


সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল আইআইটি বম্বের পড়ুয়া সাহিল ওয়াকড়ের বিরুদ্ধে। ঘটনার কিছু পরেই হস্টেলের ঘর থেকে উদ্ধার হয় সাহিলের দেহ। সেই আত্মহত্যার ঘটনা ঘিরে ফের শুরু হয়েছে তোলপাড়। অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫—পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন আইআইটিতে মোট ৫৩ জন পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জনই আত্মহত্যা করেছেন। বাকি আটটি ‘অস্বাভাবিক মৃত্যু’ বা ‘আনন্যাচারাল ডেথ’। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পড়ুয়া মৃত্যু হয়েছে আইআইটি খড়্গপুর, আইআইটি দিল্লি এবং আইআইটি হায়দরাবাদে। তিনটি প্রতিষ্ঠানে সাত জন করে পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে। আইআইটি কানপুর এবং আইআইটি বারাণসীতে ছ’জন করে এবং আইআইটি মাদ্রাজে পাঁচ জন পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে। দেশের নামজাদা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে একের পর এক ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা এক বহু পুরানো সংকটকে ফের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এই যে একের পর এক আত্মহত্যা—সেটা তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে থাকা এক জটিল কাঠামোগত ব্যর্থতার পরিণাম।
প্রশ্ন উঠতে বাধ্য, যে তরুণ-তরুণীরা দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ‘জেইই’ বা অন্যান্য প্রবেশিকা পেরিয়ে এই স্বপ্নের ক্যাম্পাসে পা রাখেন, তাঁরা কেন এমন এক চূড়ান্ত পরিণতির দিকে পা বাড়াতে বাধ্য হন! সাহিল ওয়াকড়ের ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের একাংশ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা দলিত ইস্যু তুলে ন্যায়বিচারের দাবিতে ময়দানে নেমেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, গত পাঁচ বছরে মৃত ৫৩ জনের মধ্যে ১২ জন ওবিসি, ১০ জন তফসিলি জাতি, সাত জন তফসিলি উপজাতি এবং এক জন আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণির। সব মিলিয়ে ২৯ জন। কিন্তু বাকিরা? এই পাঁচ বছরে তো ২৩ জন জেনারেল পড়ুয়ারও মৃত্যু হয়েছে। দু’দিকের পাল্লা যদি কাছাকাছি হয়, তাহলে শুধুই দলিত ইস্যু কি একমাত্র কারণ হতে পারে! সাধারণ লজিক কিন্তু বলছে, এমনটা হওয়ার কথা নয়। তাহলে কী কারণ হতে পারে? সেটাই বরং দেখা যাক—
এই পর্বে প্রথমেই আসে র্যাংকিং, গ্রেডিং এবং মেধার চাপের বিষয়টি। আসলে যে শিক্ষার্থীরা স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আইআইটি বা এনআইটিতে ভরতি হন, তাঁরা জীবনের প্রথম থেকেই শ্রেণিকক্ষে ‘সেরা’ তকমা পেতে অভ্যস্ত। কিন্তু দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পা রাখার পর তাঁদের সেই চেনা পরিচিতি ও আত্মসম্মানের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। কারণ, আইআইটির রিলেটিভ গ্রেডিং ও পার্সেন্টাইলের তীব্র চাপ। যখন একজন শিক্ষার্থী দেখেন যে, রাত-দিন এক করে পড়ার পরেও তিনি ক্লাসের নীচের সারিতে চলে গিয়েছেন, তখন প্রথমেই আঘাত লাগে আত্মসম্মানে। যে আত্মমর্যাদা এতদিন শুধু নম্বর আর র্যাংকের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে জিপিএ সামান্য কমে যাওয়া বা কোনো পেপারে ব্যাকলগ আসা তখন গোটা জীবনের ব্যর্থতা বলে মনে হয়। ইঁদুর দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে বহু পড়ুয়া ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়েন। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা তিলে তিলে গ্রাস করে তাঁদের।
অ্যাকাডেমিক চাপের পাশাপাশি আইআইটি বা প্রিমিয়ার ইনস্টিটিউটগুলির ছাত্রছাত্রীদের সবচেয়ে বড়ো অদৃশ্য ফাঁস হল কর্পোরেট প্লেসমেন্ট। সংবাদমাধ্যমে আমরা যখন কোটি টাকার প্যাকেজের কথা শুনি, আমাদের চোখ কপালে উঠে যায়। কিন্তু তার নেপথ্য পর্ব আমরা কেউ জানি না, জানতেও চাই না। অথচ কর্পোরেট ক্যাম্পাসিংয়ের আগের পর্বটি শুরু হয়ে যায় ফার্স্ট ইয়ারের ফার্স্ট সেমেস্টার থেকে। একাধিক বহুজাতিক সংস্থা ৭-৮ পার্সেন্টাইলের নীচে থাকা পড়ুয়াদের ক্যাম্পাসিংয়ের পরীক্ষায় বসতে দেয় না। আবার বেশ কয়েকটি টপ লেভেলের অ্যানালিস্ট সংস্থা ৯.৫-১০ পার্সেন্টাইলের নীচে কাউকে পরীক্ষায় বসতে দেয় না। অবশ্য কোটি টাকার প্যাকেজ দিলে এমন দাবি করতেই পারে সংস্থাগুলি। সেক্ষেত্রে যখন কোনো ছাত্র বা ছাত্রী মিড টার্মে এসে বুঝতে পারেন, পরীক্ষায় ফল আশানুরূপ হচ্ছে না। কোনো পেপারে ডি আসবে, কোনোটায় এফ। যার ফলে সমান হারে নীচে নামতে থাকবে পার্সেন্টাইলও। ফার্স্ট বা সেকেন্ড ইয়ারে যদি পার্সেন্টাইল ৪ বা ৫-এর নীচে চলে আসে, তাহলে শেষ দুই বছরে হাজার চেষ্টা করেও প্রত্যাশিত পার্সেন্টাইলে পৌঁছানো সম্ভব নয়। অধিকাংশ পড়ুয়ারই প্রথম দু’বছরের মধ্যেই চার বছরের বি-টেক কোর্সের কিউমুলেটিভ সিজিপিআই কোথায় যেতে পারে, সেই সম্পর্কে স্পষ্ট একটা ধারণা তৈরি হয়ে যায়।
যাঁরা প্রত্যাশিত পার্সেন্টাইলের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না, তাঁদের মনে অজান্তেই এক অদ্ভুত হীনম্মন্যতা ও ভয় তৈরি হয়। ‘ডে ওয়ান’ প্লেসমেন্টে চাকরি না পাওয়ার সম্ভাবনা থেকে জন্ম নেয় মানসিক চাপ। পড়ুয়ারা ভাবতে শুরু করেন যে, ভালো প্লেসমেন্ট না পেলে তাঁর পুরো ডিগ্রিটাই বেকার। সবচেয়ে বড়ো কথা, কর্পোরেট প্রতিযোগিতার এই ইঁদুর দৌড়ের কথা কাউকে মন খুলে বলতেও পারেন না পড়ুয়ারা। অবশ্য কাদেরই বা বলবেন? এই ছাত্রছাত্রীদের উপর তাঁদের পরিবার এবং সামাজিক চাপও কিছু কম থাকে না। সমাজের পিছিয়ে পড়া বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশের বহু পরিবারই নিজেদের যাবতীয় সম্বল বিক্রি করে বা ঋণ নিয়ে সন্তানদের কোচিং করান। মনে আশা থাকে, চার বছর পর পড়াশোনা শেষে ভালো চাকরি পেয়ে যাবে তাঁদের ছেলে বা মেয়ে। তাঁর হাত ধরেই ফিরবে সুদিন। কিন্তু পরীক্ষার ফল যদি আশানুরূপ না হয়, তাহলে তো চাকরি মিলবে না। কিন্তু কীভাবে তাঁরা নিজেদের মানসিক পরিস্থিতির কথা পরিবার বা বন্ধুদের কাছে বলবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। কারণ তাঁরা জানেন, পরিবার এই উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত মানসিক চাপ বা ক্যাম্পাসের ভিতরের জটিলতা বোঝে না। পরিবার বোঝে শুধু ‘সাফল্য’। ফলে শিক্ষার্থীরা এই ব্যর্থতা স্বীকার করতে ভয় পান। আর মানসিক চাপ একসময় এমন এক অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখান থেকে আত্মহত্যাই ‘একমাত্র রাস্তা’ বলে মনে হয়। অবশ্য আইআইটি বম্বের সাহিল রবীন্দ্র বা আইআইটি দিল্লির হৃষীকেশ কুমাররা একা নন, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ১১ জনের মধ্যে অন্তত এক জন পড়ুয়া পাঠরত অবস্থায় আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছেন। না, এই দাবি আমার নয়। সুপ্রিম কোর্টের দ্বারা নিযুক্ত ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্সের (এনটিএফ) সমীক্ষায় উঠে এসেছে এই তথ্য। সেই সঙ্গে সামনে এসেছে আরও একটা প্রশ্ন। আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি কি সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্ত? সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিজের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় বলে ভাবতেই পারেন না বহু ছাত্রছাত্রী। তাঁরা নিজেদের ‘বহিরাগত’ বলে মনে করেন। প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৩৪ জন পড়ুয়া এই মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। আর এই ৩৪ জনের মধ্যে ৬৭ শতাংশই আবার তফসিলি জাতি, উপজাতি, ওবিসি শ্রেণির।
সোশ্যায় মিডিয়ার বিভিন্ন গ্রুপে বা চায়ের দোকানের আড্ডায় একটা কথা প্রায়শই ঘুরে-ফিরে আসে—‘কোটা নিয়ে ঢুকে তো পড়েছে, এবার টিকবে কী করে?’ এই বিষাক্ত মানসিকতাই প্রান্তিক পরিবারের প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাস জীবনকে এক অসহনীয় নরকে পরিণত করে। গ্রামে বা ছোটো শহরে যে বৈষম্য তাঁরা পেরিয়ে এসেছেন, শহরের ঝাঁ চকচকে আইআইটি ক্যাম্পাসে এসে তা আরও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর রূপ নেয়। সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি এবং আইআইএমগুলি থেকে ১৩,৬০০-এর বেশি সংরক্ষিত ক্যাটিগরির শিক্ষার্থী ড্রপআউট বা পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। আর ছাত্রদের মানসিক স্বাস্থ্য? বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের দেখাশোনা করার জন্য পূর্ণ সময়ের কর্মী নেই। আর যে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেন্টার রয়েছে, সেখানেও গোপনীয়তা বজায় না থাকার ভয় ও পরবর্তীতে অ্যাকাডেমিক রেকর্ডে তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় ছাত্রছাত্রীরা যেতে চান না।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে শুধুমাত্র কাউন্সেলিং বা হস্টেলের ঘর থেকে সিলিং ফ্যান খুলে ফেলার মতো পদক্ষেপে কাজ হবে না। প্রয়োজন কাঠামোগত আমূল সংস্কার। প্রতিটি ক্যাম্পাসে কার্যকর ও পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রেডিং পদ্ধতিতে যেমন নমনীয়তা আনা প্রয়োজন, তেমনই প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড় থেকে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া দরকার। পাশাপাশি, যে কোনো বৈষম্য ঠেকাতে কঠোর নিয়ম করা ও অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখার জন্য পৃথক সেল গঠন করার কথা ভাবতে হবে। মানসিকতা বদলাতে হবে ছাত্রছাত্রীদের পরিবারকেও।
জানি, এসব লেখা বা বলা সহজ। বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাও সহজ নয়। কিন্তু দিনের শেষে শিক্ষা শুধুমাত্র একটি ডিগ্রি অর্জন বা চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়। শিক্ষা আসলে মানুষের মনকে মুক্ত করার চাবিকাঠি। আজ আমাদের দেশের সেরা মগজগুলি যেভাবে হতাশার শিকার হয়ে ঝরে পড়ছে, তা সবার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের। তাই প্রয়োজন এক মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে একা লড়তে হবে না। মনে হবে না, মৃত্যুই বাঁচার একমাত্র রাস্তা। তবেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও ঘুরে দাঁড়ানোর জোর পাবেন পড়ুয়ারা।