


সুপ্রিয় নায়েক: শরীর কুঁকড়ে যাচ্ছে এমন হচ্ছে পেটব্যথা? তার সঙ্গে দেখা দিয়েছে ডায়ারিয়া? চিকিত্সকরা বলছেন সাবধান! হতেই পারে রোটা ভাইরাসের আক্রমণ! শুধু ছোটরা নয়, আক্রান্ত হচ্ছেন বড়রাও। রোটা ভাইরাস আক্রান্তর সংখ্যা এত বাড়ছে কেন? শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন অসুখ ছড়াচ্ছে মূলত সচেতনতার অভাবে। দূষিত খাবার বা জলের মাধ্যমে শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে। আবার হাতে কোনওভাবে ভাইরাস লেগে গেলে ও সেই হাত না ধুয়ে নাক, মুখে লাগালেও ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে। আবার সংক্রামিত কোনো বস্তুর সংস্পর্শে এলেও বাচ্চা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে।
প্রশ্ন হল এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আর কী কী উপসর্গ রয়েছে? এই ভাইরাস থেকে কী কী ক্ষতি হতে পারে? রোগ হলেই বা কী করতে হবে আর প্রতিরোধের উপায় কী কী? এই প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ-এর অধ্যক্ষ ডাঃ জয়দেব রায় বলেন, ‘রোটা ভাইরাসের একটা বিশেষ ধরন আছে। প্রথমেই দেখবেন বাচ্চার মধ্যে একটা বমি বমি ভাব আসছে। এখনকার সব বাচ্চারাই কিন্তু শুরুতে বমি নিয়ে আসছে। এরপর শুরু হয় পায়খানা—একেবারে জলের মতো পাতলা পায়খানা। এর সঙ্গে পেটে তীব্র ব্যথা থাকতে পারে, কারো কারো জ্বরও আসছে। এই অবস্থায় সবচেয়ে ভয়ের ব্যাপার হলো ডিহাইড্রেশন হয়ে যাওয়া বা বা শরীর থেকে জল বেরিয়ে যাওয়ার মতো জটিলতা। তাই বাচ্চার ডায়ারিয়া, পেট ব্যথার সমস্যার সঙ্গে শিশু নেতিয়ে পড়ছে কি না, তার ঠোঁট-মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে কি না বা প্রস্রাব কমে যাচ্ছে কি না—সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে। এমন বুঝলে দেরি না করে ডাক্তারবাবুর কাছে যেতে হবে।
ডাঃ রায় জানান, অনেক সময় অভিভাবকরা পেট ব্যথা ও ডায়ারিয়ার উপসর্গ দেখে নিজেরাই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দেন। তাঁর মতে, ‘অ্যান্টিবায়োটিক একদম দেওয়া উচিত নয়।’ কারণটা খুব সহজ—অ্যান্টিবায়োটিক দিলে পেটের ভেতরের যে ‘হেলদি ব্যাকটেরিয়া’ বা উপকারী জীবাণু থাকে, সেগুলো মরে যায়। অথচ সুস্থ থাকার জন্য অন্ত্রে ওই ব্যাকটেরিয়াগুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বরং ডাক্তারবাবুর পরামর্শ— শিশুর শরীরে ওই ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়াতে প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট দিন।
তবে মনে রাখবেন, যদি পায়খানার সঙ্গে রক্ত আসে, সেটা সাধারণত রোটা ভাইরাস নয়। অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক দিলে পরবর্তীকালে ‘অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স’ তৈরি হবে, যা বাচ্চার ভবিষ্যতের জন্য খুব ক্ষতিকর।
ওষুধ ও খাওয়াদাওয়া
ডাঃ জয়দেব রায় জানাচ্ছেন, ‘মূল ওষুধ ওআরএস। তবে একেবারে অনেকটা ওআরএস দেবেন না, তাহলে বাচ্চা বমি করে দেবে। বারবার অল্প অল্প করে ওআরএস খাওয়ান। বমি কমানোর জন্য ডোমপেরিডন জাতীয় ওষুধ দেওয়া যেতে পারে।’
তিনি আরও বলছেন, ‘অনেকে ডায়ারিয়া হলে খাবার বন্ধ করে দেন—এটাও একদম ঠিক না। খাবার বন্ধ করবেন না, তবে বেছে খাওয়ান।’
কী খাওয়াবেন?
ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার দেবেন না।সহজপাচ্য খাবার যেমন ফ্যান ভাত, ডাল সেদ্ধ ভাত, ডালের জল ভাতা খাওয়ানা অল্প অল্প করে। মাঝেমধ্যে নুন-চিনির জল দিন।
দই-ভাতও খুব উপকারী, কারণ দই ভাতে থাকে প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক বা উপকারী ব্যাকটেরিয়া।
ডাঃ রায় বলছেন, ‘মুশকিলটা অন্য জায়গায়। রোটা ভাইরাস সংক্রমণে বার বার পায়খানা হয়। মা-বাবারা এসে বলেন, ডাক্তারবাবু, পায়খানাটা আগে বন্ধ করুন। পায়খানা জোর করে বন্ধ করা উচিত নয়। শরীরের ভেতরে যে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া আছে, সেগুলো মলের মাধ্যমেই বেরিয়ে যেতে চায়। আমরা যদি ওষুধ দিয়ে সেটা আটকে দিই, তবে ওই বিষাক্ত জিনিসগুলো শরীরে জমে উল্টে বাচ্চার আরও ক্ষতি করবে।’
রোগ প্রতিরোধ
রোটা ভাইরাস অবশ্যই ‘প্রিভেন্টেবল’ বা প্রতিরোধযোগ্য। এই ভাইরাসের খুব ভালো ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। ডাঃ রায় জানাচ্ছেন, সরকারি রুটিন অনুযায়ী শিশুর ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ এবং ১৪ সপ্তাহ বয়সে টিকার ডোজগুলো ঠিকমতো কমপ্লিট করলে আক্রান্ত হওয়ার চান্স অনেক কমে যায়।
পাশাপাশি শিশুর স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার উপর জোর দিন। জল যেন পরিশুদ্ধ এবং ফোটানো হয়। এছাড়া শিশুর মলত্যাগের পর তাকে সঠিকভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়, শিশুর হাত ধোওয়ার অভ্যেস অভ্যাস যেন বজায় থাকে—এগুলো খেয়াল রাখলে রোটা ভাইরাস নিয়ে অযথা ভয়ের কিছু নেই। ডিহাইড্রেশন সামলে রাখলে সাধারণত রোটা ভাইরাস থেকে প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক চিকিৎসায় ভরসা রাখুন।
বড়দের সংক্রমণ
এখন অনেকে বলছেন যে বড়দের বা বয়স্কদের মধ্যেও এখন রোটা ভাইরাস দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে কেউ কেউ বলছেন যে, হয়তো বয়স্কদের শরীরের মধ্যে ওই ভাইরাসের যে অ্যান্টিবডিটা ছিল, সেটা উইনিং হয়ে গেছে—মানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাটা কমে গেছে। তবে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে যদি প্রপার ডোজে অর্থাৎ ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ এবং ১৪ সপ্তাহ বয়সে ঠিকমতো ভ্যাকসিনেশন করা থাকে, তবে তাদের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা অনেক কম থাকে।