


একাধিক দাবি। সিদ্ধান্ত। প্রস্তাব। আর তা নিয়েই টলিউডে প্রত্যাহার হল কর্মবিরতি। বুধবার থেকে ফের ছন্দে ফিরবে টলিউড। মঙ্গলবার সকাল থেকে সবপক্ষের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের। পাশাপাশি তিনি জানালেন, জাতীয় স্তরের প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস মোশন পিকচার্স’ এবং এর যুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার সঙ্গেই আপাতত কাজ করবেন না শিল্পীরা। যতদিন না ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’ জনসমক্ষে অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর আসল কারণ জানাচ্ছে, ততদিন প্রোডাকশন হাউজের কোনো প্রজেক্টে কাজ নয় বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রসেনজিতের কথায়, ‘রাহুল আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। পুরো ইন্ডাস্ট্রি এখন এক জায়গায়। এভাবে এক জায়গাতেই আমাদের থাকতে হবে। রাহুলের জন্য থাকতে হবে। বুধবার থেকে আমরা কাজ শুরু করব।’ পাশাপাশি এদিন সাংবাদিক বৈঠকে জানানো হয়েছে, টলিউডে যে সমস্ত অভিনেতা বা পরিচালকদের ‘ব্যান’ করা হয়েছিলেন, তাঁদের নিয়েও আলোচনা হবে আগামী তিনদিনের মধ্যে। তাঁরাও শীঘ্রই কাজে ফিরবেন। আর্টিস্ট ফোরামের তরফে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে, লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ও শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম যে যে প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত, সেই সমস্ত ধারাবাহিকে কোনো শিল্পী ও কলাকুশলীরা অংশ নেবেন না।
গত ২৯ মার্চ তালসারিতে ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শ্যুটিংয়ে মৃত্যু হয় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। এই ঘটনায় আঙুল উঠেছিল গাফিলতির দিকে। প্রযোজনা সংস্থার বিবৃতিতে অসংগতি ও একাধিক বয়ানে বিভ্রান্তি বেড়েছিল। সম্প্রতি রাহুলের মৃত্যুর ঘটনায় দু’টি এফআইআর দায়ের হয়। প্রথমটি রিজেন্ট পার্ক থানায় আর্টিস্ট ফোরামের তরফে। দ্বিতীয়টি তালসারির মেরিন কোস্টাল থানায়। এফআইআর করেন প্রয়াত অভিনেতার স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার। তারপরই নিরাপত্তা বৃদ্ধির দাবিতে সরব হন টলিউডের কলাকুশলীরা। রবিবার সন্ধ্যায় এক বৈঠকের পর ঘোষণা করা হয় মঙ্গলবার থেকে কর্মবিরতির পথে হাঁটবে টলিউড। সেই অনুযায়ী সোমবার রাত পর্যন্ত বিভিন্ন ধারাবাহিকের শ্যুটিং হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকেই স্টুডিয়ো পাড়ায় কার্যত তালা ঝুলেছে। বন্ধ ছিল সমস্ত ধারাবাহিকের শ্যুটিং। টেকনিশিয়ানদের যাতে সমস্যার মুখে পড়তে না হয়, সে জন্য তাঁদের কর্মবিরতির দিনও পারিশ্রমিক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অভিনেতা জীতু কামাল। মঙ্গলবার সকাল দশটা থেকে একে একে টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে এসে পৌঁছন অভিনেতা-অভিনেত্রী, টেকনিশিয়ানরা। ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রঞ্জিত মল্লিক, দেব, কোয়েল মল্লিক, শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়, পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী, প্রিয়াঙ্কা সরকার, ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, ইমপার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত প্রমুখ। তবে কোনো চ্যানেল কর্তৃপক্ষ এদিন বৈঠকে যোগ দেয়নি বলে খবর। দীর্ঘক্ষণ বৈঠক হয় উপস্থিত সবপক্ষের মধ্যে। এরপর বিকেলে সাংবাদিক বৈঠক করেন টলিউডের কলাকুশলীরা। সেখানেই জানানো হয় একাধিক সিদ্ধান্ত ও প্রস্তাবের কথা। জানা গিয়েছে, শিল্পী ও কলাকুশলীদের নিরাপত্তার স্বার্থে এবার থেকে ক্ষতিপূরণ বাধ্যতামূলক। খবর, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে শিল্পীদের সুরক্ষা বিমার ব্যবস্থা করা হবে। দেব বলেন, ‘আমরা কর্মবিরতির সংস্কৃতি থেকে বহু দূরে। কিন্তু যে ঘটনা ঘটেছে, তা অস্বীকার করার মতো পরিস্থিতি নেই। যতদিন না প্রযোজনা সংস্থা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারছে, ততদিন আমরা কাজ করব না।’ তাঁর সংযোজন, ‘বহু শিল্পী ও কলাকুশলীকে ব্যান করা হয়েছে। রাহুল চলে যাওয়ার পর আমরা বুঝেছি, কাজ না থাকাটাও কষ্টের। আমাকে ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়েছেন বুম্বাদা। ব্যান হওয়া শিল্পীদের কাজে ফেরাতে বুম্বাদা স্বরূপদার সঙ্গে কী কথা বলবেন, তা তিনিই ঠিক করবেন। কিন্তু নিশ্চয়তা আমাকে দেওয়া হয়েছে।’ তবে পরে কারও নাম উল্লেখ না করে ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস অবশ্য বলেন, ‘কয়েকজন শিল্পী কাজ করতে পারছেন না, তা নিয়ে আমাদের একজন অভিনেতা কথা বলেছেন। তবে আমাদের টেকনিশিয়ানরা গত এক বছর ধরে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছেন। এক বছর আগে এসে তিনি এ বিষয়ে আলোচনা করলে কলাকুশলীদের ভালো লাগত।’ স্বরূপ আরও বলেন, ‘ফেডারেশন ও আর্টিস্ট ফোরাম আজকের বৈঠকে আমাদের কলাকুশলীদের সুরক্ষার জন্য যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা যত শীঘ্র সম্ভব কার্যকর হবে। সুরক্ষা বিমার ব্যবস্থাও হবে।’ অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বলেন, ‘বিমা আবশ্যিক। আইনানুগভাবে সবকিছু করতে অন্তত ১৫ থেকে ৩০ দিন লাগবে। ততদিন ঝুঁকি নিয়ে কেউ শ্যুটিং করব না।’ পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী বলেছেন, ‘লীনা গঙ্গোপাধ্যায় অন্য প্রযোজনা সংস্থা খুললেও আমাদের কেউ কাজ করবেন না।’ উল্লেখ্য, ‘ভোলেবাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের তৃতীয় সিজনের শেষ পর্বও শীঘ্রই সম্প্রচারিত হবে। এই মুহূর্তে ম্যাজিক মোমেন্টস প্রযোজনা সংস্থার ‘চিরসখা’ ধারাবাহিকটি চলছে। সূত্রের খবর, আগামী ১৩ এপ্রিল থেকে রাত দশটায় ‘চিরসখা’র জায়গায় ‘সংসারের সংকীর্তন’ নামে নতুন একটি ধারাবাহিক স্টার জলসা চ্যানেলে সম্প্রচারিত হবে। পাশাপাশি লীনা পুত্র অর্ক গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রোডাকশন হাউজ অর্গানিক স্টুডিওজ-এর কোনো প্রজেক্টেও কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে জি বাংলার ‘কনে দেখা আলো’ ধারাবাহিকটিও বন্ধ হতে পারে। এদিন রাহুলের মৃত্যুর বিচার চেয়ে সরব রয়েছেন সকলেই। অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক বলেছেন, ‘আসল সত্য সামনে আসুক, আমরা সেটাই চাই।’ মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত প্রযোজনা সংস্থার তরফে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।
এদিকে, রাহুলের মৃত্যুর তদন্তের ক্ষেত্রেও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। প্রযোজনা সংস্থার যাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে, তাঁদের কবে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
আরাত্রিকা চক্রবর্তী