অর্থাৎ, সরকারের ৩০ টাকারটা ছিল প্রচার এবং পরিসংখ্যানের উপর রঙচঙে একটা মোড়ক। চ্যালেঞ্জ করলে তারা বলবে, কোন চাল তা তো বলিনি! কোথায় পাওয়া যাবে, সেটাও না। আর আপনারটা তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াল? কঠিন বাস্তবে। অন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। আপনি প্রতিদিন কাজে বেরোন সকাল ৯টায়। দিনের বেশিরভাগ সময় ছোটাছুটি করার পর বিকালের দিকে অফিস ঢোকেন, কম্পিউটারের সামনে বসে রিপোর্ট বানান, তারপর সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ বাড়ি ফেরেন। মাস গেলে ৩৪ হাজার ৭০০ টাকা আয়। আপনার গিন্নি কিন্তু সকাল ৬টায় উঠেই কাজে নেমে পড়েন। ছেলেমেয়েকে স্কুলের জন্য তৈরি করা। টিফিন বানানো। আপনার জন্য ভাত বসানো... যাতে ৯টায় বেরনোর আগে কিছু মুখে দিয়ে আপনি বেরতে পারেন। তারপর শুরু হয় সংসারের বাকি কাজ। দুপুরে খানিক ব্রেক টাইম। তারপর আবার সন্ধ্যায় শুরু। ফুল টাইম জব। সরকারের ভাষায় ‘সেল্ফ এমপ্লয়েড’। অর্থাৎ, পরিসংখ্যান। নজরকাড়া বিষয় হল, এই হিসাব দেখানো হচ্ছে সরকারি খাতায়। এই জমানায় বেকারত্ব কতই যে কমে গিয়েছে, তা প্রমাণ করতে। প্রশ্ন হল, আপনি মানবেন তো? মাসের শেষে আপনার হাতে কিন্তু সেই ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা। এক পয়সাও বেশি নয়। অর্থাৎ, চরম বাস্তব। সরকার যতই আপনার গিন্নিকে ‘সেল্ফ এমপ্লয়েড’ বলে দাবি করুক, আদালত যতই বলুক... বাড়ির হোম মেকাররা যা কাজ করেন, তা ৩০ হাজার টাকা পারিশ্রমিকের সমান। আপনার কাছে কিন্তু ওটা থিওরির বাইরে কিছু নয়। কী বলবেন একে? উঁহু, ধাপ্পা বলতে পারবেন না। সরকার পরিসংখ্যান দিচ্ছে, আপনি তাকে ধাপ্পা বলবেন? সাহস তো কম নয়! এমনিতেই দেখছেন, সরকার বিরোধী কেউ কিছু বললে ‘নজরদারি’ নিঃশ্বাস ফেলছে ঘাড়ের উপর। সোশ্যাল মিডিয়া তাক করে গোছা গোছা রাষ্ট্রীয় টিকটিকি চোখ ফেলে রয়েছে। তার উপর আপনি যদি সরকারি হিসাবকেই ‘ধাপ্পা’ বলেন, তাহলে তো মুশকিল! জানি, আপনার রাগ হবে। জেন জি’রা যন্তরমন্তরে যেসব স্লোগান দিয়েছিল... সেগুলো মনে পড়বে। তাও আপনি কিছু বলবেন না। কারণ, সরকারই শেষ কথা। সরকারের পরিসংখ্যানই মানদণ্ড।
অথচ, সরকারের বিরুদ্ধে ‘সংশয়’ তৈরি হয়েছে। এর মূল পান্ডা অবশ্য ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ‘কেয়ার-এজ’। কী সব যেন রিপোর্ট দিয়েছে। তাতেই দেখা যাচ্ছে, গলদ আছে। কারণ, মহিলাদের স্বনিযুক্তির সরকারি ব্যালান্স শিট কিছুতেই মিলছে না। কেন্দ্র বলছে, গ্রামাঞ্চলের ৭০ শতাংশ মহিলা নাকি স্বনির্ভর। মানে সোজা কথায়, আয়-টায় করেন। তা যতই কম-বেশি হোক না কেন... আয় তাঁরা করেন। ওই যে শুরুতেই বলেছিলাম, পরিসংখ্যান। বাস্তবটা তাহলে কী? ‘কেয়ার-এজ’ বলছে, ৯ শতাংশের বেশি মহিলা গ্রামাঞ্চলে মোটেই নিয়মিত বেতনের কাজ করেন না। এবার আপনার হয়তো মনে হতে পারে, সরকার তো তাহলে ধাপ্পাই দিচ্ছে। সেটা আপনার সমস্যা। নিজের দায়িত্বে শব্দ বাছাই করুন। এখানে কিন্তু একবারও সে কথা লেখা হয়নি। আমরা খুব বেশি হলে বলতে পারি, সত্যিটা একটু অন্যরকমভাবে বলা হয়েছে। কিংবা পরিসংখ্যানে একটু রং চড়েছে। মোটেও ধাপ্পা বা মিথ্যাচার নয়। হতেই পারে না। যে দেশ সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ রাষ্ট্রের মধ্যে ১৫৭তম, ক্ষুধা সূচকে ১২২টির মধ্যে ১০০, আন্তর্জাতিক লেনদেনের নিরিখে টাকা নামতে নামতে ১৫’তে পৌঁছে গিয়েছে... সেখানে শাসক সর্বদা সত্যি বলে। কিংবা তাদের প্রচারকে সত্যি বলে মেনে নিতে আমরা বাধ্য হই। মানিয়ে বুঝিয়ে নিই। এটাই রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা, আর সাধারণ মানুষের ভাবনা-অধিকার ও স্বাধীনতা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়া। ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্রের সঙ্গে মিল মনে হলেও কিছু করার নেই। ওটাও আপনার ধারণা। আপনি বুঝে নিন। লেখকের কোনো দায়িত্ব থাকে না। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে সত্যের একটু এদিক-ওদিক হতেই পারে। তাতে যদি সমাজে শান্তি থাকে, বিশ্ব দরবারে নিজেদের পরিসংখ্যান বাড়িয়ে চড়িয়ে দেখানো যায়... তাহলে ক্ষতি কী? যারা এর মধ্যে খুঁত খুঁজতে যায়, তারা সব দিমাগি নকশাল। এমন দেশ কোথায় খুঁজে পাবেন বলুন তো... যেখানে রাষ্ট্রনেতা কতই না নতুন নতুন কয়েনেজ তৈরি করেন। শুরুর দিকে ছিল আরবান নকশাল, এখন দিমাগি। টুকরে টুকরে গ্যাং অবশ্য বদলায়নি। আসল বিষয় তো ভোট! যেভাবে হোক ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে... রাষ্ট্রবাদী ন্যারেটিভ। জাতীয়তাবাদী পুরানো হয়ে গিয়েছে। ওটা কংগ্রেস করে। এখন সবাই রাষ্ট্রবাদী। যারা নয়? ভোটার তালিকা নিয়মিত দেখবেন। এসআইআর হলে সঠিক সব নথি দেখাবেন। তারপরও অবশ্য সাত নম্বর ফর্ম জমা পড়তে পারে। অটো জেনারেটেড। কমিশন থেকেই হয়তো হয়ে যাবে। তাই বুঝে চলতে হবে। বুঝে কথা বলতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখতেও হবে। সত্য? সে তো রবি ঠাকুর লিখেছিলেন... ‘দৃঢ় নিষ্ঠার সহিত তোমাকেই সত্যের অনুসরণ করিতে হইবে, সত্য তোমার অনুসরণ করিবে না।’ এখন গল্পটা একটু ‘অন্যরকম হইয়া গিয়াছে’। রাষ্ট্র যে প্রচার চালায়, সেটাই সত্যি। সব ভুলে আমাদের সেই পরিসংখ্যানই অনুসরণ করতে হবে। বাস্তব নয়। রবি ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘সত্যকে যদি আবশ্যকমতো বাঁকানো যাইতে পারিত তবে আমরা সিধা থাকিতাম কী করিয়া!’ এখন কিন্তু দেখা যায়, ‘সত্য’কে যেমন খুশি বাঁকিয়ে ফেলা কোনো ব্যাপারই নয়। তাই আমরাও সিধা নেই। সবাই কোমর পর্যন্ত ঝুঁকে হেঁ হেঁ করে সায় দিয়ে চলেছি।
সবটাই যেন একটা গ্লো-সাইন জ্বলছে। বিরাট তামঝাম। প্রচারের ঢক্কানিনাদ। কিন্তু তার পিছনে কী চলছে, কেউ জানে না। সত্যের জায়গা এখন ওইখানে। দেখাতে হবে তো খাতায় কলমে! ওটাই সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া যাবে। স্রেফ পরিসংখ্যানে। আর বাস্তব? ওই যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো রাষ্ট্রনেতারা এলে ‘গরিবি’র উপর কাপড় টাঙিয়ে দেওয়া হয়... সেভাবে ম্যানেজ হয়ে যাবে। সবটাই তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম। সেই ডিম আমরা ফ্রাই করে খেয়ে চলেছি। বলছি, সাধু... সাধু। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু বহু বছর আগে লিখে গিয়েছেন, ‘আমরা যখন মিথ্যাপথে চলি, তখন আমরা দুর্বল হইয়া পড়ি...। তখন আমরা আত্মহত্যা করি। তখন আমরা একেবারে আমাদের মূলে আঘাত করি। আমরা যাহার উপরে দাঁড়াইয়া আছি তাহাকেই সন্দেহ করিয়া বসি। যতখানি আমাদের মিথ্যা অভ্যাস হয় ততখানি আমরা লুপ্ত হইয়া যাই।’ আমরা এখন নিজেদের মূলে আঘাত করছি। যা দেখছি, শুনছি, বিবেচনা করছি... তার উপর ভরসা করতে পারছি না। বিশ্বাস করছি শুধু শাসকের পরিসংখ্যানে। একবারও ভাবছি না, রংটা প্রতিদিন আরও বেশি চড়ছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই লম্বা লম্বা আঙুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রয়েছি... ওগুলো দুলছে। আমরা আরও সম্মোহিত হয়ে পড়ছি। অভ্যাস করছি মিথ্যা। সংসারে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছি... তাও মনে করছি, এটাই ভালো। প্রতি মাসে সরষের তেলের দাম বাড়ছে। আর আমরা ভাবছি... সরকারের কীই বা করার আছে। রেপো রেট বাড়িয়ে দিচ্ছে
রিজার্ভ ব্যাংক। বাড়ি-গাড়ির ইএমআই বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রবীণ নাগরিকদের ফিক্সড ডিপোজিটের উপর সুদের হার বাড়ছে না। তাতে কী? পরিসংখ্যান বলছে, দেশবাসী ভালো আছে। সত্য-মিথ্যা তো আপেক্ষিক! আজ যা মিথ্যা, অভ্যাস করতে করতে ওটাই সত্যি হয়ে যাবে। ব্যস, আর কী! রবি ঠাকুরের কথায়, ‘মিথ্যা আমাদিগকে একেবারে নিঃস্ব করিয়া দেয়, অল্পে অল্পে আমাদের সব কাড়িয়া লয়; আমাদের আশ্রয়ের স্থান, আমাদের জীবনের খাদ্য, আমাদের লজ্জা নিবারণের বস্ত্র। এমন ঘোর দারিদ্র্য জন্মাইয়া দেয় যে, পৃথিবীসুদ্ধকে দরিদ্র দেখি; অন্নপূর্ণাকে অন্নহীনা বলিয়া বোধ হয়।’ আমরা এখন বোধহয় তেমনই একটা ট্রানজিশনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। তেল যতক্ষণ থাকবে, গাড়ি চলবে। আর যেদিন তেল শেষ হবে... সেদিন কিন্তু আমরা ফেরার পথ খুঁজে পাব না। কারণ, সেখান থেকে ফেরার অন্য গাড়ি পাওয়া যায় না।